সাংবাদিকতা কীভাবে বদলে যায়

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন : পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেক কিছুই বদলে ফেলে। বদলে যাবার এই মিছিলে অনেক পেশার মানুষও তাদের পেশাগত দায়-দায়িত্ব নীতি-নৈতিকতা হতে সরে যান। কিছুটা পরিস্থিতিগত কারণে, অনেকটা স্বার্থান্বেষী মানসিকতার জন্য অনেকেই আপোষ করেন। আপোষ করতে হয়।

প্রতিবেশী ভারতে রাজনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে সাংবাদিকতাকেও পাল্টে দিতে পারে তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন মুম্বাই-ভিত্তিক দল-নিরপেক্ষ সাংবাদিক ও সম্পাদক স্মৃতি কোপ্পিকার ২৩ মে (২০২০) লিখিত তার Migrant Crisis Amid COVID Is Why We Need ‘Journalism of Misery’ শীর্ষক নিবন্ধে। স্মৃতি বলেন, মোদি যুগে ভারতের সাংবাদিকতার পেশায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সাংবাদিকরা সমাজের প্রহরী, মানুষের বাতি।

সাংবাদিকরা দেশ আর জাতিকে পথ দেখান। দেশের সমস্যা-সম্ভাবনাকে জাতির সামনে তুলে ধরেন। সরকারকে সাবধান করেন, যা সরকারকে ইতিবাচক ও দূরদর্শিতামূলক নীতি-নির্ধারণে সাহায্য করে।

ক্ষমতাসীন শক্তির আচরণে সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার ধারা ও আদর্শ যে বদলে যায়, স্মৃতি তাই বলেছেন। স্মৃতি লিখেছেন : সাংবাদিকদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। সে দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে সাংবাদিকতা যেন সরকারের জনসংযোগ শাখায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এমন স্বতঃসিদ্ধ রীতি পাল্টে দেশের নাগরিক কিংবা বিরোধী শিবিরকে এখন ক্ষমতাসীনদের কাছে দায়বদ্ধ করা হচ্ছে।

যখনই সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের নামে নীতি-নৈতিকতার আদর্শ হতে বিচ্যুত হয়ে অন্যকোন শক্তির নেক-নজরে থাকতে উদগ্রীব হন, বৈষয়িক সুবিধা পেতে মরিয়া হয়ে কোন শক্তির শরণাপন্ন হন। সক্রীয়তা-নিজস্বতা হারিয়ে নতজানু হওয়াটাই তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়। তবে এমন পথে যারা পা বাড়াননি, তারাই হলেন ব্যতিক্রম। এদের সংখ্যা নিতান্তই কম। তারাই আদর্শ। তারাই সাংবাদিকতার চেরাগ। এদের স্বীকৃতি নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এদের বিপরীতে যারা হাঁটেন তারাই এখন শক্তিধরদের কাছে আদর্শস্থানীয়।

স্মৃতি লিখছেন : মোদি যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মানে ক্ষমতার কাছে-কিনারে থেকে আরাম-আয়েশে থাকা; সরকারের চাটুকার তোষামোদকারী হিসেবে সরকারের প্রশস্তি করা; অস্বস্তিকর খবর চেপে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি পদক্ষেপকে অভূতপূর্ব হিসেবে প্রশংসা করা; মিথ্যে উপমা সাজিয়ে সত্যকে সরিয়ে রাখা। মোদির তথ্য ব্যবস্থাপনা এই ধরনের মানুষের কর্তৃত্বের প্রতিফলন বিশেষ।

মোদি যুগে ভারত সরকারের কাছে কিনারে রয়েছেন এমন লোকের অভাব নেই, যারা বশীকৃত নন এমন সাংবাদিকদেরকে গালমন্দ করেন না। তাদেরকে ধমক দেন না। মোদি যুগের এই বিষয়টি অন্যান্য দেশের সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি এড়ায়নি।

১৫ ফেব্রুয়ারি (২০১৮) ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল এ রকম: ‘মোদির ভারতে সাংবাদিকরা হুমকি, ফৌজদারি মামলার শিকার।’ক্ষমতা ধরে রাখতে মোদি সংবাদপত্রে সেন্সর আরোপ করেছেন। ‘নিউইয়র্ক টাইমস ও প্রায় একই ধরনের খবর প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের ২ এপ্রিল ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল : ‘মোদির অধীনে ভারতের সংবাদমাধ্যম ততো স্বাধীন নয়’।

এই প্রতিবেদনে ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’ জানায় কীভাবে ৬ মার্চ ভারতের কেরালা রাজ্যের টিভি চ্যানেল ‘মিডিয়া ওয়ান’এর সম্প্রচার সরকারী হস্তক্ষেপের শিকার হয়। খবর সম্প্রচার শুরু হবার ক’মিনিটের মাথায় হঠাৎ সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। চ্যানেলটির কোন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এমনটি হয়নি। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের অজান্তেই পর্দায় ভেসে ওঠে এমন ঘোষণা: ‘আপনাদের অসুবিধা হওয়ার জন্য আমরা দুঃখিত’।

‘টাইমস’ জানায়: ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ই ওই টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের এবং বায়বীয় ঘোষণার নায়ক। কারণ মন্ত্রণালয় ওই টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার ৪৮ ঘন্টার জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তি ছিল নতুন দিল্লীতে মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের হামলার খবর এমনভাবে পরিবেশিত হচ্ছিল যাতে দিল্লীর পুলিশ ও আরএসএস’-এর সমালোচানা রেশ ছিল।

এই ঘটনায় ‘টাইমস’-এর কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ‘মিডিয়া ওয়ান’-এর জনৈক সম্পাদক আর. সুভাষ বলেন: “এটা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হামলা।”

দৈনিকটির মতে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। মোদি চতুরতার সাথে সংবাদমাধ্যমকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চান যা তাকে দেশের নিঃস্বার্থ ত্র্যাণকর্তা হিসেবে চিত্রিত করবে।

‘টাইম্স’ জানায় একই সময়ে সরকারের অর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে সম্পাদকদের ভৎর্সনা করেন, বিজ্ঞাপন বন্ধ করেন, করসংক্রান্ত তদন্তের নির্দেশ দেন, যেন তারা সরকারের-দলের নেতিবাচক দিকগুলো চেপে গিয়ে ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় সহিষ্ণু ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার পক্ষে কাজ করেন।

সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার মোদির প্রবণতা ও প্রচেষ্টার প্রতি ইঙ্গিত করে ‘নিউইয়র্ক টাইম্স’ লিখেছে, ভারতে প্রথম লকডাউন ঘোষণার ঠিক আগে মোদি দেশটির সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকতাদের সাথে কথা বলে সরকারি প্রচেষ্টার অনুকূলে তাদেরকে অনুপ্রেরণামূলক ও ইতিবাচক কাহিনী প্রচারের আহ্বান জানান।

লকডাউনের কারণে ভিনরাজ্যের আটকা পড়া পাঁচ লাখ শ্রমিকদের মধ্যে গ্রামে ফেরতকারী কিছু শ্রমিক মারা যাওয়ায় (বিরূপ সমালোচনা বন্ধের উদ্দেশ্যে) মোদিপন্থী আইনজীবীরা সুপ্রীম কোর্টকে এই মর্মে আদেশ দিতে রাজি করান যে, করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সরকারি তথ্যই কেবল সংবাদমাধ্যম প্রচার করবে।

আদালতের এমন রুলিং’-এর পর শীর্ষসম্প্রচারকদের একটি সংগঠন ওই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় । যদিও বহু বুদ্ধিজীবী এই সিদ্ধান্তকে শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিতকৃত বাক-স্বাধীতার ওপর হামলা বলে অভিহিত করেন ।

‘টাইম্স’ জানায়, ভারতের তথ্যমন্ত্রী প্রকাশ জাভাদকার তার এক সহকারীর সাহায্যে সংবাদমাধ্যমের নীতিমালার বিষয়ে (সাংবাদিকদের সাথে) আলাপ করতে সম্মত হন । কিন্তু এর দুই সপ্তাহ পরেও জাভাদকার তার কাছে ইমেল মারফত পাঠানো এতদসংক্রান্ত কোন প্রশ্নে জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান ।

দৈনিকটির মতে ভারতের বিশাল গণমাধ্যম সাম্রাজ্যে কয়েক ডজন ভাষায় ১৭ হাজারের বেশি সংবাদপত্র, একলাখের বেশি সাময়িকী (ম্যাগাজিন), ১৭৮টি খবরভিত্তিক টিভি চ্যানেল এবং অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে। রয়েছে হাজার হাজার পেজবুক পেজ এবং ইউটিউব, যেগুলো সামাজিক গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত। এইগুলোও পুলিশী অভিযানের প্রবণতামুক্ত নয় ।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’ তার প্রতিবেদনের শেষাংশে উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে: মোদির মন্ত্রীরা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সমর্থন বন্ধ করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেন এমন সাংবাদিকদেরকে চাকরিচ্যুত এবং তার দলকে অস্বস্তিতে ফেলে এমন ঘৃণা-বিদ্বেষ অন্বেষণকারী নিবন্ধ প্রকাশ বন্ধ করতে মোদি সরকার মালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।

একদল অনলাইন সংবাদমাধ্যমে মোদিকে মিত্র হিসেবে সমর্থন দিচ্ছে। এরা স্বাধীন-স্বতন্ত্র সাংবাদিকদের দুর্নাম ছড়ায় ও হয়রানি করে, বিশেষত মহিলা সাংবাদিকদেরকে আটক করে গালিগালাজসহ ধর্ষণ করার হুমকি দেয়।

পুলিশকে উদ্ধৃত করে আমেরিকান এই দৈনিকটি জানায় ২০১৭ সালে আপোষহীন সাংবাদিক হিসেবে প্রশংসিত একটি নারী পত্রিকার সম্পাদক গৌরী ল্যাঙ্কেস’এর খুনের পিছনে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত ছিল।

পত্রিকাটির মতে, সরকারী চাপের শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে, যেহেতু বেশিরভাগ জনগণ প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করেন, তাদেরও উচিত তা-ই করা। মোদিকে সমর্থন করাকেই দেশপ্রেমের প্রমাণ বা সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিধায় সরকার কর্তৃক জাতিবিরোধী হিসেবে ধিকৃত হবার ভয়ে সন্দেহবাদী সাংবাদিকগণ নিজেরাই নিজেদের সেন্সর করছেন।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’ জানায় : কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বিগত কয়েক যুগের মধ্যে মোদি সরকার হঠাৎ বিদেশী সাংবাদিকদের ওপর কঠোরতম বিধি-নিষেধ চাপিয়ে দেন । ভিসা (দেয়ার প্রক্রিয়া) আরো কঠোর এবং অশান্ত উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং আগস্টে রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখা মুসলিম সংখ্যাগুরু জন্মু-কাশ্মীরে বিদেশী সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্মৃতির বক্তব্য দিয়েই বদলে যাওয়া ভারতীয় সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা অনুধাবন করা যায়। এদিকে স্বার্থের ঢালি, স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানি অন্যদিকে নির্যাতন-নিপীড়নের খড়গ।

সব মিলিয়ে মোদি যুগে ভারতে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ধারায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিত্ত-বৈভব, গাড়ি, বাড়ি, ব্যবসাসহ অন্যান্য স্বার্থ-সুবিধা বাগাতে আপোষহীন সাংবাদিকতার জায়গা দখল করেছে আপোষকামিতা। ক্ষমতাসীনদেরকে কাছে সাংবাদিকদের ধর্না, পদলেহন, চাটুকারিতাই এখন যোগ্যতা ও স্বদেশপ্রেমের প্রমাণপত্র। ফলে ভারতে সৎ সাংবাদিকতা, সর্বোপরি বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে অতীতের কাহিনীতে পরিণত হচ্ছে।

২৫ মে, ২০২০, নিউইয়র্ক

You Might Also Like