মূর্তি বনাম ভাস্কর্য

আরিফুল হক
“ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে ডেকে বললো, হে আামার কওম! আমি কি মিশরের অধিপতি নই? এই নদীগুলো আমার নিম্নদেশে প্রবাহিত হয়, তোমরা কি দেখনা? অতঃপর সে তার সম্প্রদায়কে বোকা বানিয়ে দিল। ফলে তার কথা মেনে নিল। নিশ্চয় তারা পাপাচারী সম্প্রদায়। অতঃপর যখন আমাকে রাগান্বিত করলো তখন আমি তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিলাম এবং নিমজ্জিত করলাম।”(৫১-৫৫)
কথাগুলো বললাম এই কারণে যে, বর্তমান বাংলাদেশে ফেরাউন শাসন চলছে! ফেরাউনের দম্ভোক্তি, তার হিরোকাল্ট চিন্তা থেকে,ফেরাউন যেমন তার রাজ্যে, রাজা রানী সিংহের মূর্তি নির্মাণ করে নিজের বংশের ভাবমূর্তি চিরস্থায়ী করার চিন্তা করেছিলেন, তেমনি ফেরাউনী চিন্তানিয়ে,বাংলাদেশের একটি পরিবার,তার এক সদস্যের শতশত মনুষ্যমূর্তি নির্মাণ করে, তাকে দেবতা বানিয়ে,পূজার বেদীতে বসাতে চাচ্ছে! আজ ১,৩২০০০ মসজিদের দেশে সর্বত্রই মূর্তির ছড়াছড়ি!
শয়তানের ছলনার অভাব হয়না। দেশের ৯১% মুসলমানকে ছলনার জালে আটকে রেখে, কৌশলে মূর্তি তৈরির দুরভিসন্ধীটা চালিয়ে যাবার জন্য ওরা মূর্তির নাম দিয়েছে ভাস্কর্য! প্রচারে, ইস্তাহারে, যুক্তিতে, উক্তিতে সর্বত্রই, মূর্তিকে ভাষ্কর্য বোঝানর প্রয়াস। তার জন্য একঝাঁক কলমবাজ, বকমবাজ, অস্ত্রবাজ, গুন্ডারাজকে পথে ঘাটে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা ধরে মেরে বোঝাতে চাইছে যে, তাদের পিতা পিতামহের মূর্তি বসানোর যে উৎসব দেশ ব্যাপী চলছে, সেটা মূর্তি নয়, ভাষ্কর্য। আর ভাষ্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। সুতরাং এই নির্মানে যারা বাধা দিতে আসবে তারা মৌলবাদী রাজাকার। তাদের বুড়ীগঙ্গার পচাপানিতে ফেলে মারা হবে, নয়ত ঘাড় মটকে দেয়া হবে!
উপায়ান্তর না দেখে, আমি বড় ডিকসনারি স্যারের শরণাপন্ন হলাম! Sir, what is sculpture? and what is images or idol? ডিকসনারি স্যার বললেন, Sculpture is the art of chiseling and carving images in the stone, wood or metal. অর্থাৎ যে ছবি প্রস্তর গাত্রে খোদাই করে, বা কাঠে খোদাই করে করা হয় তেমন শিল্পকে sculpture বা বা ভাষ্কর্য বলা হয়!!
আর মূর্তি, Statue, image, বা Idol হলো ‘A reproduction of appearance of someone or something. অর্থাৎ কাহারও অথবা কোনকিছুর হুবহু প্রতিকৃতি নির্মানকে মূর্তি image, বা idol বলা হ বলা হয়!
তাহলে সহজভাবে বুঝতে হলে বলা যাবে, যে আকৃতি খোদাই করে তৈরি করা হয়, এবং সেই আকৃতির রোদে বা আলোর বিপরীতে ছায়া পড়বেনা, সেটা ভাষ্কর্য ।
অপরপক্ষে যে প্রতিকৃতি অবিকল মানুষ, পশু, বা পৌরানিক আকৃতি মত,যার অবয়বের ছায়া পড়ে, তা হল মূর্তি। বড় বড় ডিকসনারি স্যারদের সবার এই একই মত।
কিন্তু কথা হল মতলববাজদের ডিকসনারি তো আলাদা। তারা বড় স্যারদের ডিকসনারি মানবেন কেন! তারাতো নিজেরাই ডিকসনারি তৈরি করে। সেই ডিকসনারি না মানলে হেলমেট বাহিনী আছে, তারা শিখিয়ে দেবে কি করে তাদের ডিকসনারি মানাতে হয়। যেমনটা দেখাগেল বায়তুল মোকাররম মসজিদের নামাজীদের ক্ষেত্রে, চট্টগ্রামের আলেমদের সমাবেশের ক্ষেত্রে!
আসলে, রাষ্ট্রীয় অর্থের শ্রাদ্ধ করে এই মূর্তি উৎসব করা একটা মিশন এ্যান্ড ভিশনের অংশ। মিশন টি হল ১৭কোটি মুসলমানের হৃদয় থেকে ইমান, আকিদা, ধর্মবোধ, জীবনধারা সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে সেখানে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের বীজ বপন করা। এ চাষাবাদ বহু আগেই শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকেই বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এসিডটেষ্ট শুরু হয়ে যায়। ৭২ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভাষ্কর্যের নামে মূর্তি তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। ১৯৯৩ সালে দৈনিক ইনকিলাবে, “মসজিদ নগরী কি মূর্তির নগরীতে রুপান্তরিত হবে শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলেছিলাম, “ খবরে প্রকাশ, ১৯৯৫ সালের মধ্যেই নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দু শো ভাষ্কর্য-মূর্তি স্থাপন করা হবে। ১৫ টি মূর্তি ইতোমধ্যেই স্থাপন করা হয়েছ, ৯৫ টি নির্মিত অবস্থায় রক্ষিত আছে। বাকি গুলো নির্মানের তোড়জোড় চলছে। একটা বিশেষ মহল নাকি এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহন এবং বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে”। আরও বলেছিলাম “ইসলাম ও মূর্তি একসঙ্গে অবস্থান করতে পারেনা”! তখনও আলেম সমাজ, মুসলমান সমাজ ঘুমে অচেতন ছিলেন। কোন সাড়া দেননি। আজ বিশ্ববিদ্যাল্য় চত্ত্বর পার হয়ে মূর্তির রক্তবীজ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ আগাছা নির্মূলকরা একা আলেম সমাজের পক্ষে সম্ভব নয়! সকল মতের তৌহিদী জনতা এক হয়ে এই মূর্তির রাজনীতি কে নির্মূল করতে করতে না পারলে দেশ থেকে মুসলমান শক্তিই নির্মূল হয়ে যাবে।
রাশিয়ায়, পোল্যান্ডে যখন লেলিনের মূর্তি ভাঙ্গা হলো, তখন কেউ বলেনি লেনিনের ভাষ্কর্য ভাঙা হয়েছে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের দাম্ভিকতার প্রতীক ব্রোঞ্জমূর্তি যেদিন টেনে নামালো হল, কেউ বলেনি সাদ্দামের ভাষ্কর্য নামানো হলো । সকলেই ওগুলোকে মূর্তিই বলেছে। ভারতে গান্ধীজীর ৫২ ফুট উঁচু মূর্তি কিংবা বল্লভভাই প্যাটেলের ৬০তলা বাড়ীর সমান ৫৯৭ ফুট উঁচু মূর্তিকে কেউ বলেনা ওগুলো ভাষ্কর্য। ওগুলো মূর্তি হিসাবেই পূজিত হচ্ছে। শেখ মুজিবের মূর্তি ভাষ্কর্য হবে কোন যুক্তিতে!
হাজার হাজার বছর আগে মুসলমানরা এদেশে এসেছে, কখনও ধর্মপ্রচারক বেশে কখনও বিজয়ী শাসনকর্তা হিসাবে। তাঁরা কেউ আপন মূর্তি নির্মান করে চিরঞ্জীব হওয়ার প্রয়াস পায়নি। হিরো ওয়ারশিপ একজন মুসলমানকে তার ধর্মীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে।
শেখ মুজিবের মূর্তি নির্মান করে ফুল দিয়ে পূজো করা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এভাবেই তারা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মবোধে পৌত্তলিকতা আনার চেষ্টা করছে। ১৭কোটি মুসলমান যদি হাতে হাত রেখে ওই নাস্তিক মুরতাদদের অপচেষ্টা এখনই রুখে দিতে না পারে তাহলে জাতি হিসাবে বাংলাদেশীরা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। আজ প্রয়োজন সমবেত শক্তির উদ্বোধন ।
জাতীয় কবির সেই সাবধান বানী উচ্চারন করে লেখা সমাপ্ত করবো।

“সদ্য প্রসূত শিশুটিরে পিয়ায় অহর্নিশ
শিক্ষা দীক্ষা সভ্যতা বলি,
তিলে তিলে মারা বিষ।”