তুরস্কের সমরাস্ত্র ও মানুষবিহীন নৌযানের বিস্ময়

war art

রণাঙ্গনের ছবি

আহমেদ বায়েজীদ

প্রতিরক্ষা শিল্পে খুব দ্রুত বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে তুরস্ক। দেশটির বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এখন নির্মাণ করছে বিশ্বমানের সামগ্রী। এক সময় এই সেক্টরে পুরোপুরি বিদেশ নির্ভরতা ছিলো দেশটির; কিন্তু তুরস্কের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্ববাজারে সমাদৃত। সম্প্রতি তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে অর্জন করেছে বেশ কিছু মাইলফলক। উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে বেশ কয়েকটি সামগ্রী। আজ জানাবো তুরস্কের প্রতিরক্ষা সেক্টরের তেমন কিছু অগ্রগতির খবর।

প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েব এরদোয়ান তার দেশকে প্রতিরক্ষা শিল্পে সাবলম্বী করতে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন সেটি ভিশন ২০২৩ নামে পরিচিত। এই মহা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটির প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতায় পাচ্ছে একের পর এক সাফল্য। তারই একটি হেলিকপ্টার ড্রোন।

উচ্চ লোডবহনে সক্ষম মনুষ্যবিহীন হেলিকপ্টার উদ্ভাবন করেছে তুরস্কের একটি প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বলছে সামরিক কিংবা বেসামরিক উভয় সেক্টরেই প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে হেলিকপ্টার ড্রোনটি। তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় গ্রুপ অব কোম্পানিজ এসবিআই বিলিসিম- এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান তিরতা টেকনোলজি উদ্ভাবন করেছে মনুষ্যবিহীন হেলিকপ্টারটি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নাম লেখালো আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল বা ইউএভি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায়। তিরতা টেকনোলজির চেয়ারম্যান ও সিইও সেলমান ডনমেজ বলেন, বাজারে বেশি ওজন বহনকারী ও দীর্ঘসময় আকাশে থাকতে সক্ষম এমন ইউএভির চাহিদা আছে। সেসব মাথায় রেখেই আমরা যে ফুয়েল ইঞ্জিনের হেলিকপ্টারটি তৈরি করেছি সেটি দীর্ঘ উচ্চতায় অনেক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে।

এই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক অবস্থায় মনুষ্যবিহীন হেলিকপ্টরারটি ফ্লাইড ডিউরেশন ৩ ঘণ্টা থাকলেও তা বাড়িয়ে ৮ ঘণ্টা করা হয়েছে। এখন সেটি ৮০০ থেকে ৮৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারবে ১৫ হাজার ফুট উচ্চতা দিয়ে। আবহাওয়া ভালো থাকলে হেলিকপ্টারটি আকাশে থাকতে পারবে টানা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। আর বহন করতে পারবে ১৬০ কেজি ওজন।

সেলমান ডনমেজ আরো জানান, আগামী বছরের শেষ দিকে তারা হেলিকপ্টারটির বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করবেন বলে আশাবাদী। দুই মাস আগে মানুষ্যবিহীন হেলিকপ্টারের পরীক্ষা চালিয়েছিল চীন। হেলিকপ্টারটির চিফ ডিজাইনার জেং গুগোই বলেছিলেন, প্রচলিত ড্রোনের চেয়ে হেলিকপ্টার ড্রোনের সুবিধা হচ্ছে এটি উড্ডয়নের জন্য কোন রানওয়ে দরকার হয় না আবার যে কোন জায়গায় এটি অবতরণও করতে পারে। এবার সেই তালিকায় নাম লেখালো তুরস্ক। তবে চীনের হেলিকপ্টারটি ওজন নিতে পারবে ৮০ কেজি। তুর্কি প্রতিষ্ঠানের নির্মিত হেলিকপ্টারের ওজন নেয়ার ক্ষমতা এর দ্বিগুণ।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের আরেকটি উদ্ভাবন মনুষ্যবিহীন সশস্ত্র নৌযান। অফিশিয়ালি যেটিকে বলা হচ্ছে আর্মড আনম্যান্ড কমব্যাট সারফেস ভেহিকেল বা এইউএসভি। মনুষ্যবিহীন নৌযানের যে সিরিজ তৈরির যে পরিকল্পনা নিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি- এটি তার প্রথম প্রোডাক্ট। গত অক্টোবর মাসে প্রথমবারের মতো নৌযানটির কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়। আর চলতি মাসেই সেটি সাগরে নামার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা।

তুরস্কের দুটি প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে তৈরি করছে নৌযানটি। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো আন্তালিয়া ভিত্তিক আরিস শিপইয়ার্ড ও আঙ্কারা ভিত্তিক মেতেকসান ডিফেন্স কোম্পানিজ। ১১ মিটার লম্বা নৌযানটি ২ টন সামগ্রী বহন করতে পারবে। এর রয়েছে ডে-নাইট ইলেকেট্রা-অপটিক্যাল সিস্টেম, ন্যাশনাল এনক্রিপ্টেট কমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার। আর এটি তৈরি হয়েছে পুরোপুরি অ্যাডভান্সড কম্পোাজট ম্যাটেরিয়াল দিয়ে।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দুটি এই আনম্যানড সারফেস ভেহিকেলের বেশ কয়েকটি সংস্করণ প্রস্তুত করছে। এগুলোর কোনটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কোনটি মাইন অনুসন্ধান, কোনটি সাবমেরিন বিরোধী যুদ্ধ করতে পারবে। আবার সমুদ্র পথে আগুন নেভানোর কাজ কিংবা ত্রাণ সামগ্রী পৌছে দেয়ার কাজও করা যাবে এই নৌযান দিয়ে। এসব লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে এর ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ। শীঘ্রই বাণিজ্যিকভাবে এই নৌযানের উৎপাদন শুরু হবে বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দুটি।

আরেস শিপইয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উতকু আলানক আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে বলেন, নৌযানটি থেকে গত মার্চ মাসে তুরস্কের রোকেস্তান গাইডেড মিসাইল উৎক্ষেপণের পরীক্ষা চালানোহয়েছে। আজিয়ান ও ভূমধ্যসাগরের তুর্কি সমুদ্রসীমায় মোতয়েনের জন্য নৌযানগুলো তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এই কর্মকর্তা বলেন, এই মনুষ্যবিহীন নৌযানটির অপারেটিং সিস্টেম অনেক সহজ। আর লো ভিসিবিলিটি রাডার সিগ্নেচারের কারণে এটি সহজেই শত্রুর চোখ ফাঁকি দিতে পারবে।

উতকু আলানক বলেন, এটি আমাদের বাড়তি একটি চোখ হয়ে সাগারের প্রত্যন্ত দ্বীপগুলোর ওপর নজর রাখবে, তথ্য সংগ্রহ করবে এবং প্রায়োজনে গাইডেড মিসাইল ছুড়তে পারবে। এছাড়া এর রয়েছে এন্টি জিপিএস জ্যামিং সিস্টেম।

আরেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মেতেকসান ডিফেন্স এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এরদাল তোরুন বলেন, এর কমান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম অনেক দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। নৌযানের সব গতিবিধিই ঠিক করে দেবে কন্ট্রোল রুম। তিনি বলেন, মানুষবিহীন এই নৌযানটি আমাদের নৌ শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এটি হবে তুর্কি নৌ বাহিনীর বড় শক্তি।

কন্ট্রোল রুম থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় ঘুড়ে বেড়াতে পারবে এটি। আর সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার। এর থাকবে নাইট ভিশন ক্ষমতা, যার কারণে অন্ধকারেও নির্বিঘ্নে চলতে পারবে।

সামরিক ঘাঁটি কিংবা যুদ্ধজাহাজ থেকে এটি চালানো যাবে। প্রয়োজনে গাড়িতে স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ কন্ট্রোল রুম থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে নৌযানটিকে।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে সি-ওয়ান থার্টি কার্গোবিমানের আধুনিকায়ন করেছে টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। তুরস্কের বিমান বহরে থাকা ১৯টি এই মডেলের বিমানের আধুনিকায়ন শুরু করেছে সংস্থাটির ইঞ্জিনিয়াররা। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যার একটি সার্ভিসে ফিরে আসবে।

টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তুর্কি বিমান বাহিনীতে থাকা ১৩টি সি-ওয়ান থার্টি-ই এবং ৬টি সি-ওয়ান থার্টি-বি কার্গো বিমানে আধুনিয়কায়নের প্রকল্প চলছে। প্রতিরক্ষা দফতরের সাথে ২০০৬ সালের এক চুক্তির অধীনে এই কাজ করা হচ্ছে। আধুনিকায়ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ২৩টি সিস্টেম ও ১১৭টি উপাদান- যা বিমানের দক্ষতাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া বিমানের সেন্টার কন্ট্রোল কম্পিউটারকে আধুনিক করা হয়েছে। এই কম্পিউটারকে বলা হয় এয়ারক্রাফটের ব্রেইন। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে টার্কিস অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের ইঞ্জিনিয়াররা।

এছাড়া বিমানগুলোর জিপিএস, ইন্ডিকেটর, এন্টি-কোলিশন বা সঙ্ঘর্ষ এড়ানোর প্রযুক্তি, আবহাওয়া সনাক্তকারী রাডার, এডভান্সড মিলিটারি ও সিভিলিয়ান ন্যাভিগেশন সিস্টেম, নাইট ভিশন সিস্টেম ইত্যাদি উন্নত করা হয়েছে। এর বাইরে ভয়েস রেকর্ডেড ব্ল্যাক বক্স, কমিউনিকেশন সিস্টেম, অটোমেটিক ফ্লাইট সিস্টেমেরও আধুনিকায়ন করেছে তুর্কি ইঞ্জিনিয়াররা।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন করার ফলে বিমানগুলোর পাইলটদের কাজের চাপ কমবে। টেক অফ থেকে ল্যান্ডিং পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রুট চিহ্নিত করার ফলে ফ্লাইট ও হবে নিরাপদ। এই আধুনিকায়নের প্রথম নকশা করা হয় ২০১৪ সালে। সফলতার সাথে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সেটি বাস্তবায়ননের অনুমোদন দেয় তুরস্কের বিমান বাহিনী।

প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে হেলিকপ্টার ইঞ্জিন প্রস্তুত করেছে তুরস্ক। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান তুসান ইঞ্জিন ইন্ডাস্ট্রিজ সম্প্রতি তাদের তৈরি একটি হেলিকপ্টার ইঞ্জিন পরীক্ষার জন্য দিয়েছে। ২০১৭ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়ে সম্প্রতি তা সফলতার মুখ দেখেছে।

ডিফেন্স ওয়ার্ল্ডের খবরে বলা হয়েছে টিএস-ফোরটিন হান্ড্রেড মডেলের ইঞ্জিনটি দিয়ে তুরস্কেরই উদ্ভাবিত গোকবে হেলিকপ্টার চলবে। গত বছর দুই ইঞ্জিনের এই হেলিকপ্টারটি তৈরি করেছে টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ।

৬ টন ওজনের গোকবে হেলিকপ্টার একটি বহুমুখী হেলিকপ্টার। সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজেই এটির ব্যবহার রয়েছে তুর্কি বিমান বাহিনীতে। এতদিন সেটি চালানো হতো ব্রিটেনের রোলস রয়েস ও যুক্তরাষ্ট্রের হানিওয়েল কোম্পানির যৌথভাবে নির্মিত ইঞ্জিন দিয়ে। তবে এবার সেই বিদেশ নির্ভরতা থেকে বেড়িয়ে আসার সুযোগ পেল হেলিকপ্টারটি।

টিএস- ফোরটিন হান্ড্রেড ইঞ্জিটি ১ হাজার ৪০০ শ্যাফট হর্সপাওয়ার বিশিষ্ট আর এর শ্যাফট আউটপুট প্রতি মিনিটে ২৩ হাজার রেভ্যুলশন্স। ফিল্ড টেস্টের জন্য ইঞ্জিনটি দেয়ার সময় এক অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান আশা প্রকাশ করেন, এই প্রতিষ্ঠান থেকে তুরস্কের নিজস্ব উদ্ভাবিত ফাইটার জেট টিএফ-এক্সের ইঞ্জিনও তৈরি হবে একদিন।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্সের প্রধান ইসমাইল দেমির বলেন, ড্রোন, সাজোঁয়া যান ও নতুন প্রজন্মের ব্যাটেল ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন তৈরির যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে তুরস্ক- তারই ধারাবাহিকতায় হেলিকপ্টার ইঞ্জিন তৈরির এই সফলতা। তিনি জানান, খুব শীঘ্রই এই ইঞ্জিনের ব্যাপক হারে উৎপাদন শুরু হবে।

এদিকে তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেছেন, টার্বোশ্যাফট হেলিকপ্টার ইঞ্জিন প্রস্তুত করার ফলে তুরস্ক প্রতি বছর ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি কমিয়ে দিতে পারবে। মুস্তাফা ভারাঙ্ক এই পদক্ষেপটিকে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য ঐতিহাসিক দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেন।-বিডিভিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *