লালু আবার জেলে

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি মামলায় ভারতের বিহার রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আবার তার ঠিকানা হলো জেলখানায়।

শনিবার বিহারের রাঁচির বিশেষ সিবিআই আদালতে পশুখাদ্য ক্রয়ের দেওঘর ট্রেজারির অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী প্রমাণিত হন রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) প্রধান লালু যাদবসহ ১৭ জন। এর আগে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির আরেক মামলায় জেল হয়েছিল তার।

এমন দিনে লালু যাদব দোষী সাব্যস্ত হলেন, যেদিন তার জন্য আরো একটি দুঃসংবাদ এল। এদিন মানি লন্ডারিং মামলায় তার মেয়ে মিসা ভারতী ও জামাতা শৈলেশ কুমারের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

বিশেষ সিআইবি আদালতের বিচারক শিবপাল সিং লালুকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণার পর তাকে রাঁচির বিরষা মুণ্ডা জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আগামী ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানেই রাখা হবে। ওই দিন দোষীদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হবে।

এর আগে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিসংক্রান্ত বাঁকা-ভাগলপুর ট্রেজারির অর্থ আত্মসাতের মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয় লালু যাদবের। দুই মাস জেল খাটার পর ওই মামলায় জামিন পান এবং এখনো জামিনে রয়েছেন।

দেওঘর ট্রেজারির অর্থ আত্মসাতের মামলার ৩৪ আসামির মধ্যে ১১ জন মারা গেছে। শনিবার আদালত ২৩ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন, যেখানে ছয় জন খালাস পান এবং লালুসহ ১৭ আসামি দোষী প্রমাণিত হন। একই সঙ্গে ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত লালুর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

লালুর আরজেডি জানিয়েছে, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। ৩ জানুয়ারি সাজা ঘোষণার পর আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করবে তারা। লালুর ছেলে তেজ্বস্বী যাদব তার বাবার বিরুদ্ধে আদালতের রায়কে বলেছেন, ‘ট্র্যাজেডি অব এররস।’ উল্লেখ্য, লালুর অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। অন্যদিকে, এক টুইটে লালু যাদব বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবে।’ তিনি নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মহান নেতা প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা, যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং ও ভারতের বাবাসাহেব আম্বেদকারের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে আরেকটি টুইট করেন লালু যাদব। তিনি লিখেছেন, ‘ম্যান্ডেলা, থুকার কিং, আম্বেদকারের মতো মানুষ যদি তাদের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হতেন, তাহলে ইতিহাস তাদের খলনায়কের আসনে বসাতো। পক্ষপাতী, বর্ণবাদী ও জাতিবাদীদের কাছে তারা আজো খলনায়ক। এর বাইরে ভিন্ন কোনো আচরণ কেউ প্রত্যাশা করতে পারে না।’

পশুখাদ্য কেনার ভুয়া বিল দেখিয়ে দেওঘর, চাইবাসা ট্রেজারি থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা হয় লালু যাদব ও তার আমলের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-আমলার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি নড়ে গিয়েছিল গোটা ভারতের রাজনীতি। মামলার তদন্তে নেমে ৬৪টি এফআইআর দায়ের করেছিল সিবিআই, যার মধ্যে ৫৩টি ঝাড়খণ্ডে এবং বাকিগুলো পাটনায়।

উল্লেখ্য, ১৯৯০-১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং ২০০৪-২০০৯ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স জোট সরকারের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০১৩ সালে বাঁকা-ভাগলপুর ট্রেজারির অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর একই ইস্যুতে লালুর বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা অন্য মামলাগুলো বন্ধ করে দেন রাঁচি হাইকোর্ট। আদালত বলেছিলেন, যে মামলায় লালু যাদব দণ্ডিত হয়েছেন, সেই একই ইস্যুতে একই সাক্ষ্য-সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে অন্য মামলাগুলো চালানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে আপিল করে সিবিআই। চলতি বছরের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দেন এবং প্রতিটি মামলা আলাদা আলাদা করে শুনানি করার নির্দেশ দেন। সেই থেকে মামলা চলছে এবং শনিবার দেওঘর ট্রেজারির অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষী প্রমাণিত হলেন লালু যাদব।

রায় ঘোষণার সময় পর্যন্ত লালু যাদব মনে করেছিলেন, তিনি খালাস পাবেন। ছয় জনকে খালাস দেওয়ার ঘোষণার সময় তার মুখে স্বস্তির আভা দেখা যায়। কিন্তু খালাস পাওয়াদের তালিকায় তার নাম না দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তার আইনজীবী তাকে জানান, তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এরপর তাকে কিছু সময় হাজতে রাখা হয় এবং পরে বিরষা মুণ্ডা জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

রায় ঘোষণার পর লালু যাদবের আরজেডির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি ও বিহারের রাজনৈতিক দল জেডিইউ। বলা হয়েছে, এটি বিজেপি ও জেডিইউয়ের চক্রান্ত। তবে জেডিইউ বলেছে, এতে তাদের কোনো হাত নেই। আইন আইনের পথেই চলছে।

তথ্যসূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও আনন্দবাজার অনলাইন