দিগন্ত টিভি খুলে দিতে সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের আহ্বান

শিবলী চৌধুরী কায়েস : অন্ধকারের কালো মেঘে ঢাকা জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টিভি বন্ধ হওয়ার এক বছর পূর্তিতে সমবেদনাও সংহতি প্রকাশে নাগরিক সমাবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র শাখা দিগন্ত টেলিভিশন দর্শক ফোরাম। সোমবার নিউইয়র্কের বাঙালী অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজার মিলনায়তনে আমেরিকা প্রবাসী ব্যাবসায়ী, সাংবাদিক, গণমাধ্যমের সম্পাদক, রাজনীতিবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী’সহ বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন। এসময়ে, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে অবিলম্বে দিগন্ত টিভি’সহ সকল বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
সংহতি প্রকাশ করতে এসে বিশিষ্ট কলামিষ্ট-লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ড. মিনা ফারাহ বলেন, ‘আমি গর্ব করে বলছি- দিগন্ত টেলিভিশন বাংলাদশের আল্জাজিরা। এ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত সংবাদকর্মীদের সাহস এবং সত্য প্রকাশে আপোসহীনতা আমাকে মুগ্ধ করেছে’। সরকারের সমালোচনা করে মিনা ফারাহ আরো বলেন, ‘‘দেশে মানবাধিকার বলতে কিছু নেই। যে সত্য কথা বলবে সেই সরকারের রোষানলে পড়বে, যেমনটি আমার উপর পড়েছে’’। যুদ্ধপরাধ বিচার ইস্যুতে তিনি সত্য প্রকাশ করে ভুল করেননি বলে তিনি জানান; ‘ভিশন টুয়েন্টি২১ বাস্তবায়ন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে শক্ত এবং বলিষ্ঠ গণমাধ্যম বন্ধ করার পক্রিয়া সরকারের পূর্ব পরিকল্পনারই একটি অংশ। তারই ধারাবাহিকতায় দিগন্ত টিভি, আমারদেশ’সহ স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো বন্ধ করা হয়েছে। মাহমুদুর রহমানের মত একজন সাহসী সাংবাদিককে নির্যাতনের সমালোচনা করে মিনা ফারাহ বলেন, ‘হেফাজত ইস্যুতে দিগন্ত টিভি কোন ভুল করেনি; অথচ সরকার ফ্যাসিবাদি কায়দায় তা বন্ধ করে দিয়েছে। পথে DTV 1SONY DSCSONY DSCবসিয়েছে অনেক সংবাদকর্মীকে। তাই অবিলম্বে দিগন্ত টিভি খুলে দিতে জাতীসংঘ’সহ যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগে চাপ প্রয়োগের জন্য স্বাীধনতাকামী প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিক এবং ব্যাবসায়েিদর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। কোন দলমত নয়; সত্য প্রকাশ এবং মানবাধিকারের পক্ষে নিজের অবস্থান অটুট রাখবেন বলেও জানান ড. মিনা ফারাহ।
এদিকে, সাময়িক সম্প্রচার নিষেধাজ্ঞার ১বছর ও সম্প্রচার খুলে দেয়ার দাবিতে নাগরিক সামবেশে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। অবিলম্বে তারা দিগন্ত টিভি সম্প্রচার খুলে দিয়ে গণতন্ত্রের পথ কিছুটা হলেও উন্মুক্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
উত্তর আমেরিকার সবচে পুরনো পত্রিকা সাপ্তাহিক এখন সময়-এর সম্পাদক কাজী শামসুল হক দিগন্ত টিভির সম্প্রচার নিষেধাজ্ঞার ১বছর অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, ’আমি বাংলাদেশে বহুবার কারা বরণ করেছি। সত্য প্রকাশের মাশুলে বন্ধ করা হয়েছে আমার পত্রিকা। বঙ্গ বন্ধুর আমলের বাকশালী শাসন ব্যবস্থা এবং সেসময়কার গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রন নিয়েও কথা বলেন প্রবীন এই সাংবাদিক। তিনি আরো বলেন, হেফাজত ইস্যু সরকারের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। দিগন্ত টিভি বন্ধ করা সরকারের পুর্ব পরিকল্পনারই একটি অংশ।
আলোচনা অংশ নিয়ে নিউইয়র্কের প্রবাসী ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ বলেন, ‘দিগন্তের জন্মলগ্ন থেকে অনেকে সুবিধা নিয়েছেন। সুবিধাভোগী এসব মানুষেরা আজকে দিগন্তের পাশে নেই। শুধুমাত্র নিরিহ হেফাজতকর্মীদের ওপর সরকার তথা আইনশৃংখলা বাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষনের ফুটেজ দেখানোই দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তাই সুবধিাভোগীদের মুখোশ খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রে দিগন্ত টিভি খোলার জন্য প্রবাসী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের প্রতিও আহ্বান জানানা তিনি’।
নিউইয়র্ক ল’এজেন্সির এ্যটর্নি আবদুল আজিজ অনুষ্ঠানে সংহতি প্রবাশ করে বলেন, ‘৫ মে জাতির জন্য একটি কালো দিন। স্বাধীন গণমাধ্যম বন্ধ করে সরকার এখন দলবাজীর মিডিয়ায় পরিনত করেছে পুরো দেশকে। আর জাতিকে উপহার দিচ্ছে লাশের মিছিল’। বাংলাদেশে না হলেও যুক্তরাষ্ট্রে দিগন্ত টিভি খোলার আহ্বান জানান এই আইনজ্ঞ।
নিউইয়র্ক অ্যাডভোকেটশীপের ডিরেক্টর ও মুসলীম নারী নেত্রী শাহানা মাসুম দিগন্ত টিভির নাগরিক সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘যে দিনটিতে সারা বিশ্বে ‘‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম’’ ডে পালিত হয়; ঠিক এর দু’দিন পর বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় একটি চ্যানেল বন্ধ হওয়া সত্যিই দু:খজনক’। সত্যকে কখনো দমিয়ে রাখা যায়না মন্তব্য করে অবিলম্বে দিগন্ত টিভি’সহ বন্ধ গণমাধ্যশ খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দিগন্ত টিভি শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়; যুক্তরাষ্ট্র’সহ পুরো বিশ্বের বাঙলীদের কাছে সমানতালে জনপ্রিয় ছিলো। সংহতি প্রকাশে অংশ নিয়ে এমনটিই জানালেন, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ খান। তিনি বলেন, ‘মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করে বাংলাদেশে একটি অলিখিত সেন্সরশীপ চলছে। বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম। যুমনা’সহ বিগ বাজেটের নিত্য নতুন চ্যানেলগুলোতে বসানো হচ্ছে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রশাসক। এভাবেই নিয়ন্ত্রন হচ্ছে দেশের গণমাধ্যম’।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দিগন্ত টিভির মালিক কে সেটা বড় নয়; বড় হচ্ছে যে গণমাধ্যম শুরু থেকেই সব শ্রেনী, সব দল ও মতের কথা বলে; তা বন্ধ করে সরকার ভুল করেছে’। দিগন্ত টিভি তার অবস্থানে ফিরে আসবে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা’র যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি এস এম রহমত উল্যা বলেন, ‘দিগন্ত টিভির অপরাধ তারা নিরিহ মুসলমানদের ওপর সরকারের নগ্ন হামলা ও নির্বিচারের গুলি প্রকাশ করা’। পেশাদার গণমাধ্যম বন্ধ করে অপেশাদারদের চ্যানেল নিয়ন্ত্রনের ভার দিয়ে সরকার নিজেদের ইচ্ছে মত দেশ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রবাসী বিএনপি নেতা ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক গিয়াস আম্মেদ সংহতি প্রকাশ করতে এসে দিগন্ত টিভি খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় আগামী দিনে এ ধরনের অন্যায়ের মাশুল সরকারকে দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের সাথে একাতœতা পোষন করেন সাপ্তাহিক প্রাবস এর সম্পাদক সাইয়েদ আমেদ। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে দিগন্ত টিভি খুলে দেয়ার আকুতি শুধুমাত্র বৃথা চেষ্টা’। দেশের বর্তমান দুরাবস্থার জন্য হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। সরকার মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রন করেই অগনান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় টিকে আছে এমন মন্তব্য করে সাইয়েদ আহমেদ বলেন, মিডিয়ার এ দুর্বলতার মাশুল দিতে হচ্ছে দেশের জনগনকে’।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চান্দু বলেন, ‘দিগন্ত টিভি শুধুমাত্র সংবাদ পরিবশেন নয়; তাদের অনুষ্ঠানের নির্মাণ শৈলী এবং ইসলামী মূল্যবোধ বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো। সরকারের ফ্যাসিবাদি হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে গেছে। জাতির জন্য সত্যিই এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়’। তবে, অচিরেই সরকার দিগন্ত টিভি খুলে দেবেন বলে আশা করনে তিনি।
সংহতি প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র শাখা ওলামা দলের সভাপতি ড. আবদুর রহীম। তিনি বলেন, এরকম ইসলামী মূল্যবোধের একটি চ্যানেল প্রবাসীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। সরকার চ্যানলটি বন্ধ করে প্রবাসী বাঙালীদের আশার প্রদিপ নিভিয়ে দিয়েছে’।
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক মইন উদ্দিন নাসের বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দু’একটা সরকার ব্যতিত বাংলাদেশের কোন সরকারই মিডিয়া বান্ধব ছিলোনা। তবে, বর্তমান সরকার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে’। তিনি আরো বলেন, ‘‘প্রত্যেকটি মিডিয়ার এডিটোরিয়াল পলিসি আছে থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যায় ভাবে সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করে কোন সরকারই বেশী দিন ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। গণমাধ্যমগুলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার বলেও মন্তব্য করেন তিনি’’।
মানবাধিকার কর্মী ও হিউম্যান রাইটস-এর সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন সংহতি প্রকাশ করতে এসে বলেন, ‘সমালোচনা এবং বৃথা অপেক্ষা না করে দিগন্ত টিভি নিউইয়র্কে চালুর উদ্যোগ নিতে হবে’। এ জন্য সকল প্রবাসীদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।
বিশিষ্ট সাংবাদিক শেখ সিরাজ উদ্দিন বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর জার্নালিজম এথিকস ও এডিটোরিয়াল পলিসি নিয়ে দু:খ প্রকাশ করে বলেন, ‘হেফাজতের শত শত নিরীহ লোকদের রাতের আঁধারে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হলো; অথচ দেশের মুল ধারার গণমাধ্যমগুলো নিউজ হেড লাইন ছিলো হেফাজতের তান্ডব?। আর বন্ধ করা হলো সত্য প্রকাশকারী দিগন্ত টিভির সম্প্রচার’। আমারদেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের উপর সরকারের নির্যাতন হামলা-মামলার সমালোচনাও করেন তিনি।

দিগন্ত টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক ইমরান আনসারীর সঞ্চালনায় এতে সভাপতিত্ব করেন, দিগন্ত টিভির পরিচালক ও প্রবাসী ব্যবসায়ী আজিজ ওসমানী। বন্ধ হবার পর নিজেদের তীক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন দিগন্ত টিভির স্টাফ রিপোর্টার শিবলী চৌধুরী কায়েস। এছাড়াও অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন, দিগন্ত টিভির পরিচালক আমিনুর রশীদ জামসেদ, দিগন্ত টেলিভিশনের সিইও(যুক্তরাষ্ট্র) মীর মাসুম আলী, উত্তর আমেরকিার আই অন বাংলাদেশ টিভির স্বত্তাধিকারী রিমন ইসলাম’সহ অনেকে। প্রত্যেকেই দিগন্ত টেলিভিশন সম্প্রচার খুলে দিতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *