ভাষ্কর্য প্রশ্নে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন :

বিষয়টি অবশেষে আদালত পর্যন্ত গড়াল। বিতর্কটি শুধুই ভাষ্কর্য নিয়ে হলে হয়তো এতটা উত্থাপ ছড়াত না। পরিস্থিতি এতটা উত্থপ্ত হওয়ার কারণ, নির্মীয়মান ভাষ্কর্যটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি এ দেশটির স্থপতি। এ দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য ‘৭১-এ মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তদীয় কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ দেশ পরিচালনা করছেন।

বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য গুণগ্রাহী এ উদ্যোগটিকে এই মুজিব বর্ষে তাঁর স্মৃতিকে ভাস্মর করে রাখার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, এদেশের আলেম উলামাদের একটি বড় অংশ ভাষ্কর্য নির্মাণকে অনৈসলামিক বিবেচনা করে এর কঠোর বিরোধিতায় নেমেছেন। শুরুতে বিবদমান দু’ পক্ষের মধ্যে বিতর্কটা উত্থপ্ত বাক্য বিনিময় ও পাল্টা-পাল্টি মিছিল সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকলেও কুষ্টিয়ায় নির্মীয়মান বঙ্গবন্ধুর একটি ভাষ্কর্যের অংশবিশেষ কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ভেঙ্গে ফেললে বিষয়টি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আপনি খেয়াল করে থাকবেন, বিতর্কটিতে একাধারে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপাদান যুক্ত হয়ে এক জটিল আকার ধারণ করেছে।

আগেই যেমন বলেছি, চলমান বিতর্কের একটি স্পর্শকাতর দিক হল, এতে বঙ্গবন্ধুর নাম জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, এ দেশের সিংহভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাদের উপর আলেম উলামাদের গভীর প্রভাব রয়েছে। এ কারণে এর ধর্মীয় দিকটাও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একটি বিষয় আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, বিবদমান দুটি পক্ষের কেউই ধর্মকে অগ্রাহ্য করে এগুতে চাচ্ছেন না। আলেম উলামারা যখন কুরআন-হাদিস থেকে দলিল দিয়ে ভাষ্কর্য নির্মাণকে অগ্রহনযোগ্য প্রমাণে ব্যস্ত, অন্যদিকে যারা ভাষ্কর্য নির্মাণের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন তাঁরাও বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভাষ্কর্যের উপস্থিতির উদাহরণ টেনে বুঝানোর চেষ্টা করছেন, ইসলামের সাথে ভাষ্কর্যের কোন বিরোধ নেই।

পুরো বিতর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এর ধর্মীয় দিকটা। আলেম উলামাদের মূল বক্তব্যটা কী? তাঁরা মনে করছেন, বিষয়টির সাথে ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ইসলামী বিশ্বাসের মূল স্তম্ভই হচ্ছে একাত্মবাদ। এখানে আল্লাহর সাথে কাউকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীক করাকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের ঘোষণা মোতাবেক তিনি যাকে চাইবেন, সব ধরণের অপরাধ মার্জনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের অপরাধ কোন অবস্থায় মার্জনা করবেন না। রাসূল (সা:) আরব উপদ্বীপ থেকে মূর্তি পূজাকে সমূলে উৎপাটন করেন, যা বিগত ১৫ শ’ বছরে মুসলিম সমাজে কোন ভাবেই আর ফিরে আসতে পারে নি। আলেম উলামাদের দাবি, রাসূল (সা:) থেকে বর্ণিত একাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিস থেকে মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীর ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া, হাদিস থেকে এমন ইঙ্গিতও মিলে যে, পূর্ববর্তী নবীদের যুগে মূর্তি পূজার সূচনাটা ঘটেছিল অনুপ্রেরণা লাভের উদ্দেশ্যে জাতির গুণী ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো বা ইমেজ তৈরির মাধ্যমে।

এদিকে, ভাষ্কর্য তৈরির বিরোধিতা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং শিল্পমনষ্ক মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তাঁরা এটাকে শিল্প-সংস্কৃতির উপর একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন। আধুনিক বিশ্বে ভাষ্কর্যকে কেবল একটি অপরূপ শিল্পকর্ম হিসেবেই নয়, জনতার আবেগ-অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা আদর্শিক-সামাজিক চিন্তা-চেতনা রূপায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি হতে পারে ইতিহাসের কোন গৌরবময় মুহূর্তের স্মারক, জাতির কোন শ্রেষ্ঠ সন্তানের স্মৃতিফলক কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে কোন ধর্মীয় দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি। অধুনা মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় ইতিহাসের বরেণ্য ব্যক্তিদের ভাষ্কর্যের উপস্থিতির রিপোর্ট পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আছেন তুরষ্কের কামাল আতাতুর্ক, পাকিস্তানের কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি, মিশরের জামাল আব্দুল নাসের, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং প্রয়াত মুসলিম মনীষীদের মধ্যে আল্লামা ইকবাল, আবুল কাশেম ফেরদৌসী, জালালুদ্দিন রুমি প্রমুখ। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে যে বিষয়টি আসে তা হল, এসব দেশের কোথাও কি জাতীয় বীর বা মনিষীদের এসব ভাষ্কর্য মূ্র্তির ন্যায় পূজিত হচ্ছে কিংবা নিকট বা দূর ভবিষ্যতে পূজিত হওয়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা আছে? এদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি বিশেষভাব প্রণিধানযোগ্য একারণে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশটির স্থপতি এবং বিবিসির মত সংবাদ মাধ্যমের জনমত জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটি যদি মুসলিম সমাজ না হয়ে ভিন্নতর সমাজ হত, তা হলে অনেকেই হয়তোবা তাঁকে রীতিমত দেবতা জ্ঞান করে পূজো করত।

এখানে, একটি বিষয় আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, মুসলিম বিশ্বে উপরে উল্লেখিত ভাষ্কর্যসমূহের বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে, মুসলিম রেনেসাঁর সময়কালে জাতীয় বীর/মণীষীদের সম্মানে/স্মরণে, যখন বিভিন্ন মুসলিম জাতিগোষ্ঠি পশ্চিমা দীর্ঘ সংগ্রাম করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরাধীনতার নিগড় থেকে সবে মুক্তি পেয়েছে কিংবা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা কোন রকমে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ দিন পশ্চিমা শক্তির অধীণে থাকার ফলে কিংবা অর্থনৈতিক, সামারিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পশ্চিমারা অধিকতর শক্তিশালী হওয়ায় একদিকে আমরা যেমন তাদের সাহচর্যে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েছি, অন্যদিকে সব বিষয়ে তাদেরকে মডেল হিসেবে গণ্য করে তাদেরকে অনুকরণ করার একটি প্রবণতাও আমাদের অনেকের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। ভাষ্কর্যের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছে বা ঘটছে, তেমনটি আমি বলতে চাচ্ছি না। তবে, আপনি আপনি একটু খেয়াল করে দেখুন তো, ইসলামের ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে যখন ইসলাম বিশ্বশক্তি হিসেবে স্বমহিমায় বিরাজমান ছিল, সে সময়কার মুসলিম জাতির জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাষ্কর্য নির্মাণের কোন উদাহরণ দেখা যায় কি? সে রকম হলে, আজকে খলিফা উমর (রা:), সেনানায়ক খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:), সেনানায়ক তারিক বিন জিয়াদ, খলিফা হারুনুর রশীদ, সুলতান মাহমুদ, সম্রাট বাবর, সম্রাট আকবর কিংবা সম্রাট আওরঙ্গজেবের মতো ব্যক্তিদের অনেক ভাষ্কর্য মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে শোভা পেত। ক্রুসেড বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর একটি ভাষ্কর্যের রিপোর্ট এসেছে, তবে এটি নির্মিত হয়েছে হালে প্রয়াত সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের সময় কালে।

তাহলে কি ইসলামী সংস্কৃতি স্থাপত্য-কলার বিরোধী। ব্যাপারটি তেমন নয়। ইসলামের ইতিহাস জুড়ে স্থাপত্য কলা শাসককূলের পৃষ্ঠেপোষকতায় বিকশিত হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে — মূলত মসজিদ-মিনার, দুর্গ, প্রাসাদ, সমাধি সৌধ ইত্যাদির মাধ্যমে। এসবের মধ্য দিয়ে মুসলিম স্থাপত্য কলার একটি নিজস্ব শৈলী গড়ে উঠে। এমনকি, এ ধরণের কিছু স্থাপত্য-কর্ম বিশ্ব ঐতিহ্যের অমর কীর্তি হিসেবেও স্থান লাভ করেছে। স্পেনের আল হামরা, আফগানিস্তানের জামের মিনার, আগ্রার তাজমহল, দিল্লির কুতুব মিনার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদাহরণ। দিল্লির কুতুব মিনার ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেকের স্মারক হিসেবে ৮০০ বছর ধরে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাহাদুর শাহ পার্কে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ, পাকিস্তানের লাহোরে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের স্মারক হিসেবে নির্মিত মিনার-এ-পাকিস্তান, বাংলাদেশে ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি দৃষ্টান্ত।

ভাষ্কর্য নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কটি বিশেষ উত্থাপ ছড়ানোর আরেকটি কারণ সম্ভবত এর রাজনৈতিক উপাদান। এদেশে ধর্মীয় বিষয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাই আলেম-উলামাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সমস্যা দেখা দেয়, যখন এখানে কোন রূপ রাজনৈতিক যোগ-সাজশ কাজ করছে বলে অনুমিত হয়। এরকম সন্দেহ দেখা দেয়ার কারণ, যারা ভাষ্কর্যের বিরোধিতায় সোচ্চার তাদের অনেকেই সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত। কেউ কেউ এমনও ভাবছেন, উনারা এক বা একাধিক বড় দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন। বিষয়টির ধর্মীয় দিকটি গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরতে চাইলে আলেম উলামাদের এ সন্দেহটি অপনোদন করতে হবে। যে সব বরেণ্য আলেম উলামা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, তাঁরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুকে সব ধরণের উর্দ্ধে রাখা আমাদের প্রায়রিটি হওয়া উচিৎ। আমরা জানি, তিনি একজন ধর্মপরায়ণ মুসলিম ছিলেন। তদীয় কন্যা মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীও নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন বলে আমরা জানি। তাঁর স্মৃতি চির-জাগরুক রাখার জন্য তাঁর সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাঁকে অবিতর্কিত রাখা এবং একজন মুসলিম হিসেবে আমরা যে কাজ করলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে সেটার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। কাজেই, নীতি-নির্ধারকদর বিতর্কটাকে আরও ধূমায়িত হওয়ার সূযোগ না দিয়ে আলেম উলামাদের সাথে বসে তাঁদের উত্থাপিত আপাত্তিসমূহ ধৈর্য্য সহকারে শুনে এগুলো কতটুকু ধর্মীয় বিচারে উত্তীর্ণ আর কতটুকুই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্র্রণোদিত তা নির্ধারণের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা দরকার।

সবাই ভাল থাকুন।

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন

অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।