রাষ্ট্রপতির ক্ষমা, আইনগত সিদ্ধতা

১৯৭২ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ২৫ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে এ তথ্য জানা যায়। ১৯৮৭ সালে একজন আসামিকে ক্ষমা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির ক্ষমাসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতাটি সর্বপ্রথম প্রয়োগ করেন। অতঃপর বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০৬ সালে দু’জন এবং ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় একই রাষ্ট্রপতি একজন আসামিকে ক্ষমা করেন। এরপর আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হলে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে আঠার জন এবং ২০১১ সালে দু’জন মৃত্যুদ-াদেশ প্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাজা সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়ে দ-িতদের সব ধরনের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

আমাদের দেশের অপরাধসংক্রান্ত মূল আইনটিকে বলা হয় দণ্ডবিধি। এ আইনটি আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনাধীন থাকাবস্থায় ১৮৬০ সালে প্রণীত হয়। দণ্ডবিধির অধীনে কৃত অপরাধসমূহের তদন্ত ও বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে কি পদ্ধতি অনুসৃত হবে তা ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৯৮ এ সবিস্তার উল্লেখ আছে।

সময় ও যুগের বিবর্তনে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে দণ্ডমূলক অনেক বিশেষ আইন প্রণীত হলেও তদন্ত ও বিচার পদ্ধতির ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক না হওয়া সাপেক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধির প্রাধান্য অক্ষুণœ রয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯নং অধ্যায়ের ধারা নং ৪০১, ৪০২ ও ৪০২এ তে সরকার ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দণ্ড স্থগিত, মওকুফ এবং হ্রাস করার ক্ষমতার বিষয় উল্লেখ আছে। আলোচ্য নিবন্ধের জন্য ধারা নং ৪০১ এর দফা (১), (২) ও (৫) প্রাসঙ্গিক। ধারা নং ৪০১ এর দফা (১) এ বলা হয়েছে যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধের দায়ে দণ্ড প্রদান করা হয়, সরকার যেকোনো সময় শর্তবিহীন অথবা দণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত শর্ত সাপেক্ষে, তার দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত অথবা সম্পূর্ণ বা আংশিক মওকুফ করতে পারে।

উক্ত ধারার দফা (২) এ বলা হয়েছে, সরকারের নিকট যখন দণ্ড স্থগিত বা মওকুফ এর আবেদন করা হয়, সরকার প্রয়োজনে যে আদালতের বিচারক কর্তৃক দণ্ড প্রদান ও নিশ্চিত করা হয়েছে আবেদনটি মঞ্জুর অথবা নাকচ বিষয়ে যুক্তিসহ তার মতামত প্রদানের জন্য বলতে পারে এবং উক্ত মতামতের বর্ণনার সাথে বিচারিক নথির অনুলিপি অথবা উক্ত নথি যে অবস্থায় আছে তা অগ্রগামী করার জন্য বলতে পারে।

একই ধারার দফা (৫) এ বলা হয়েছে এ ধারায় অন্তর্ভুক্ত কোনো কিছুই রাষ্ট্রপতির দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম ও মওকুফের অধিকারের প্রতি হস্তক্ষেপরূপে বিবেচিত হবে না।

ফৌজদারী কার্যবিধির ৪০২ ধারায় বলা হয়েছে দণ্ডবিধির ৫৪ ও ৫৫ ধারার হানি না ঘটিয়ে সরকার দণ্ডিত ব্যক্তির সম্মতি ব্যতিরেকে নিম্নলিখিত যেকোনো দণ্ড পরে বর্ণিত দণ্ডে হ্রাস করতে পারে। যেমন, মৃত্যুদণ্ডের স্থলে যাবজ্জীবন, যেকোন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ডের স্থলে যেকোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, কারাদণ্ডের স্থলে অর্থদণ্ড।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০২ ধারায় বলা হয়েছে, ৪০১ ও ৪০২ ধারাদ্বয়ের অনুবলে সরকারের ওপর প্রদত্ত ক্ষমতা মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগ করা যেতে পারে।
দণ্ডবিধির ৫৪ নং ধারায় বলা হয়েছে মৃত্যুদ- প্রদান করা যেতে পারে এরূপ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীর সম্মতি ব্যতিরেকে এ বিধির অধীনে প্রদত্ত অপর কোনো দণ্ডে হ্রাস করতে পারবেন।
একই বিধির ৫৫নং ধারায় বলা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা যেতে পারে এরূপ প্রত্যেক ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীর সম্মতি ব্যতিরেকে উক্ত দণ্ডকে যেকোনো প্রকারের অনূর্ধ্ব ২০ বছর মেয়াদের দণ্ডে হ্রাস করতে পারবেন।

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং সংবিধানের স্থান অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে। সংবিধানের ৪৮নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন এবং এ সংবিধান ও অন্য কোনো আইনের দ্বারা তাকে প্রদত্ত ও তার ওপর অর্পিত সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করবেন। এ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দান করেছেন কিনা এবং করে থাকলে কি পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবে না।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার বিষয়ে সংবিধানের ৪৯নং অনুচ্ছেদ প্রাসঙ্গিক। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন, বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদ সাংবিধানিক পদ। উভয়কে পদে আসীন হওয়ার পূর্বে শপথ পাঠপূর্বক অন্যান্য বিষয়ের বাইরে ঘোষণা করতে হয় তারা সংবিধানের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন।
দণ্ডবিধির ৫৩ ধারার বিধান অনুযায়ী দণ্ডবিধির অধীনকৃত অপরাধের জন্য অপরাধীদের পাঁচ ধরনের দণ্ড প্রদান করা যায় যথা : মৃত্যুদণ্ড; যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড; সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং জরিমানা।

রাষ্ট্রপতি ও সরকার কর্তৃক ক্ষমা ঘোষণার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকাকালীন এ ক্ষমতা প্রয়োগ করলে কোনো আদালত কর্তৃক প্রশ্ন উত্থাপনের কোনোরূপ সুযোগ থাকে না। অপর দিকে সরকার কর্তৃক এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ সব সময়ই বিদ্যমান।

যদিও সংবিধানের ৫৫(৪) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকারের সব নির্বাহী ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত হয়েছে বলে প্রকাশ করা হবে কিন্তু আক্ষরিক অর্থে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করেন বিধায় তার এ সব কার্যাবলী আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর পরও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের মতামত ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতি বা সরকার কর্তৃক ক্ষমা ঘোষণা অহেতুক বিতর্কের জন্ম দিয়ে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করবে কিনা।

রাষ্ট্রপতি বা সরকার বিচার বিভ্রাট, সাক্ষ্যের অপর্যাপ্ততা, দণ্ডিত ব্যক্তির বয়সের স্বল্পতা বা বার্ধক্য, দুরারোগ্য ব্যাধি প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে কোনো অপরাধীর দণ্ড স্থগিত, মওকুফ বা হ্রাস করলে জনমনে এর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না বরং রাষ্ট্রপতি বা সরকার সহানুভূতি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির সমাধা করায় জনগণ রাষ্ট্রপতি বা সরকারের প্রশংসা করতে কুণ্ঠিতবোধ করে না। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখন যখন রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সরকার অপরাধীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামির দণ্ড মওকুফ করিয়ে নেন।

এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যখন জোড়া খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সুইডেন প্রবাসী জাতীয়তাবাদী দল নেতা ঝিণ্টু দেশে এসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের আদেশে মৃত্যুদণ্ডের দায় হতে মার্জনা লাভ করেন। তখন এ ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। ঝিন্টু দেশে বা বিদেশে বসবাসরত সাধারণ নাগরিক হলে এ ধরনের বিরল মার্জনা লাভের সুযোগ পেত না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তৎকালীন সামরিক আদালতে ঝিন্টুসহ অপর তিন আসামি মানিক, শহীদ ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে শেষোক্ত জনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয় কিন্তু ঝিন্টু বিদেশে পালিয়ে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বাইরে রেখে ২৩ বছর পর দেশে এসে আদালতে আত্মসমর্পণের ১০ দিনের মাথায় নিজের স্বপক্ষে মৃত্যুদ-াদেশ মওকুফ সংক্রান্ত আদেশ হাসিলে সমর্থ হন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে। ২০০৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নাটোরের নলডাঙ্গা থানার রামসার কাজীরপুর আমতলী বাজারে সাব্বির ওরফে গামাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা এসএম ফিরোজসহ ১৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন গামার বাবা রফিকুল ইসলাম। তবে তদন্ত শেষে পুলিশ ২১ জনের নামে চার্জশিট দেয়। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত মামলার রায়ে ২১ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-াদেশ দেন। এর মধ্যে একজন শেষ পর্যন্ত পলাতক থাকেন। কারাগারে আটক ২০ আসামি উচ্চাদালতে আপিল করেন। কিন্তু শুনানি শেষ হওয়ার আগেই আসামিরা এ আপিল প্রত্যাহার এবং কারাগারে থাকাবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন। উক্ত আবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ফাঁসির দ- মওকুফ করলে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে আসামিরা কারাগার থেকে মুক্তি পান।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের অর্ধকাল সময় অতিবাহিত হওয়ার পর জুলাই, ২০১১ সাল। ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুর শহরের মজুপুরের নিজ বাসা থেকে জেলা বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামকে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান আবু তাহেরের পুত্র বিপ্লবের নেতৃত্বে অপহরণের পর তাকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। হত্যার পর নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার সম্ভব হয়নি।
এটি তখন দেশ জুড়ে আলোচিত ঘটনা ছিল। গ্রেফতার আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার পর চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার আদালত বিচারকার্য সমাপনান্তে ডিসেম্বর, ২০০৩ সালে প্রদত্ত রায়ে বিপ্লবসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদ- ও ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দশ বছরের অধিক সময় পলাতক থাকার পর ২০১১ সালের ৪এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি বিপ্লব। এরপর তার পিতা লক্ষ্মীপুর পৌরমেয়র এমএ তাহের পুত্র বিপ্লবের প্রাণভিক্ষা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান কর্তৃক আবেদনটি মঞ্জুর হওয়ায় নিহতের স্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানতে চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি তার স্ত্রীর হত্যাকারীদের এভাবে ক্ষমা করতে পারেন কিনা?

আদালতের ক্ষমতা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কখনো কোনো প্রচলিত আইনের বিধি-বিধানে প্রতিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে এবং আইনের অপপ্রয়োগ রোধে আদালতকে সহজাত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ সহজাত ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগের সুযোগ নেই। কারণ, আইনে সুস্পষ্ট বিধান বা বিধি-নিষেধ দেয়া থাকলে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায় না।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকারটি সাংবিধানিক অধিকার হলেও প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ব্যতীত রাষ্ট্রপতির একক সিদ্ধান্তে এ ক্ষমতাটি প্রয়োগের সুযোগ নেই। মামলা সংশ্লেষে দণ্ড মওকুফের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের ওপর নির্ভর করে যে সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয় এর ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী তার সুপারিশ প্রদান করে থাকেন।

সারসংক্ষেপ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিচারিক আদালতের মতামত গ্রহণসহ মামলাটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক নিষ্পন্ন হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করার আবশ্যকতা রয়েছে। আলোচ্য ক্ষেত্রসমূহে এর ব্যত্যয় হয়ে থাকলে রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজ শপথ দ্বারা বাধিত হওয়ার কারণে সাংবিধানিক অধিকারটি প্রয়োগের পূর্বে প্রশ্ন উত্থাপনপূর্বক নথি ফেরত দিতে পারতেন। বর্তমান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি কোনো প্রশ্ন উত্থাপন না করে নথিতে স্বাক্ষর করে ক্ষমা প্রদর্শন করায় তারা তাদের স্ব স্ব দল ও সরকারের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন এ ধরনের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা নীতি নৈতিকতা এবং সংবিধান অনুসৃত শপথ দ্বারা সমর্থিত কি না?

স্মর্তব্য যে, বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সংবিধান (৪র্থ সংশোধন আইন), ১৯৭৫ দ্বারা ৪৮ নং অনুচ্ছেদের (৩) দফা বিলুপ্ত থাকায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করার আবশ্যকতা ছিল না। তার পরও তারা উভয়ে কখনো প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ভিত্তিমূলে আঘাত করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমার মাধ্যমে একদিকে জনমনে কোনো ধরনের অনাস্থা সৃষ্টি করেননি এবং অপরদিকে এ বিষয়ে সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে নিজেদের নিষ্কলুষ রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ ও ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও এ কথাগুলো সমভাবে প্রযোজ্য।

বর্তমান সরকারের শাসনামলে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ২২ জনকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেয়ার বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেই এ কাজটি করেছেন। সুতরাং এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তিনি নিজের প্রজ্ঞা ও সুনিশ্চিত মতামত দিয়ে ক্ষমা করেছেন। এটা তার মহানুভবতা’।

সাবেক আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের যথার্থতা বিষয়ে বলতে হয়, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক পদধারী হওয়ায় তার সব কার্যই সাংবিধানিক কার্য এবং তিনি শপথ দ্বারা বাধিত বিধায় স্বীয় ক্ষমতাবলে অথবা পরামর্শের অনুবলে কার্য সম্পাদনের সময় দেশের প্রচলিত আইন বা স্বপঠিত শপথের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কিনা তা দেখে সিদ্ধান্ত নিলে জনমনে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না।

পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও রাষ্ট্রপতিকে সাজা মওকুফের ক্ষমতা দেয়া আছে। তবে অন্যান্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রচলিত আইনের অধীন সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত প্রতিকার প্রাপ্তিতে নিষ্ফল হওয়ার পর কদাচিৎ এ ক্ষমতাটি প্রয়োগ করে থাকেন যখন তার কাছে প্রতীয়মান হয় প্রকৃতই অনিয়ম বা পক্ষপাতদুষ্টতা দ্বারা বিচার কলুষিত হয়েছে অথবা শারীরিক বা মানসিক অসমর্থের কারণে ক্ষমার পক্ষে জোরালো যুক্তি রয়েছে।

দেশের সাধারণ জনগণের অভিমত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনের আসামিদের যদি এভাবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে আর এ বিচার ব্যবস্থা বহাল রেখে কী লাভ? তাছাড়া পাল্টাপাল্টি যদি সরকার বদলের পর রাষ্ট্রপতি তার এ সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ করেন তাহলে একদিন দেখা যাবে রাজনীতির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত নিজ দল ক্ষমতায় থাকলে তারা আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে।

সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফের যে ক্ষমতা রয়েছে সে ক্ষমতার প্রয়োগ হতে হবে ন্যায়পরতা, নৈতিকতা ও সংবিধান অনুসৃত শপথ দ্বারা সমর্থিত। এর ব্যত্যয়ে রাষ্ট্রপতি নামক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

লেখক : সাবেক জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিম কোর্ট