শিশুদের জন্য উৎসব

কয়েক দিন আগে আমি শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছিলাম। এর আয়োজক ‘চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ’ এবং আমি এই সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট; কাজেই আমাকে যেতেই হবে। ঢাকা শহরের ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়াটা একসময় কঠিন ছিল, এখন সেটা ‘কঠিন’ স্তর পার হয়ে ‘কপাল’ স্তরে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ যত প্রস্তুতি নিয়েই রওনা দেওয়া হোক না কেন, শুধু কপালে থাকলে ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। এই দিনটিতে আমার কপাল ভালো ছিল এবং আমি ঠিক সময়ে পৌঁছতে পেরেছি।

 

সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে গিয়ে আমি পেছনে আমাদের ব্যানারটির দিকে তাকিয়ে একটু চমকে উঠলাম। আমি জানি, বেশ অনেক দিন থেকে এই চলচ্চিত্র উৎসবটির আয়োজন করা হচ্ছে; কিন্তু আমি হঠাৎ নতুন করে অনুভব করলাম যে এটি ১৩তম শিশু চলচ্চিত্র উৎসব। অর্থাৎ এর আগে একবার নয়, দুবার নয়, এক ডজনবার এই উৎসবটির আয়োজন করা হয়েছে। আমি জানি আমার অহংকার করার কিছুই নেই। কারণ আক্ষরিক অর্থেই আমাকে কিছুই করতে হয় না, সব কিছু অন্যরা করে। তার পরও এক ধরনের ছেলেমানুষি গর্বে আমার বুকটা ফুলে উঠল। একটা কিছু হয়তো শুরু করা যায়; কিন্তু সেটাকে চালিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। আমাদের বিশ্বাস না করে উপায় নেই যে এটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ১৩ বছর থেকে চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। কী অসাধারণ একটি ব্যাপার।

 

এই চলচ্চিত্র উৎসবটি যে আসলেই অসাধারণ একটি ব্যাপার, তার অনেক কারণ আছে। প্রথম কারণ এটি শিশুদের জন্য। আমাদের দেশে শিশুদের জন্য কোচিং সেন্টার ছাড়া আর কী আছে? একজন শিশু স্কুলে গিয়ে পুরোপুরি নিরানন্দ পরিবেশে দিন কাটায়। লেখাপড়া মানে এখন পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়, তাই কেউ কিছু শিখতে চায় না। কেমন করে পরীক্ষায় কিছু বেশি নম্বর পেতে পারে শুধু তার কায়দা-কানুন শিখে। স্কুল শেষ করার পর ছেলে-মেয়েদের দিন শেষ হয় না, তারা একটার পর একটা কোচিং সেন্টারে যেতে থাকে! সেই শিশুদের কথা স্মরণে রেখে শুধু শিশুদের জন্য যদি চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়, তাকে অসাধারণ তো বলতেই পারি।

 

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এটি একটি আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব। জোড়াতালি দেওয়া আন্তর্জাতিক উৎসব নয়, সত্যিকারের আন্তর্জাতিক উৎসব এইবার। দুই-তিনটি নয়, ৩৯টি দেশের ১৭৯টি চলচ্চিত্র এই উৎসবে দেখানো হবে। ছোট একটা ঘরে অল্প কয়েকজন বসে ছবি দেখবে না, পাঁচটি ভেন্যুতে একই সঙ্গে সেই সকাল ১১টায় শুরু করে একেবারে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটার পর একটা ছবি দেখানো হবে। অভিভাবকসহ শিশু-কিশোর সবার জন্য উন্মুক্ত। বড় বড় দোতলা বাসে করে স্কুল থেকে ছেলে-মেয়েদের আনা-নেওয়া করা হবে, মা-বাবারা তাঁদের শিশুসন্তানের হাত ধরে ছবি দেখতে আসবেন। এই ২৪ থেকে ৩১ জানুয়ারি পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ শিশু-কিশোরদের জন্য একটি আনন্দ মেলা হয়ে থাকার কথা। বিশ্বাস না করলে যে কেউ এসে নিজের চোখে যাচাই করে যেতে পারেন।

 

আমার খুব সৌভাগ্য, আমি এই দেশের শিশু-কিশোরদের অনেক আয়োজনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, ইনফরমেটিকস অলিস্পিয়াড—এগুলোর সঙ্গে আমি একেবারে প্রথম থেকে জড়িত ছিলাম। এ ধরনের সব কয়টি আয়োজনে আমি সব সময় লক্ষ করেছি একটি নির্দিষ্ট বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা কিছু একটা আয়োজন করি; কিন্তু দেখতে দেখতে বিষয়টির ডালপালা গজাতে থাকে এবং আমরা যেটা করতে শুরু করেছি তার বাইরেও অনেক কিছু করার সুযোগ পেতে থাকি। শিশু চলচ্চিত্র উৎসবেও ঠিক সেই ব্যাপারটি ঘটেছে। শুরুতে ছেলে-মেয়েদের সারা পৃথিবীর সর্বশেষ এবং অসাধারণ চলচ্চিত্র দেখানো শুরু হয়েছিল; কিন্তু এখন শুধু সেই বিনোদনের মধ্যে এটি আটকে নেই। এই চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে ছেলে-মেয়েরা নিজেরাই চলচ্চিত্র তৈরি করতে শুরু করেছে। সেই চলচ্চিত্র স্ক্রিনিং হচ্ছে এবং ভালো নির্মাতাকে শুধু পুরস্কার নয়, নতুন চলচ্চিত্র তৈরি করার জন্য টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্যও করা হচ্ছে। শুরুর দিকে আমরা তাদের তৈরি ছেলেমানুষি ছবি দেখে সন্তুষ্ট হয়েছি, এখন তাদের কাজ দেখে আমরা নিজেরাও চমকে উঠি। এই শিশু চলচ্চিত্র উৎসবটিকে একটি অসাধারণ উৎসব বলার এটি আরেকটি কারণ।

 

তবে এই চলচ্চিত্র উৎসবটি থেকে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া অন্য জায়গায়। আমি সারা জীবন যেটি বিশ্বাস করে এসেছি এখানে ঠিক সেটি ঘটতে দেখেছি। আমি আমার জীবনে সব সময় দেখে এসেছি যে যদি খুব বড় একটা কাজ করতে হয়, তাহলে সেটি করতে হয় ভলান্টিয়ারদের দিয়ে। টাকা খরচ করে অনেক কিছু করা যায় কিন্তু সেই কাজে হৃদয়ের স্পর্শ থাকে না বলে এক জায়গায় এসে থেমে যায়। ভলান্টিয়ারদের কাজ কোথাও থেমে যায় না, সেটা এগোতেই থাকে, এগোতেই থাকে। এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবটি গত কয়েক বছর থেকে একেবারেই কম বয়সী তরুণ ও শিশু-কিশোররা মিলে আয়োজন করছে। চলচ্চিত্র বেছে নেওয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সেগুলো সংগ্রহ করা, উৎসবের আয়োজন এবং স্ক্রিনিং—সব কিছু করে শিশু-কিশোররা। আমাদের মতো বড় মানুষদের বসে চা খাওয়া কিংবা ছবি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। দায়িত্ব দেওয়া হলে শিশু-কিশোররা কত বড় কাজ করতে পারে সেটি নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। এই শিশু চলচ্চিত্র উৎসবটিকে অসাধারণ একটি উৎসব বলার এটি হচ্ছে অন্যতম একটি কারণ।

 

২.

 

এতক্ষণ শিশু চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে কিছু আনন্দের কথা বলেছি, এখন ছোটখাটো কয়েকটি দুঃখের কথা বলি। সংবাদ সম্মেলনে আমরা ঘোষণা করে বলেছি যে আয়োজনের ব্যাপকতার দিক দিয়ে আমাদের এই শিশু চলচ্চিত্র উৎসবটি সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি শিশু চলচ্চিত্র উৎসব। যারা অবিশ্বাসের সঙ্গে ভ্রু কুচকে ফেলেছেন, তাদের আমি খোঁজখবর নিতে বলব। যে সংখ্যক শিশু-কিশোর এই উৎসবে যোগ দেয় এবং এই উৎসবে তারা যে ধরনের সৃজনশীল কাজকর্মে যুক্ত থাকে, সারা পৃথিবীতে তার কাছাকাছি উৎসব বলতে গেলে নেই।

 

এই দেশে টানা ১৩ বছর থেকে এই অসাধারণ একটি উৎসবের আয়োজন করে আসার পরও প্রতিবছর আমাদের মাথা চুলকাতে হয়, দুশ্চিন্তা করতে হয় লজ্জার মাথা খেয়ে নানা প্রতিষ্ঠানের সামনে কাঁচুমাচু করে যেতে হয় এই উদ্যোগটির জন্য প্রয়োজনীয় খরচের টাকা তোলার জন্য। আমাদের চোখের সামনে আমরা যতগুলো শিল্পমাধ্যম দেখি তার মধ্যে চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে সবচেয়ে চমকপ্রদ। তার কারণ ভালো একটা চলচ্চিত্র তৈরি করতে হলে তার জন্য প্রথমেই দরকার একটি অসাধারণ গল্প বা কাহিনি, খুব ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্যামেরাম্যান, চমৎকার একজন ডিরেক্টর। আবহ সংগীত এবং সব শেষে প্রযুক্তিগত কাজ। এত কিছু মিলিয়ে যখন এই শিল্পমাধ্যমটি তৈরি হয়, তখন নিঃসন্দেহে সেটি হয় বিনোদন কিংবা মানসিক বিকাশের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। শিশু-কিশোরদের মাথায় রেখে আলাদাভাবে সেই বিনোদনটির জন্য আমরা যখন উৎসবের আয়োজন করি, তখন আমাদের সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসে না, সেই দুঃখটি আমি মেনে নিতে পারি না।

 

ভাগ্যিস, আমাদের দেশের অর্থ মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের এবং মন্ত্রী মহোদয়দের এই দেশের শিশুদের জন্য মায়া আছে। তাঁরা সাহায্য না করলে আমরা কিভাবে এই উৎসবের আয়োজন করতাম, আমরা নিজেরা ভেবে পাই না। দুটি মন্ত্রণালয় ছাড়া এ দেশের শিশুদের জন্য এখনো যাদের মায়া আছে তার মধ্যে রয়েছে—শিল্পকলা একাডেমি, এশিয়াটিক এক্সপো এবং দীপ্ত টিভি। এ দেশের শিশু-কিশোরদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কৃতজ্ঞতা। তবে কৃতজ্ঞতা যদি জানাতেই হয় সবার আগে কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম এবং আলোকচিত্র শিল্পী মুন্নী মোরশেদ। ছোট শিশুদের সংগঠিত করে কিভাবে তাদের দিয়ে অনেক বড় কাজ করে ফেলা যায়, সেটি তাঁদের মতো করে কেউ জানেন না।

 

আমি যে পত্রপত্রিকা এবং পোর্টালগুলোয় আমাদের নিজেদের কাজকর্মের কথাই একটু বড় গলায় বলার চেষ্টা করছি, তার পেছনেও একটি দুঃখের কাহিনি আছে। এত যত্ন করে, সংবাদ সম্মেলন করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটি শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজনটির কথা সবাইকে জানানোর পরও আমরা অবাক হয়ে দেখি পত্রপত্রিকায় তার কোনো উল্লেখ নেই! আজকাল সংবাদপত্রগুলোও মনে হয় খানিকটা স্বার্থপরের মতো। তারা যেখানে নিজেরা যুক্ত থাকে তার বাইরের খবরগুলো ছাপাতে আগ্রহী হয় না। সংবাদপত্রগুলো যদি শুধু নিজেদের খবরই ছাপাবে, তাহলে আমরা সেগুলোকে জাতীয় সংবাদপত্র কেন বলি?

 

৩.

 

এবারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা প্রসঙ্গে দিয়ে শেষ করি। আমি খুব জোর গলায় বলেছি, খুব বড় কাজ করতে হলে সেগুলো করাতে হয় ভলান্টিয়ারদের দিয়ে। তারাই একেবারে নিঃস্বার্থভাবে এর জন্য কাজ করতে পারে।

 

আমি কিছুদিন হলো একটুখানি দুশ্চিন্তা নিয়ে লক্ষ করছি, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর এই কাজগুলোতে মেয়েরা নিজেদের থেকে এগিয়ে আসছে। ছেলেদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

 

দেশের বড় বড় কাজে ছেলেরা নেই কেন? তারা কোথায়? তারা কী করে? কেমন করে সময় কাটায়? তাদের নিয়ে কি দুশ্চিন্তা করব?

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

You Might Also Like