দেখা-অদেখায় হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

আসাদুজ্জামান নূর

নাট্যকার হিসেবে চেনার আগে তাকে আমি লেখক হিসেবে চিনতাম। বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টুডিওতে তার সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা, তার আগেই ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নন্দিত নরকের’ মতো উপন্যাসগুলো তাকে পরিচিতি দিয়েছে। তবে নাটকপাড়ায় হুমায়ূন আহমেদ তখনও খুব আলোচিত নাম নয়। এক পর্বের একটি নাটক করতে গিয়ে নাট্যকার হুমায়ূনের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। নাটকটির প্রযোজক ছিলেন সম্ভবত মুস্তাফিজুর রহমান। আমার একটা অভ্যাস, সব সময় একটা দৃশ্যের; দৃশ্যায়ন শেষ হলেই সবার কাছে জানতে চাইতাম, কেমন হলো কাজটা। এ আচরণই হুমায়ূন আহমেদের কাছে আমাকে আলাদা করে তুলেছিল। আর আমার দিক থেকে, ভালো নাট্যকার এবং লেখক হিসেবে এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ তো ছিলই। সেই থেকে শুরু। বলছি সম্ভবত ‘৭৬ সালের কথা।

এরপর একে একে ‘অয়োময়’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’… সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। সেই সময় হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সব নাটক-সিনেমাতেই আমি ছিলাম পরিচিত মুখ। শুধু অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরই নন, ব্যক্তি নূরের সঙ্গেও ততদিনে তার বেশ ভালো বোঝাপড়া। তাই আমি যখন রাজনীতি শুরু করলাম, প্রথম প্রথম খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন। ‘আপনি রাজনীতি করলে নাটক করবে কে?’ পরে অবশ্য মেনে নিয়েছেন।

এক পর্বের নাটক, ধারাবাহিক নাটক হুমায়ূন আহমেদের বহু নাটকে আমি অভিনয় করেছি। একটা নাটকের কথা বলি। নাটকের নাম ‘নিমফুল’। তবে ‘নিমফুল’ নাম হওয়ার পেছনে একটা মজার গল্প আছে। সেই সময় বিটিভির টিভি গাইড ছাপা হতো।

নাটক প্রচার হওয়ার আগেই নাটকের নাম জমা দিতে হতো। একটা গল্প মাথায় রেখে হুমায়ূন নাম দিলেন ‘নিমফুল’। পরে দেখা গেল, গল্প বদলে গেছে। তখন আর নাম বদলের সুযোগ নেই। ‘নিমফুল’ নামে দর্শক যে নাটক দেখল, সেটি আসলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘চোখ’ গল্পটির নাট্যরূপ। নাটকে আমার চরিত্র মনা ডাকাত। হুমায়ূনের নাটকগুলোতে একেকবার আমি একেক রূপে হাজির হতাম। এ ব্যাপারটা আমাকেও খুব আনন্দ দিত। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে কথা ছিল আমি মোনার প্রেমিকের চরিত্রটা করব। যে চরিত্রে পরে খায়রুল আলম সবুজ অভিনয় করেছেন। আমি হুমায়ূন আহমেদকে বলেছিলাম, এই চরিত্রে অভিনয় করলে আমি সচরাচর যা করি, তা-ই করা হবে। হুমায়ূন মেনে নিয়েছিলেন। সে চিন্তা থেকেই পরে বাকের ভাইয়ের চরিত্রে আমাকে নেওয়া।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে নুহাশ পল্লীতে। নুহাশ পল্লীর প্রথম দিককার কথা। সে সময় এখনকার মতো পাকা ঘর ছিল না। একটা টিনের ঘর ছিল, আর ছিল একটা বাঁশের মাচার ঘর। মনে আছে সেই মাচার ঘরে পা ফেললেই ক্যাচক্যাঁচ শব্দ হতো। একবার শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল ছাত্রশিবিরের হামলায়। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। একটা বিশ্ববিদ্যালয় এত দিন ধরে বন্ধ হুমায়ূনের কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। তার পরামর্শে ঢাকা থেকে আমরা দলবেঁধে রওনা হলাম সিলেট, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার দাবিতে অনশন করব বলে। ষাট-সত্তর জনের বিশাল দল, সিলেটে থাকা-খাওয়ার কোনো বন্দোবস্ত নেই, এ নিয়ে তার কোনো চিন্তাও নেই। সে সময় সিলেটে এ নিয়ে দারুণ উত্তেজনা। ট্রেনে রওনা হওয়ার দু’এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা খবর পেলাম, নুহাশ পল্লীতে সেই বাঁশের মাচার ঘর কে বা কারা যেন পুড়িয়ে ফেলেছে। একবার আমরা একটা দৃশ্যের দৃশ্যায়ন করলাম। সেই দৃশ্যের অন্যতম কুশীলব ছিল কালো একটা ঘোড়া। ক’দিন পর একই নাটকের শুটিং, আবারও সেই কালো ঘোড়াকে তলব করা হলো।

জানা গেল, কালো ঘোড়াটা বিক্রি হয়ে গেছে। কালো ঘোড়াটা নেই, তবে একটা সাদা ঘোড়া পাওয়া গেছে। একদিন দেখি এক লোক জুতার ব্রাশে রঙ লাগিয়ে ঘোড়াকে কালো করার চেষ্টা করছে। হুমায়ূন সেই সাদা ঘোড়াকেই জুতার কালি মেখে কালো করবেন। ঘোড়া নিয়ে আরও কাণ্ড আছে। নদীর ওপারে শুটিং হবে। ঘোড়াটিকেও নদীর ওপার নিতে হবে। রাতের বেলা, ঘোড়া নিয়ে নদী পাড়ি দেওয়াথ বিরাট ঝক্কি। ঘোড়া কিছুতেই নৌকায় উঠতে চায় না। একসময় তো ঘোড়া নৌকা থেকে পানিতেই পড়ে গেল। শুটিং-টুটিং মাথায় উঠল, সে এক বিপজ্জনক অবস্থা! এত রাতে সবাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘোড়াটাকে টেনেটুনে পাড়ে তুলেছিল। সেই দৃশ্যের শুটিং করতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল পরদিন পর্যন্ত। এ রকম আরও কত-শত ঘটনা। আজই করতে হবে, এক্ষুনি করতে হবে এই পাগলামি হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে অধিক মাত্রায় ছিল। চট করে রেগে যেতেন, আবার ঠিক হয়ে যেতেন।

আমার বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে তাকে দিয়ে বেশকিছু জনসচেতনতামূলক নাটক করিয়েছি। এসব নাটক হুমায়ূন যে খুব আনন্দ নিয়ে করতেন, তা নয়। তবে আমার অনুরোধ ফেলতেও পারতেন না। আমার চাপে পড়ে এক প্রকার বাধ্য হয়েই লিখতেন। মাঝে মধ্যে এসব নাটক লেখার পর প্রযোজনা সংস্থাগুলো কিছু কিছু জায়গা পরিবর্তন করতে বলত। হুমায়ূন বলতেন, আমি ওসব পারব না, আপনি করে নিন। ছোটখাটো পরিবর্তনগুলো আমিই করতাম, হুমায়ূনকে দেখাতামও না। পরে তিনি অবাক হয়ে বলতেন, ‘আপনি তো আমার মতো করেই লিখেছেন।’ তার সঙ্গে কাজ করতে করতেই আসলে এমন একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদের সংলাপ কেমন হবে, আমি জানতাম।

হুমায়ূনের সঙ্গে গল্প করতে বসলেই বোঝা যেত, পড়ার প্রতি তার ভীষণ ঝোঁক। শুধু যে সাহিত্য পড়তেন তা নয়, বিজ্ঞান নিয়েও প্রচুর পড়তেন। লিখতেনও। কঠিন কঠিন বিষয় সহজ করে লিখে ফেলতেন। তার পড়ালেখার বিষয় বিজ্ঞান। যে সময় পড়ালেখা করেছেন, শুধু সেই সময়ের বিজ্ঞানই নয়, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়েও তিনি খুব ভালো ধারণা রাখতেন। আমার খুব অবাক লাগত। ভাবতাম, হুমায়ূন পড়েন কখন? যতদূর মনে হয়, ভোর থেকে শুরু করে দুপুরে খাওয়ার আগে পর্যন্ত এই ছিল তার পড়া আর লেখার সময়। কখনও হয়তো তাকে ধরেছি, টেলিভিশনের জন্য একটা ছোট্ট নাটিকা লিখে দিতে হবে। দুই কি এক মিনিট দৈর্ঘ্যেরভ। বলতেন, আজ না কাল আসেন। এমন করতে করতে বেশ কয়েকদিন পেরিয়ে গেলে তার বাসায় গিয়ে হাজির হতাম, বলতাম যে করেই হোক, আজ লেখাটা লাগবে। হুমায়ূন বলতেন, আপনি আধাঘণ্টা ঘুরে আসেন। ঘুরে এসে দেখতাম, লেখা হয়ে গেছে। অথচ সামনে বসে থাকলে লেখা হতো না। হুমায়ূনের লেখার গতি অবিশ্বাস্য!

হুমায়ূন আহমেদ কৌতুক শুনতে আর বলতে ভালোবাসতেন। আর ভালোবাসতেন ম্যাজিক। ম্যাজিক দেখাতেনও দারুণ! আমার কখনও কখনও মনে হতো, তার মধ্যে এক ধরনের অতি প্রাকৃত ক্ষমতা আছে। জানি না কেন? একটা কারণ হতে পারে, হুমায়ূন যখন নানা ধরনের গল্প বলতেন, মাঝে মধ্যে কিছু গল্প সত্যি বলে মনে হতো। তা ছাড়া অতি প্রাকৃত ক্ষমতা না থাকলে একটা মানুষ এভাবে লিখতে পারেন না। অনেকে বলেন, হুমায়ূনের সব লেখা ভালো নয়। এটা সব বড় লেখকের ক্ষেত্রেই সত্যি। শুধু তার ভালো গল্প-উপন্যাসগুলোই যদি ধরেন, তার সংখ্যাও কিন্তু অনেক।

হুমায়ূন খুব গানপাগল ছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত পছন্দ করতেন। হাছন রাজার ভীষণ ভক্ত ছিলেন তিনি। আমার মনে হয়, তার নিজের জীবনটাও অনেকটা হাছন রাজার মতোই! একেবারেই সাদাসিধে ছিলেন। ঘরের দরজা কখনোই লাগাতেন না। বেশির ভাগ সময়ই খালি গায়ে থাকতেন। আমি বাসায় গেলে হয়তো বলতেন, ‘নূর, আসেন।’ বলতে বলতে শার্টটা গায়ে দিতেন, বোতামও লাগাতেন না। এ রকমই ছিলেন মানুষটা…

 

লেখক: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।