রংপুরের লোকছড়া

Rangpur

লোক সংস্কৃতি

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত রঙ্গপুর। ভূ-প্রকৃতি, অবস্থান এবং অনুকূল পরিবেশ থাকায় অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে মানুষের বসবাস শুরু হয়। গড়ে ওঠে সভ্যতা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সংস্কৃতি ও সভ্যতার শুরু থেকেই এ অঞ্চলে এক প্রকার উন্নতমানের রেশমবস্ত্র তৈরি হতো এবং বিশ্বব্যাপী এর চাহিদাও ছিল প্রচুর। এ সব রেশমবস্ত্রের মধ্যে ‘রঙ্গ’ নামীয় এক প্রকার বস্ত্র ছিল। এ অঞ্চলের সকল অধিবাসীদের পরিধেয় ছিল এ রঙ্গবস্ত্র। তারা বছরে তিনটি মাস পরিশ্রম করত আর বাকি নয় মাস রঙ্গরসে, হাসি-তামাশায় কাটাত। তাছাড়া, এ অঞ্চলটি এককালে প্রদেশ নামে পরিচিত ছিল এবং শাসকদের রঙ্গমঞ্চ বা রঙ্গমহল ছিল এখানে। সুতরাং রঙ্গ, রঙ্গম, রঙ্গরূপ, রঙ্গালয়, রঙ্গমঞ্চ, রঙ্গভূমি এমনকিছু শব্দ থেকে রঙ্গপুর শব্দের উৎপত্তি হওয়াটা তাই খুব স্বাভাবিক। একটি লোকছড়া থেকেও এ বিষয়টি বেশ পরিস্কার বোঝাও যায়- রঙ্গ হতে রঙ্গপুর/ হাসি-গানে ভরপুর। আর রঙ্গ নামের এ সমস্ত শব্দ রংপুরের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিকাশে যথেষ্ট অবদানও রেখেছে।

প্রাচীনকালে লেখাপড়ার প্রচলন ছিল না। কিন্তু মানুষের জীবনের যাপিত সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি মানুষ তার আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ-আনন্দ, প্রকাশ করতে যে বিশেষ ভাব মুখে মুখে প্রকাশ করত তা ধীরে ধীরে সাহিত্য হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে রয়েছে দুটি ধারা। একটি পদ্য আরেকটি গদ্য। এই দুই ধারার মধ্যে পদ্যধরার সূচনাটাই আগে। আর এ ধারাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ছড়া সাহিত্যের ভূমিকাটাই মুখ্য। আর প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে সে ছড়াগুলো বেশিরভাগই মুখে মুখে তৈরি করত আর মানুষের মাঝে তা লোকছড়া হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

নিরক্ষর মানুষের তৈরি এসব ছড়া এখনো বাংলাজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অঞ্চলভেদে এ ছড়াগুলোর শব্দ, ছন্দ, মাত্রা, বা বিস্তারে কমবেশি পরিলক্ষিত হয়। উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ রংপুরে রয়েছে তার নিজস্ব ছন্দ, ভাব এবং বিস্তৃতি। অনেক লোকছড়া প্রাচীন অধিবাসীদের পছন্দকৃত শব্দ, ছন্দ, বাক্যের মাধ্যমে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে তার বর্তমান অধিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে জেগে আছে।

ছোট শিশুরা রাতে ঘুমানের আগে অনেক সময় যখন কান্নাকাটি শুরু করে দেয় তখন মায়ের মুখে শোনা যায়-
আয় নিন্দু বায় নিন্দু/ বাবরের পাত
কানকাটা কুকুর আচ্চে/ ঝিৎ করিয়া থাক।

অবশ্য বৃহত্তর রংপুরের সীমারেখার মধ্যেই এই ছড়াটিকে আরেকভাবে উচ্চারণ করতেও দেখা যায়Ñ
আয় নিঁদালি বায় নিঁদালি/ পাইকোড়ের পাত
কানকাটা কুত্তা আইলো/ চুপ করিয়া থাক।
ঘুম পাড়ানি ছড়ার মধ্যে আরো রয়েছে-
আয় নিঁদালি বায় নিঁদালি/ শিয়াল কাটোল খায়
কাইঞ্চা বাড়িৎ যায় শিয়াল/ ধোৎ ধোরা বাজায়।

তবে দিনাজপুর অঞ্চলে ছড়াটি বলা হয় এভাবে-
নিন্দবালী নিন যায়/ পাকইড়ের পাত
নেঙুর কাটা শিয়াল আইসেছে/ চুপ করিয়া থাক।

আবার কখনও শিশুদের বুকে আলতো হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে মা কিংবা দাদীরা বলে থাকে-
মা ওমা এ্যাগিনা ঘর কায় মুছিছে? / ফুলতি মুছিছে।
ফুলতির হাতে কাঁদো পানি/ ফুল ফুটিছে।
মাও গেইছে হাট/ বাপও গেইছে হাট
মাও আনিবে নাড়– মুড়ি/ বাপ আনিবে খাট।
সেই খাটৎ চড়িয়া যামো/ নীলফামারীর হাট
নীলফামারীর চ্যাংড়া গেলা/ তাস খেলাছে
ছাগল বান্দা বুড়াটা/ পাছৎ ঘুতাছে।

ছেলে ভুলানো অনেক ছড়া শোনা যায় রংপুর অঞ্চলে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে বড়রা চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পায়ের ওপরে বসানোর পর তার হাতদুটো ধরে পাদুটো ওপর-নিচে দুলিয়ে দুলিয়ে বলে-
কুকরুশ নাটি/ মইষ্যার কাটি / এ্যাতুগুল্যা আম কোটে পালু?
ভাঙা ডুলির মাঝে/ প্যাট ক্যানে তোর বাজে?
মাইয়্যায় ভাত নাদে/ মাইয়্যাক ধরি ডাঙবার পাইস ন্যা?
ছাওয়া দুকন্যা যে কান্দে!/ ছাওয়া দুকন্যার নাও কি?
আপাল, গোপাল/ চুন খায়্যা মরিয়া গ্যালো / আরে মোর কপ্পাল!

এ ছড়াটিকে কোথাও কোথাও এভাবেও বলা হয়ে থাকেÑ
টুকরুশ নাটুয়া/ ব্যাঙের কাটুয়া/ কী ব্যাঙ?/ হোলা ব্যাঙ?
কী হোলা?/ বাইগোন তালা/ কী বাইগোন?/
ভ্যাকরা বাইগোন/ ভ্যাকরা বাইগোন ন্যাই না
তোমাক হামরা চাই না
কাউয়া করে কা কা/ চৌক মুন্দিয়া গু খা!

কিংবা
ঢ্যাক্কি রে ভাই/ কী রে ভাই/ এদান ক্যানে হলু?
মাইয়্যায় ভাত নাদে/ মাইয়্যাক ধরি ডাঙবার পাইস ন্যা?
ছাওয়া দুকন্যা যে কান্দে!/ ছাওয়া দুকন্যার নাও কি?
আপাল, গোপাল/ চুন খায়্যা মরিয়া গ্যালো / আরে মোর কপ্পাল!

আবার দিনাজপুর অঞ্চলে এটির উচ্চারণ হলো-
ঘুগগু ঘুগ/আল্লিচ্চাং/পাথারত ব্যাঙ
মামি মামি/ ভাত দে/ থালি কই?
চোরে নিগাইছে/ চোর কই?
খ্যারবাড়িৎ সোন্দাইছে / খ্যাড় কই?
পোড়া গেইছে / ছাই কই?
উড়ি পালাইছে / মামার কাইনচাৎ হাগি দেওঁ
বোড় বোড় বোড়।

ছোট ছেলেমেয়েদের হাতের তালুতে কিছু গুঁজে দেয়ার ভান করে এমন ছড়া শোনানো হয়-
কলা থোঁ/ মলা থোঁ/ দুদ থোঁ/ দই থোঁ
কীসে খাইলে?/ বিলাই
তারপর হাতের কব্জিতে আঙুল চালিয়ে বলা হয়-
এ ঘর থাকি ও ঘর যাঁও/ শুকটা পুড়ি পন্তা খাঁও
তারপর পেটের মধ্যে সুড়সুড়ি দিয়ে বলা হয়- কোরম্যাঁও, কোরম্যাঁও, কোরম্যাঁও।
এতে দেখা যায় কান্নারত কোনো ছোট ছেলে বা মেয়ে সুড়সুড়ি পেয়ে কান্নার বদল বেশ হেসে ওঠে।

ছেলে ভুলানো ছড়ার মধ্যে আরও রয়েছে-
ইকরি মিকরি/ চাম চিকরি/ গবরি আজায় দিল পাটি
তাৎ চড়ি যাঁও মকরকাটি/ মকরকাটি নড়েচড়ে
ঘ্যাগা ব্যাটায় ঠোকর মারে/ আয় গোয়ালি ঘরে যাই
দুদ-মাকা ভাত বসি খাই/ না খাই তোর হাতে ভাত
গবরি গবরি গোন্দায় হাত/ এ্যাল পাত ব্যাল পাত
চুল ছিড়ি এক হাত।
কোথাও কোথাও ‘চুল ছিড়ি এক হাত’ এর পরিবতে ‘ছিড়ি ন্যাংটি তোল হাত’ও বলা হয়ে থাকে।

অন্য এলাকার কোনও কিশোর আরেক এলাকায় এসে এবং বেশি দুরন্তপনা দেখালে সে এলাকার কিশোর বা কিশেরীরা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে-
চ্যংরাকোনাক ধরো তো/ কইল্লাভাজা করো তো
নুন নাই ত্যাল নাই/ কোৎ করি গেলো তো।
কিশোরীদের ক্ষেতে প্রয়োগ করতে ছড়াটি এ রকম হয়ে থাকে-
চ্যংরিকোনাক ধরো তো/ কইল্লাভাজা করো তো
কইল্লাৎ ক্যানে পোকা/ ধরো শালির খোঁপা।

কেউ মাথা নেড়ে করলে তার উদ্দেশে অন্যদের যা বলতে শোনা যায়-
নাড়িয়া রে নাড়িয়া/ ভাত দে বাড়িয়া
ভাত ক্যানে নরম/ নাড়িয়া মাতাৎ খড়ম।
কিংবা
নাড়িয়া ব্যাল/ কদুর ত্যাল/ কদু দিয়া মার ঢ্যাল।
কিংবা
নাড়িয়া শোড়ং কচুর বই
তোমার বাড়ি যাবান্নই/ নুন দিয়া ভাত খাবার নাই।
ন্যাড়ার কাছে এমন কথার উত্তরও বেশ চমৎকারভাবে তৈরি রয়েছে রংপুরের লোকছড়ায়-
চুলঅলা রে চুলঅলা/ নাড়িয়া মাতার গু তোলা।

এটি দিনাজপুর অঞ্চলে বলে-
নাড়িয়ারে নুড়িয়া/ইলশা মাছের ঝোল
চপর আইতে কুকুর ভোকে/নাড়িয়া শালা চোর।

অপরিচিত কোনও কিশোরীকে দেখে অন্য কিশোরীরা নাম জানতে চাইলে অথবা আগন্তক কিশোরী নাম বলতে না চাইলে ছড়ার ছন্দে তাকে এভাবে ক্ষেপাতে এ ছড়াটির উদ্ভব-
ও চ্যাংরি তোর নাঁও কী?/ কচু কাটা জিলাপি
ভাতার আসলে কবু কী?/ গোলাপি, গোলাপি।

রোদ-বৃষ্টি নিয়েও লোকছড়া রয়েছে রংপুরে। অতিবৃষ্টির কারণে অতিষ্ঠ হলে বড়রা কান্নারত ছোটছোট ছেলেমেয়েদের বুকে নিয়ে মুখে মুখে উচ্চারণ করে-
এ্যাকান দড়ি দুক্যান নাও/ ওইদ তোলাও রে দ্যওয়ার মাও
বাঙে দিলো ঠ্যাং টানা/ ওইদ ওট রে চনচনা।
কিংবা
ওইদ তোলাও রে দ্যাওয়া/ হাড়িৎ থুঁচু ন্যাওয়া
বউ গ্যাইচে বাপের বাড়ি/ স্যাটে হইচে ছাওয়া।
আবার বৃষ্টির আহবানে বলা হয়-
আয় রে ঝরি শোসেয়া/ বিন্নাবাড়ি ভাসেয়া
ছাগলের নুটিপুটি/ বামনের বিয়া
এক শিয়ালি আন্দে বাড়ে/ দুই শিয়ালি খায়
এক শিয়ালি গোসা হয়্যা/ বাপের বাড়ি যায়।
বাপে দিলে ত্যাল, সেন্দুর/ মাও দিলে শাড়ি,
সেই শাড়ি পিন্দিয়া ব্যাটি/ গ্যালো শ্বশুর বাড়ি।

এই ছড়াটির পরের অংশকে এভাবেও বলতে শোনা যায়-
এক শিয়ালি আন্দে বাড়ে/ দুই শিয়ালি খায়
এক শিয়ালি গোসা হয়্যা/ বাপের বাড়ি যায়।
বাপ হইল্ জমিদ্যার/ পাঁচ কাপড় পায়
পাঁচ কাপড় পায়্যা বউ/ কইন্যামোতি যায়।
কইন্যামোতি, কইন্যামোতি কী করেন বসিয়া,
তোমার ব্যাটা মারা গ্যাইচে বান্দোতে পড়িয়া।

ছড়াটি আরও একভাবে বলা হয়ে থাকে-
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর/ নদে আইলো বান
খ্যাঁকশিয়ালির বিয়্যাও হইবে/ তিন কইন্যা দান।
এক কইন্যা আন্দে বাড়ে/ এক কইন্যা খায়,
এক কইন্যা গোসা হয়্যা/ বাপের বাড়ি যায়।
বাপে দেয় ত্যাল, সেন্দুর/ মায়ে দেয় ফুল,
এমন সোন্দর খোঁপা বান্দে/ হাজার ট্যাকা মূল।

ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কখনও কখনও খেলতে খেলতে ঝগড়া বাঁধলে একদল আগে এবং আরেক দল পিছে পিছে বাড়ি ফেরার সময় পিছের দল আগেল দলকে ক্ষেপিয়ে বলে-
আগে যায় মেথরানী শানটি শুনটি/ পাছে যায় দারগা বাবু হাত্তিত চড়ি।

কোনো মানুষ ঘাড়ে পোটলা বেঁধে কোথায় গেলে তাকে উদ্দেশ্য করে ছোট ছোট কিশোর কিশোরীরা তাকে কী বলবে, এমনকিছু তারা নিজেরা অভিনয়ের মাধ্যমে এভাবে বলে থাকে-
ও বাহে, কোন্টে যান?
ব্যাটির বাড়ি।
কী ধরি?
খইয়ের টোপলা।
দ্যান তো একনা খাই,
পালাই, পালাই।

ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন রকম খেলাধূলার মাধ্যমে লোকছড়ার প্রয়োগ দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীরা কোমরে দুহাত দিয়ে মাটিতে বসে হাঁটতে হাটতে সমানে এগিয়ে গেলে একজন প্রশ্ন করে আর বাকিরা সমস্বরে জবাব দেয় এভাবে-
হাঁস হাস কোন্টে যান?
বোগরার পুল বাতুল।
একটা হাঁস দিয়া যাও,
মা- জ্বি এ্যালা গাইল্যাইবে।
তোমার মা- জ্বিক কচি।
পাচের হাঁসটা নিয়া যাও।
এভাবে এ ছড়াটি পুনরাবৃত্তি হয় এবং এক এক করে পেছনের একজন করে উঠে যাওয়ার মাধ্যমে খেলাটি শেষ করে।

আর একটি খেলা রয়েছে এ রকমÑ মাটিতে হাতের আঙুল ফাঁকা করে রেখে অন্যজন সে ফাঁকা স্থানে আঙুল রেখে রেখে বলে-
ওটোল পোটল/ ঢ্যামনা পোটল
পোটল ক্যানে সেজে না?
ইশ বিশ/ ধানের শীষ
খাইয়্যা ডোবা/ ঊনিশ বিশ।

বিভিন্ন সময়ে আরও যে সমস্ত ছড়া শোনা যায়-
ক)
নটো নটো পাকে না/ বউ-ব্যাটি চাকে না
আজার বাড়ির পাইক আইলো
দে একটা ছিড়ি।
খ)
ঝিঝি ঝিঝি মাগুর মাছ/ বউ তলাইচে দই,
সগারের পাতোৎ মাগুরের ঠুমা/ বউয়ের পাতোৎ কই?
গ)
উল ঝুল কদমের ফুল/ হাড়ো ভাঙা মধুপুর,
কইন্যার বাড়ি কতদূর/ এ্যাটে থাকি বহুদূর
কইন্যা আইলো ঘামিয়া/ ছাতি ধরো টানিয়া
ছাতির ওপর গামছা/ দ্যাকো শালির তামশা।
ঘ)
কানা রে কানা/ মুই তোর নানা
নানা নাই বাড়িৎ/ হাগি দ্যাঁও তোর দাড়িৎ।
ঙ)
বাচ্চা মিয়া সোনার চান্দ্/ গরু দুকনা দোলাৎ বান্দ্
কাইল বিয়াংকা শুনমো/ ট্যাংনা মাছের গান।
চ)
ট্যাংনা মাচের খড়খড়ি/ বোয়াইল মাচের থাও,
না যাঁও মুই গরু ধরি/ বিয়াও আগোৎ দ্যাও।
ছ)
ঢ্যাপা ঢ্যাপা কচুর পাত/ তাৎ ফ্যালানু ছাই,
হাতি আইল্ ঘোড়া আইল্/ ফুল মামুদের ভাই।
রংপুরের লোকছড়ার একটা বড় অংশ প্রবাদ প্রবচন। প্রবাদ প্রবচনের সামান্য কথায় খুঁজে পাওয়া যায় গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থ। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেককিছুই একটি প্রবাদের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

বয়বৃদ্ধ অভিজ্ঞ মানুষজন বিভিন্ন কথা বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেসব প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষ করে গ্রামের মা, দাদী, বা মহিলারা কারও আচরণে ক্ষুন্ন হলে বেশিমাত্রায় এসব কথার প্রয়োগ করেন। এখানে রংপুরে প্রচলিত কতিপয় প্রবাদ-প্রবচন ও তার অর্থ তুলে ধরা হলো-
আদরানি আদরায়/ ভাতারক ধরি কাবরায়(ভণিতা প্রকাশ)।
কোচাৎ নাই কড়ি/ টানে আচল ধরি(সাধ্য নেই অযথা সাধ)।
কোনবা কলে খাইচে ঘি ভাত/ আইজো ঘিউ ঘিউ গোন্দায় হাত(অতীতের সুখ স্মৃতিচারণ)।
কাঙালের ব্যাটা মন্ডলী পাইচে/ হাটবার না পায় পালকি চাইচে(সামান্য উন্নতিতে আড়ম্বর বৃদ্ধি পায়)।
কী হাসিস মাই ফ্যাকোর ফ্যাকোর/ এ্যাকো দিন যাইবে এ্যকো বচর(ভবিষ্যৎ সংকটের প্রতি ইঙ্গত)।
কাজের ব্যালা কাজী/ কাজ ফুর‌্যাইলে পাজী(প্রয়োজনে সমাদর, প্রয়োজন ফুরালে অনাদর)।
কপালে আচে হাড়/ কী করবে চাচা শাকিদার(ভাগ্যে না থাকলে আতœীয় কিছু করতে পারে না)।
কীসে আর কীসে/ ধানে আর তুষে(অসাঞ্জস্য তুলনা)।
কানা খোড়া ভ্যাঙুর/ তিন হারামির ন্যাঙুর(বিকলাঙ্গরাই বেশি দুষ্টু হয়)।
কেরানিগিরি চাকুর পায়া/ কত ঠাহর বাহার/ চাকরিকোনা হেইলে দাদা/ কাইল পাবু না আহার(আয় অপেক্ষা বেশি ব্যয় করলে এই সাবধান বাণী উচ্চারণ হয়)।
কাম নাই খ্যা শিলায়/ সাইর বান্দি মাতা বিলায়(কাজ না থাকলে বাজে কাজে ব্যস্ত হওয়া)।
কতায় কতা কতা বাইর করে/ ভাতের বাইর করে তরকারি/ নিকার বউক্ আগ দ্যাকাইলে/ তঁয় চলি যায় বাপের বাড়ি(কথায় কথা আসে এবং ক্রোধের পরিণতি অমঙ্গল)।
কাম করমো তায় তায়/ কী কইবে ভাতারের মায়?(ঠিক মতো কাজ করলে কেউ ভুল ধরার সুযোহ পায় না)।
কপালে না আটে/ হাপালে হাপালে বাটে(নিজের অভাব তবু অন্যকে দান করে)।
কইনার পিসি/ গাবরুরও মসি(উভয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত)।
কাঁকরার জান যায়/ কউয়ায় ধাপালি খ্যালায়(কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ)।
কইলে মাও মাইর খায়/ না কইল বাপের জাইৎ যায়(উভয় সংকটে পড়া)।
কামারের ভোতরা দাও/ বৈদ্যের কাইশ্লা মাও/ ছাপরবন্দের ভেজে গাও/ খ্যাতা গালাৎ জোলার ছাও(যারা অন্যের কাজ করে তাদের নিজের কাজ হয় না)।
খাওনের আগে দরবারের পাচে/ এই দুই ঠাই লাব আচে(অনস্থানুসাবে অবস্থান গ্রহণ)।
খায় দায় পাখিটি/ বনের ভিতি আখিটি(স্বভাবকে ভোলা যায় না)।
গাঁয়ের লোক পোচে না/ ড্যামকোতে বাঁচে না(অতিরিক্ত অহংকার)।
গরিব মানুষ ফড়িং খায়/ হাত্তিৎ চড়ি হাইগ্বার যায়(অস্বাভাবিক আচরণ)।
ঘরের কতা না কঁও পরোক/ তাঁয় হয় সাত ঘরোৎ(গোপন কথা কাউকে বলতে নেই)।
গালা নাই গান কয় মনের আনন্দে/ বউ নাই শ্বশুড় বাড়ি যায় আগের সমন্ধে(অসামঞ্জস্য সম্পর্ক)।
গরু নাই দোমরা চাষ/ ভাত নাই নাটুয়া গাস(অস্বাভাবিক আশা)।
গাঙ শুকাইলে নদী/ বুড়ি হইলে সতী(বাধ্য হয়ে স্থবির হওয়া)।
গালা নাই চ্যাংরির কয় ক্যানে গীদ/ রূপ নাই চ্যাংরির চঞ্চল ক্যানে চিত(অস্বাভাবিক আচরণ)।
গোলাম পাইলে ধুতি/ তাই দ্যাকে ইতি উতি(ছোট লোককে দয়া দেখালে তার আচরণ বদলে যায়)।
ঘুগরি নষ্ট করে ভুঁইয়ের মাটি/ বাড়ি নষ্ট করে তাওয়াইর ব্যাটি(একাধিক জা এলে বাড়ির ভাবমূর্তি নষ্ট হয়)।
ঘন ফ্যাদলায় বউ তিতা/ থ্যাজা জালে কালাই মিটা(বেশি কথায় পুত্রবধু বিরক্ত হয়)।
ঘ্যাগিক শিন পোচে না/ ঘ্যাগি পালকি ছাড়া নড়ে না(অসামঞ্জস্য আবদার)।
চোরে খায় চম্পা কলা/ চোরের মার ডাঙর গলা(অপরাধীর বাগাড়া¤œর)।
চ্যাং উজায় ব্যাং উজায়/ তাক দ্যাকি ডারকাও উজায়(যোগ্যতাহীনের কাজ করার বৃথা আস্ফালন)।
চ্যাংরা বয়সের ন্যাংগোর প্যাংগোর যুয়ান বয়সে অং তামাশা/ বুড়া হইলে সউগ ফুরি যায় হাটতে ফিরতে হা হুতাশা(সময় উপযোগী কাজ)।
চৌদ্দ পুরুষের নাই গাই/ চাপুর চুপুর দোবার যাই(সামর্থহীনের আকাঙ্খা)।
চোরে চেনে চোরের পাও/ বাগে চেনে ফেউয়ের আও(স্বগোত্রের সমচিন্তা)।
চার বেদ চৌদ্দ শাস্ত্র/ সবার ওপর ডাঙের অস্ত্র(বাহুবলের কাছে নীতি অর্থহীন)।
চৌকৎ নাই পানি/ মিচ্যায় নাক টানি(কুম্ভিরাশ্রæ)।
ছয় ছরৎ ছয় ভাই ছরৎ আবানে কাঞো নাই(সুসময়ে বন্ধু জোটে অসময়ে নাই)।
ছ্যান্নত প্যান্নত তেরখান/ মোর ভাগৎ এ্যাকখান(আনুপাতিক হারে কম খাওয়া)।
ছাইয়ের কুকুর ছাইয়োৎ শোয়/ ম্যাৎরে কাপর পাগারৎ থোয়(অলঙ্ঘনীয় স্বভাব)।
ছোট বইনের স্বামীক দ্যাকি বড় বইন কান্দে/ ত্যাল নাই ছাবন নাই নিত্যি চুল বান্দে(অলঙ্ঘনীয় ব্যবস্থা)।
ছিম্যাক না আটে বানে/ ব্যাটিক না আটে দানে(অস্বাভাবিক চাহিদা)।
জোর যার/ মুল্লুক তার(শক্তিশালিই স্বত্বাধিকারী হয়)।
জাতে না ছাড়ে জাতের খোয় হলদি না ছাড়ে অং/ সাত ধোয়ায় শুকট্যা আন্দলেও ত্যাঁও না যায় গোন্দ(স্বভাব অপরিবর্তনীয়)।
ঝরে বইগ্যা মরে/ ফকিরের জহুরা বাড়ে(অন্যের কাজ নিজের কৃতিত্বে প্রকাশ)
ঝ্যান হ্যাকরা ত্যান হ্যাকরি/ ঝ্যামন পাটাশাগ ত্যামন নাকরি(যেমন বুনো ওল, তেমন বাঘা তেঁতুল)।
ঝাকুয়া গিদালির গালাৎ ডাঙ্গর/ গীদ হয় না খালি ঝকর মকর(অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট)।
ডাংবার সমায় আগবার নাই/ খাবার আছে কইরবার নাই(সময়ে অনেক বন্ধু পাওয়া যায়)।
ড্যাগের মুখের ঢাকনাই/ নেজের কথা বাকনাই(নিজের প্রশংসা নিজে করা)
দ্যাকপু শুনবু কবু না/ কোনো বিপদোৎ পড়বু না(স্বল্পভাষীর বিপদ কম)।
পাচাৎ নাই ত্যানা/ ছ্যাব দি বাজায় ব্যানা(গরিবের বড়লোকী ভাব)।
পান খায়া না খানু চুন/ সেবা পানের কি বা গুণ(প্রয়োজনীয় দ্রব্যকে অবহেলা করা)।
মাও গুণে চাও/ খুটা গুণে নাও(শিল্পীর গুণেই শিল্প)।
যাক দ্যাকবার পায় না/ তাক না হইলে গরু তোলা হয় না(নগন্য জনও কাজে লাগে)।
যার ব্যাটার বিয়া/ তাঁয় না পায় গুয়া(প্রকৃত মালিক অবহেলিত)।
য্যাখকন ওটে প্যাটের বিষ/ ত্যাকন হয় আল্লার উদ্দিশ(বিপদে পড়লে অন্বেষণ, অন্য সময়ে অবহেলা)।
যদি না যাঁও মরি/ দ্যাকিম নয়ন ভরি(পরিণতি দেখার আশা)।
যদি পড়ে কহর/ ত্যাঁও না ছাড়ি শহর(শহরের প্রতি আসক্তি)।
যদি থাকে নসিবে/ ঘুরি ফিরি আসিবে(অত্যন্ত আশাবাদী)।
যে পাতে না খাই ভাত/ কুত্তা-শিয়াল হাগুক তাৎ(যার সাথে সুসম্পর্ক নাই তার অমঙ্গল কামনা)।
যার পাচাৎ গবর/ তাঁয় পায় আগৎ খবর(দুর্ঘটনাকারীর ঘটনার খবর রাখে)।
যার বাদে আন্দিনু ভাত তাঁয় পাইলো পাচ/ পানিয়া মরা নিন থাকি উটি মকর মকর গাস(অকেজো ব্যক্তির অগ্রে আহার)।
যার সাতে মজে মন/ কী বা হাড়ি কী বা ডোম(প্রেম কোনো জাত মানে না)।
যম-জামাই ভাগনা/ এই তিন আপনা(কাউকে খাতির করে না)।
যাঁয় করে পাপ/ তাঁয় হয় আটারো ছাওয়ার বাপ(অস্বস্তিকর পরিবেশ)।
যার মরণ যেটে/ নাও ভাড়া করি যায় সেটে(অবধারিত সত্য)।
য্যামন আসফাটাং/ ত্যামন চিটপাটাং(দর্পচূর্ণ)।
যুতের নাঙ্গল যুতের ফাল/ যুতে যুতে বয় হাল(সোনায় সোহাগা)।
যাঁয় কচ্চিল দয়া/ তাঁয় গ্যাইচে সন্যাসী হয়া(প্রিয়জন বৈরাগ্য সাধন করেছে)।
যে মোর সুরৎ/ ত্যাল মাকে মাতাৎ ঘুরৎ(সৌন্দর্যচর্চার অপপ্রয়াস)।
যে মোর বকরি/ তারে ফির তেহারা দড়ি(নিকৃষ্ট জিনিসের উৎকৃষ্ট যত্ন)।
য্যামন মাও/ ত্যামন ছাও(শিল্পীর গুণেই শিল্প)।
যায় না যায় গয়া/ নষ্ট করে কয়া(কাজ শুরু করার আগেই ফলাফল বললে কাজ হয় না)।

যে দ্যাশের যে ধাক্কা/ খুদি-গুড়ায় এক ফাক্কা(ভালো-মন্দের একই মূল্য)।
শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি/ ব্যাশি গ্যাইলে ঝাটার বারি(ঘন ঘন আতœীয়ের বাড়ি গেলে আদর থাকে না)।
সাজলে গুজলে নারী/ ঝাল্লে মুচলে বাড়ি(পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় প্রকৃত রূপ দেখা যায়)।
হাত্তি ব্যাড়ায় গাঁও গাঁও/ যার হাত্তি তার নাও (ক্ষমতাশালীদের প্রচার বেশি)

রংপুরের লোকছড়ার আরেকটি অংশ হচ্ছে রংপুরের শিলকা বা ধাঁধাঁ (কোথা কোথাও শিল্লোকও বলা হয়ে থাকে)। এসব শিলকা বা ধাঁধাঁ সাধারণত গ্রামাঞ্চলের বিয়ে বাড়ি, পালা, পার্বন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অর্থাৎ যেসব স্থানে লোক সমাবেশ বেশি ঘটে সেসব স্থানে পরিবেশিত হয়ে থাকে। কর্ম-ক্লান্ত গ্রামের মানুষের আনন্দ-উল্লাস বা চিত্ত বিনোদনের বিশেষ কোনো ক্ষেত্র না থাকায় এসবের মাধ্যমে একটু বিনোদনের রেওয়াজ হিসেবে এসব শিলকা বা ধাঁধাঁ অর্থাৎ হেয়ালি কৌতুক প্রাচীনকাল থেকেই পরিবেশনের রীতি হয়ে আসছে।
কথার মারপ্যাচ, অর্থ বিশ্লেষণ এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যেই এসব শিলকার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক সময় উত্তর খুঁজে পাওয়া না গেলেও এর একটা উত্তর মেলে এবং সেটা মেনেও নিতে কেউ আপত্তি বা যৌক্তিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করে না।

এসব শিলকা বা ধাঁধাঁ রংপুরের লোকছড়ার আদি নিদর্শন। রংপুর অঞ্চলে বহুল প্রচলিত কিছু শিলকা বা ধাঁধাঁ এখানে তুলে ধরা হলোÑ
আই মাই/ ঘর আচে তার দুয়ার নাই(মশারি/কবর)।
আকাশোৎ ঘর পাতালোৎ দুয়ার/ আইসা যাওয়া করে নন্দ গোয়াল(বাবুই)।
আছার মারলে ভাঙে না/ টিপ দেলে সয় না(ভাত)।
আজার বাড়ির দামড়া/ তরলে তরলে চামড়া(কলার গাছ)।
আজার ব্যাটি ধোন্দলা প্যাটি/ বিনা কোদালে খোড়ে মাটি(শুকুর)।
আজার দড়ি ফ্যালাইতে পারি/ গোচাই না পারি(রাস্তা)।
আজার দড়ি ভিজ্যাইতে পারি/ শুকাইতে পারি না/ হাজার বাধা দ্যাঁও নড়াইতে ছাড়ি না(জ্বিহবা)।
আজার ঘরে ধানের খোপ/ পাকেও না ফোলেও না/ আই= হইলে থাকেও না(হাটবাজার)।
আট পাঁও ষোলো হাঁটু/ বসি আচে বীর বাটু/ শুকানোৎ ফ্যালে জাল/ আহার করে সর্বকাল(মাকড়সা)।
আড়াবাড়ি থাকি ব্যাড়াইল টিয়া/ সোনার টুপি মাতাৎ দিয়া(কলার মোচা)।
আড়াবাড়ি থাকি ব্যাড়াইল সাপ/ ন্যাঙুর ধরি মারনু পাক(সর্দি)।
আড়াবাড়িৎ মেনি গাই/ টাপুর টুপুর ছ্যাইক্প্যার যাই(কূপ থেকে পানি উঠানো)।
আড়াবাড়িৎ বাদনু গাই/ চাপুর চুপুর দোবার যাই(ডেরু, মাছ ধরার যন্ত্র)।
আড়াবাড়িৎ পোতা খুটা/ তার দুদ এ্যা¤িœ মিটা(মধু)।
আসমান থাকি পইল/ থ্যাবড়া নাগি অইল(গোবর)।
াসমান থাকি পইল ট্যামকি, ট্যামকি আগুন জ্বলে/ সোনার ট্যামকি ভাঙলে কাঁয় জোড়া দিতে পারে(ডিম)।
আসমান থাকি পইল ঘোড়া/ ঠ্যাং ভাঙি হউল্ মরা মরা/ কাট খায় খুরমা হাগে/ এইকনা ঘোড়া কোন্টে থাকে?(গাছের ডালের খড়ি শুকিয়ে, পুড়ে আঙড়া)।
আসমান থাকি পইল ধুম/ ধুম কয় মোক পুকটি চুম(চুম)।
আসমান থাকি পইল ভ্যাট/ ভ্যাট কয় মোর কাটেক প্যাট(সুপারি)।
চলা মাচের পিচলা ঘাট/ বারো গচের এক পাত(এক বছর)।
ইত্তির গচোৎ বিত্তি নাচে/ফিরিয়া দ্যাকো মরিয়া আচে(বাতি)।
ইদি নাচে উদি নাচে/ তোমার বাড়িৎ তাঁয় কি আচে?(কুশ্যি/মুগুর)।
ইটা গুড় গুড় ভিটাৎ বাড়ি/ কোন জন্তুর জিব্যাৎ দাড়ি?(শামুক)।
ইটা গুড় গুড় ভিটাৎ বাড়ি/ কোন জিনিসের ওপরোৎ চামড়া নেচোৎ দাড়ি?(পিঁয়াজ)।
ইরকিচি বিরকিচি/ নাই চোচা নাই বিচি(লবণ)।
ইর গ্যানু বির গ্যানু, গ্যানু ধাপের হাট/ এ্যাকনা বুড়ির দ্যাকিয়া আনু ফলের ওপর পাত(আনারস)।
ইর গ্যানু বির গ্যানু, গ্যানু ধাপের হাট/ এ্যাকনা বুড়ির দ্যাকিয়া আনু ষোলো পাটি দাঁত(জোয়ার)।
ইর গ্যানু বির গ্যানু, গ্যানু ধাপের হাট/ এ্যাকনা বুড়ির দ্যাকিয়া আনু এ্যাকে কোনা দাঁত(কাঁরাইল)।
ইল শুকাইল বিল শুকাইল শুকাইল গাঙের পানি/ গচের মাতাৎ পানি আচে তাও হামরা জানি(ডাব)।
উটিতে ঝটাং পটাং পড়িতে পাহাড়/ লক্ষ লক্ষ জীব মারে না করে আহার(ঝাঁকি জাল)।
এটার ভেতর ওটা দিয়া/ দুইজোনে আচে শুতিয়া/ ভাতার মাইয়া শুতি কয়/ যেটা ভাবিস সেটা নয়(দরজার খিল)।
এ্যাকজোড়া জামিরের রস/ টোকা দেলে পড়ে রস(চক্ষু)।
এ্যাক হাতির তিন মাতা/ খায় হাতি রাজ্যের পাতা(চুলা/উকুন)।
এ্যাক মুট সরজ্ঞার কাটি/ কাঁয়ো আগায় কাঁয়ো ভাটি(হাটের লোক)।
এ্যাক গচে তিন নারিকেল/ পাড়ো বাপুরে খাই/ তোমরা আচেন দুই বাপৎ/ হামরা আচি দুই বাপুৎ/ এ্যাকটা করি যোন পাই(ছেলে, পিতা, দাদা)।
এ্যাক ভাই সাগরোৎ এ্যাক ভাই নগরোৎ এ্যাক ভাই গচের আগালোৎ/ তেনো ভাইয়ের মরণ হয় এ্যাকে পাগারোৎ(পান, সুপারি চুন)।
এ্যাক দিনে জন্ম হইল ভগিনি দুইজোন/ মাও আচে বাপ নাই বিধাতার গটন/ দুই কইন্যার এ্যাক নাঁও দ্যাকতে এক বহর/ শিশুকালে নিয়েচে মস্তকে কাপড়(স্তন যুগল)।
এ্যাকনা কঞ্চ্যা ভ্যাকা কোকা/ ফুল ধরে তার ঝোঁকা ঝোঁকা(সজনা)।
এ্যাকনা গচ ঝাপুর ঝুপুর/ তাৎ চড়ি থাকে কালা কুকুর(উকুন)।
এ্যাকনা বুড়ির পিটৎ কুজ/কুজ বয়া পড়ে পুজ/ বারো জোন ভাতার তেরো জোন নাং/ প্যাটের ভোকৎ চ্যাচায় ব্যাং ব্যাং(কলুর তেলের গাছ)।
এ্যাকনা পকি ধান খায়/ ফিচাৎ পারা দেলে উড়ি যায়(ঢেঁকি)।
এ্যাকনা বুড়ি হাট যায়/ গালেমুকে চড় খায়(মাটির পাতিল)।
এ্যাকনা বুড়ি খই খায়/ মানুষ দ্যাকলে দুয়ার দ্যায়(শামুক)।
এ্যাকম হাড়ি ট্যামক গাড়ি/ কোন কুমারে গড়াইচে/ সোনা রুপায় ভরাইচে(ডালিম)।
এ্যাটে দিনু টিপা/ অপম্পুর গ্যালো সিপা(টর্চ লাইট/বন্দুক)।
এ্যাট্টে গাড়নু গচগচালি অপ্পুর গ্যালো ঠ্যাক/ টুনি পকি ভাসা কচ্চে চৌক ভ্যাল্টে দ্যাক(সড়ক, রাস্তা)।
এ্যারু ব্যারু কমর সরু/ এ্যারু যদি জোর করে/ শিয়ান মানষোক ঘাড়ৎ তোলে(খড়ম)।
এ্যামন করন করে/ কানের মাকড়িসহ নড়ে(বাটনা বাটা)।
ওত্তর থাকি আসিল বামন/ খাবার দিনু কালা হাইলোন/ বামন খায়া চলি গ্যালো/ যেটকার হাইলোন স্যাটে অইলো(হুকা)।
ওপর থাকি পইল মুলা/ কাটিকুটি এক কুলা(কাঁঠাল)।
ওপরোৎ কাসা তলোৎ কাসা/ মদ্যখানোৎ নাল তামাশা(মশুরের ডাল)।
ওপরোৎ হলুদ ভেতরোৎ ধলা/ বুঝিলে মুর্খে বোজে না বুজিলে পÐিতে বোজে কলা(কলা)।
কালা কালা ভোমরা কালা ঘাস খায়/ আইৎ হইলে ভোমরা ঝোলার মদ্যে যায়(ক্ষুর, কাঁচি)।
কালা কচু পানিৎ ভাসে/ হাড্ডি নাই গোস্ত আচে(জোঁক)।
কালা ছাগল ঘাস খায়/ মুক খুচি খাইলোৎ সোন্দায়(চুল কাটার কাঁচি)।
খোদার কি কুদরোৎ/ নাটির ভেতর শরবোৎ(আঁখ)।
গইর পারে গইর পারে/ খাড়া হইলে প্যাট ভরে(সুতা পাকানোর টাকরইশ)।
গচ কাট গচালি কাট গচের কাট মাজা/ শত শত কুড়ালে কাট ত্যাঁও না যায় কাটা(ছায়া)।
গালা কাটা বুড়ি/ নিত কপালে গুড়ি(গরু বাঁধা খুঁটা)।
গোলাকার বীর এক সর্ব গায় শিং/ দেড় কুড়ি অন্ড তার মোটা এ্যাকটা লিং(কাঁঠাল)।
গোড়া মোটা আগাল সরু/ গোটায় গেলে মানুষ গরু(গোয়াল ঘর)।
গুলি করনু ফাঁকৎ/ যায়া নাগিল নাকৎ(বায়ু নিঃস্বরণ করা)
গ্যাচিনো মিয়া সাইবে হাটে/ এ্যাক চাওয়া দুই মায়ের প্যাটে(দরজার হুড়কা)।
ঘোমটা টানি বইসে বউ পর পুরুষের কাচে/ দিবার সময় কোচর মোচর মদ্যে গ্যাইলে হাসে(ফেড়িঅলার নিকট চুড়ি পরা)।
চাইরো পাকে থাকুস থুকুস মদ্যখানোৎ খাল/ শুঙি দ্যাকলে ভোটকা গোন্দায় খাইতে নাগে ভাল(মজা সুপারি)।
চাইরো পাকে গাটুম গুটুম মদ্যৎ এ্যাকান হাড়/ এই কিচ্চা ভাংবার না পাইলে খবিু কুত্তার নাড়(খড়ের গাদা)।
চিক চিক্কা/ ভুই নিক্কা/ তিন টিক্কা/ ছয় চক্কা(একটা হাল, এক হালুয়া, দুই গরু)।
চুট্টুৎ পাকড়া/ মদ্যৎ ভ্যাকরা/ তার নাঁও খই/ কয়া দিব্যার নই(খই)।
ছোট এ্যাকনা পকি অলিগলি যায়/ সারা গাও বাদ দিয়া চৌক দুকনা খায়(ধূঁয়া)।
ডাল খোস খোস পাতা খোস খোস ফল নোদা নোদা/ এই কিচ্ছা ভাংবার না পাইলে গুষ্টিসুদ্দায় ভোটা(কুমড়া)।
তলে গুড় গুড় ওপরে ছাতি/ তাক খায় মানষে আশিন কাতি(কচু)।
তুই থাকিস ডালে ডালে মুই থাকোঁ খালে বিলে/ দুইজোনের দ্যাকা হয় মরণের কালে(মাছ, মরিচ)।
ত্যাল চুক চুক পাতা/ ফলের ওপর কাঁট/ পাকলে নাগে মদুর মতো বিচি গোটা গোটা(কাঁঠাল)।
থাকের ওপর থাক তারে ওপর থাক/ সবার ওপর কালা কুত্তা তার ওপর বাগ(হুকা)।
থাল ধুমধুম থাল ধুমধুম থাল নিয়া গ্যালো চোরে/ বাগান বাড়িৎ আগুন নাগচে কে নিব্যাইতে পারে?(রোদ)।
থালি থুম থালি থুম/ থালি নিয়া গ্যালো চোরে/ ভাট্টা বাড়িৎ আগুন নাগচে কাঁয় নিব্যাইতে পারে(সূর্য)।
দশজোনে দাবড়ায় দুইজোনে ধরে/ তালাপুরে বিচার করি চান্দির ওপর মারে(উকুন মারা)।
দশজোনে ধরে/ বত্রিশজোনে করে/ এ্যামন করন করে অক্ত বাইর করি ছাড়ে(পান-সুপারি খাওয়া)।
দুইখ্যান চাল এ্যাকান বাতি/ এই ঘর পাওয়া যায় কোন্ ভিতি?(কলার পাতা)।
দুইজোনে দ্যাকে দশজোনে দৌড়ায়/ পাঁচজোনে ধরে বত্রিশজোনে খায়(মানুষ)।
দুই ঠ্যাং ফাঁক করি/ মদ্যে দিলাম টপ করি/ চাপ দেলে কাজ হয়/ যেটা ভাবিস সেটা নয়(যাঁতি)।
দেলে ফাঁক করে/ না দেলে রাগ করে(ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া)।
পশ্চিমে ঝলমল উত্তরে বান/ গচি মাছে আÐা পাড়ে পাথরের সামান(পানি কুমড়া)।
পি পি পি/ ল্যাজ দিয়া পানি খায় তার নাঁও কি?(কুপি/বাতি)।
প্যাটোৎ দাঁত পিচাৎ জিবা/ এ্যাই শিলকা বুজি দিবা(ডেরু)।
পুবে ডগমগ পশ্চিমে বান/ শুদিশল্লি ডিম পাড়ে পাথরের সামান(সূর্য)।
বড়লোকে নাড়ে চাড়ে ছোট লোকে খায়/ কন্ত দ্যাকি একনা জিনিস কোন্টে পাওয়া যায়(মহিলাদের বুকে, স্তন)।
বাচ্চা কলে কাপড় পেন্দে বস হইলে খোলে/ দেনে দেনে দেগল হয় বাতাসেতে ঢোলে(বাঁশ)।
বাঁচিলে এক মরিলে দউ/ কাম কাজ করি তুলিয়া থুই(ঝিনুক)।
ব্যাৎ বাড়িৎ ফ্যালানু ছুরি/ ব্যাৎ কাটা যায় আটারো কুড়ি(ক্ষুর)।
রিউ রিউ রিউ/ সর্ব শরীল পোড়া যায় পাচাৎ থাকে জিউ(বিন্নার থোপ)।
ভই দম দম বেচন কালো/ মুক নাই তার জবান ভালো(বই, পুঁথি)।
ভুই ঢলো ঢলো বিচন কালো/ মুক নাই তাঁয় কয় ভালো/ ঠ্যাং নাই যায় বহুদূর/ পিন্দি আইসে কালা স্যান্দুর(চিঠি)।
মাইয়্যায় কয় মুই নিত্যি দ্যাঁও/ তোরা এ্যাকদিন দ্যাও/ বাটাৎ আচে পান সুপারি তুলি নয়া খাও(ঘরের দরজা)।
মাজ সাগরোৎ তালের গচ তাতে ব্রহ্মের বাসা/ কায়োঁ খায় কায়োঁ চায় কায়োঁ করে আশা(হুকা)।
সারা দুনিয়া নড়ে যুগি আসন ধরে/ গা’র গোস্ত খুলি খায় ত্যাঁও না আও করে(খড়ের গাদা)।
সিপায় অরি বরি পাতায় হাবিলদাস/ ফুল নাই ফল নাই ধরে বারো মাস(পান)।
হাত নাই পাও নাই গড় গড়েয়া যায়/ পিটিৎ চামড়া নাই সর্বলোকে খায়(পানি)।
হামরা দুই ভাই কিষ্যান খাটি খাই/ পুকটির ভেতরোৎ নউগ দিয়া ডুগডুগি বাজাই(কাঁচি)।
হায় আল্লা করি কি/ বোটা নাই ধরি কি?(ডিম)।
হির হির কইঞ্চার টান/ কোন জন্তুর এ্যাক কান?(বন্দুক)।
হেট কলসি ওপরে দÐ/ পাতা হয় খÐ খÐ/ যদি হয় তার ফুল/ হাজার টাকা মুল(ওল)।

এমন অনেক প্রবাদ প্রবচন বা শিলকা রংপুরের লোকছড়া সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এগুলো রংপুরের লোকছড়ার আদি নিদর্শন। এসব সংরক্ষণে সকলের যতœবান থাকা উচিত।

সহায়ক গ্রন্থ/ব্যক্তি-
(১) রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও প্রয়োগরীতি, মতিউর রহমান বস্নীয়া,
(২) লেখক মতিউর রহমান বস্নীয়া ও তার লেখা, মোনালিসা রহমান,
(৩) জাহানারা বেগম, কাছনা, নিউ সাহেবগঞ্জ, রংপুর,
(৪) অনন্য আমিনুল, দিনাজপুর,
(৫) বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা।
(৬) গ্রাম থেকে লোক মুখে সংগৃহীত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *