তাহাদের গভীর গভীরতর অসুখ এখন

এই দফায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ বছর প্রায় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ১২ বছরে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার লাভ করেছে। একেবারে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এই দুর্নীতি রোধ করার জন্য সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। একটি দুর্নীতি যখন প্রকাশিত হয়ে পড়ছে তখন সেটি নিয়ে কিছু দিন হট্টগোল হইহুল্লোড় সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ, আলাপ-আলোচনা চলার পর দেখা যায় নতুন আরেকটি বিশাল, বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে (মানুষের সামনে চলে আসছে)। তখন আগের ঘটনাটি চলে যাচ্ছে আড়ালে। পূর্ববর্তী এই ঘটনা সম্পর্কে সরকার অবিরাম নানা ধরনের কথা বলে যেতে থাকে। তারা বলে যেতে থাকেন; তারা তাদের দলীয় লোকদেরকেও ছাড় দেন না। তারা বড় দুর্নীতিবাজদের ছাড় দেননি। এই যে, তাদের ধরা হয়েছে। কখনো কখনো বলা হয়, অমুককে দুর্নীতি দমন কমিশন ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। যেন এগুলোই সমাজের ভেতরে খুব বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যারা দুর্নীতিবাজ তার সমাজের ভেতর থেকে মানুষের স্বার্থ যারা কেড়ে নিচ্ছে এই সমস্ত দুর্নীতিবাজ লোক কার্যত কখনই কোনো সাজার মুখোমুখি হচ্ছে না। যদিও কেউ অ্যারেস্ট হচ্ছে কিন্তু তারপর একটা সময় দেখা যাচ্ছে, তারা সেই অ্যারেস্ট এড়িয়ে কোনো না কোনোভাবে বেরিয়ে পড়ছে।

এ রকম ঘটনা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো লুট নিয়ে। ব্যাংকের টাকা নিয়ে, দেয়ার নাম করে না সরকার সমর্থক লোকজন এবং তারা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। কিন্তু সে ঋণ পরিশোধ করেনি। দেখা যাচ্ছে যে, জনতা ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং ঋণ পরিশোধ না করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নামে বেরিয়ে গেল, তখন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, ‘সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের জন্য নাকি কোনো টাকাই নয়।’ অথচ এভাবে দুর্নীতি প্রশ্রয় পেয়েছে।

একইভাবে বেসিক ব্যাংকের শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এত আলোচনার পর, এত কথার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাকে দু’দিন দুদক ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করেছে এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বলতে শুনেছি, দেখেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর মতো লোককেও দুদক ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তার অর্থ হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার যেন একটা ‘জেহাদ’ ঘোষণা করেছে। দেশের সব ব্যাংকে সরকারি দলের লোকেরা কার্যত ফোকলা করে দিয়েছে। এখন ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। এই ঋণ যদি দেশের ভেতরে থাকত এবং তা যদি কোথাও বিনিয়োগ করা হতো তাহলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো। সেটি বিনিয়োগ হয়নি। দেখা যায় খেলাপি ঋণের বেশির ভাগ টাকাই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং একটা বিপুল অঙ্কের টাকা দেশের বাইরে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেই পাচার রোধ করার জন্য সরকারের তরফ থেকে এ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এভাবে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের ফলে দেখা যাচ্ছে, জেলাপর্যায়ে-থানাপর্যায়ে যারা আওয়ামী লীগের নেতা তারা দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা অর্জন করে তারপর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে।

এর পরে এলো ‘ক্যাসিনো কাণ্ড’। সে ক্যাসিনোতে দেখা গেল যে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন অর্থাৎ যুবলীগ, কৃষকলীগ এই সমস্ত সংগঠনের লোকেরা ক্যাসিনো কাণ্ডে জুয়া-জোচ্চুরিতে দেশ ভরিয়ে দিলো। সেখান থেকে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট তো করলই সাধারণ মানুষের এবং তা বিদেশে পাচার করল। বিদেশে তাদের এই টাকায় যে বিলাসবহুল জীবন সে কথাও সংবাদপত্রে অবিরাম প্রকাশিত হতে থাকে। তা নিয়ে অনেক কিছু চলল; অনেক কথা হলো, টকশোতে আমরা ঝড় তুললাম। কিন্তু আস্তে আস্তে বিষয়টা ঢেকে গেল। নতুন এক একটা ইস্যু সামনে চলে এলো, নতুন এক-একটি ঘটনা সামনে চলে এলো। তখন দেখা গেল, যারা এই দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল তাদের সম্পর্কিত বিষয়গুলো আস্তে আস্তে পেছনে পড়ে গেল। তখন সরকারের তরফ থেকে খুব উচ্চকণ্ঠে বলা হচ্ছিল, কোনো দুর্নীতিবাজকে সরকার ছাড় দেয় না, স্থান দেয় না। নিজের দলীয় লোকদের পর্যন্ত সরকার ছাড় দেয় না। তাদের মধ্যে অবশ্য সরকার প্রধানের স্বজনও আছেন। সত্যি ছাড় দেয়া হয়নি। যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীও বাদ যাননি। তিনিও এই ক্যাসিনো দুর্নীতির কারণে পদ হারিয়েছেন। ওই পর্যন্তই। যখন তারা এভাবে পদ হারালেন তখন আমরা বলেছিলাম তাদের টাকা কোথায় এবং এই টাকার উৎসগুলো ধরা হোক, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু দেখা গেল যে, তাদের গ্রেফতার করেই এই অবস্থাটা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলো।

এরপর এলো টেন্ডার কাণ্ড। সে কাণ্ডে এক-একজন মুঘল যেন আবির্ভূত হলেন, তার মধ্যে এলেন জি কে শামীম বলে একজন ‘ভদ্রলোক’। শামীম গণপূর্তের এমন কোনো টেন্ডার নেই যা নিয়ন্ত্রণ করতেন না। নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তিনি বহু ধরনের পথ অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, একজন প্রধান প্রকৌশলীকে তিনি দেড় শ’ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়েছেন। আমরা বারবার বলেছি যে, ওই প্রধান প্রকৌশলীকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। যদি তাকেই দেড় শ’ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে থাকে তাহলে তার আশপাশে যারা আছে তাদের ঘুষের মাত্রাটা কত এবং এই ঘুষ কতদূর পর্যন্ত গিয়েছে যার জন্য জি কে শামীম যখন গ্রেফতার হন তখন চার হাজার কোটি টাকার সরকারি উন্নয়নের কাজ তার হাতে ছিল। এই যে অবস্থা, এর ভেতরে জিনিসগুলো চলছিল এবং চলতে চলতে দেখা গেল যে, আস্তে আস্তে একটা ঘটনা সামনে আসে আরেকটা পিছে যায়। আমরা তখনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে, প্রকৃতপক্ষে তাদের কারোই শাস্তি হবে না এবং সে আশঙ্কা এখন ক্রমেই সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অভিযোগই আনা হয়নি। যেমন ওমর ফারুক চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য অভিযোগ আনা হয়নি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে প্রায় একই কারণে। তার বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। কৃষক লীগের নেতা কালা ফিরোজ বলে পরিচিত যিনি, তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল এই ক্যাসিনো কাণ্ডে। কিন্তু তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন মুক্ত। অর্থাৎ সরকার সাধারণভাবে শুধু দেখাচ্ছে যে, তারা কিছু না কিছু করছে। কিন্তু পেছন দরজাটা উন্মুক্তই রাখা হচ্ছে।

একটি ঘটনা যায় আরেকটি ঘটনা আসে। ক্যাসিনো কাণ্ডের পর আরো অনেক ঘটনা গড়িয়ে এখন দেশে চলছে কোভিড কাণ্ড। অর্থাৎ এই কোভিড মহামারী আসার পরে কোভিডকে নিয়ে একেবারে শুরু থেকে সরকারসংশ্লিষ্ট লোকেরা বা সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকেরা যে পরিমাণ দুর্নীতির আয়োজন করেছে তাতে কে না যোগ দিয়েছে! সরকারের ঘনিষ্ঠ লোক যেমন যোগ দিয়েছে মোহাম্মদ শাহেদ, ডা: সাবরিনা, যেমন যোগ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মী সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী, এমনিভাবে যোগ দিয়েছে একজন সাপ্লাইয়ার হিসেবে একটি নির্মাণ কোম্পানি যে কোম্পানি ফ্লাইওভার নির্মাণ করে থাকে। এভাবে আরো অনেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মাস্ক বা পিপিই সরবরাহ করার জন্য এসেছে এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় বা নির্দেশে বা ইঙ্গিতে তাদের দ্বারা এসব কাজ হয়েছে।

এখানে যে বিপুল ঘুষের লেনদেন হয়েছে সেটি আর অস্পষ্ট নয়। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব করতে গিয়ে তারা ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে এবং কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে। শুধু দুর্নীতি করেই যে তারা ক্ষান্ত হয়েছে তা নয়; এর ফলে বহু মানুষের জীবন হয়েছে বিপন্ন। যার কোভিড হয়নি তাকে তারা সার্টিফিকেট দিয়েছে ‘তার কোভিড হয়েছে’ এবং তাকে হাসপাতালে আটকে রেখেছে। তার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছে। যার কোভিড হয়েছে তাকে তারা কোভিড হয়নি মর্মে কথিত সার্টিফিকেট দিয়েছে। এ নিয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে আজ লজ্জায় মুখ ঢাকতে হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করেনি। যেমন শাহেদ কিংবা সাবরিনাÑ এরা এ ক্ষেত্রে চুনোপুঁটি মাত্র। কিন্তু বড় যারা; যারা এটা অনুমোদন করলেন, যারা হতে দিলেন, যারা একটা করতে দিলেন, যারা এটা ঘটালেন তাদের কাউকে আজ পর্যন্ত সরকার গ্রেফতার করেনি। কিংবা কোনোরকম প্রশ্নও করেনি। শাহেদ সত্যি কথাই বলেছে যে, ‘আপনারা আমাকে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখতে পারেন না। আবারো দেখা হবে।’ হতো তাই, কারণ এখন পরিস্থিতি সে রকম দাঁড়িয়েছে।

ক্যাসিনো কাণ্ড কিংবা নির্মাণকাজের যে বিশাল দুর্নীতি সেটি নিয়ে যখন কথা হলো, তখন আটক হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট যুবলীগের, আটক হয়েছিলেন জিকে শামীম তিনিও যুবলীগের, আটক হয়েছিলেন আরো কয়েক নেতা। এরই মধ্যে আমরা শুনি এক ঘটনাতে আটক হয়েছিল খালেদ মাহমুদ ভূঞা। আমরা শুধু জানতে পারি যে, একে আটক করা হয়েছে। কিন্তু কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা তাদেরকে কারা তৈরি করেছেন, কাদেরকে তারা অর্থ দিয়ে সবকিছু টিকিয়ে রেখেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাসিনো থেকে আয় হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা তাদের যুবলীগের এক নেতা সিঙ্গাপুর গিয়ে বিশাল সম্ভ্রমের সাথে হাজার হাজার কোটি টাকা জুয়া খেলে ব্যয় করেছেন। সেখানে তার সম্পদ আছে, সেখানে তার আবাসস্থল আছে, সেখানে তিনি বিনিয়োগ করেছেন। সব কিছুই হয়েছে। কিন্তু কিভাবে টাকাটা গেল, কাদের ছত্রছায়ায় ক্যাসিনো কাণ্ড ঘটতে পারল? এতকিছু এক দিনে তো ঘটেনি। সে ব্যাপারে সত্য কথাই তো বলেছিলেন ওমর ফারুক চৌধুরী যে, এ ঘটনা এক দিনে ঘটেনি। তাহলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তখন কি আঙুল চুষছিলেন? তাদের কাউকে প্রশ্ন করা হয়নি। যেমন প্রশ্ন করা হয়নি এই ক্যাসিনো কাণ্ডে যারা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। যারা মানুষের অসুখ-বিসুখ ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে।

তাদের কাউকে এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি এবং পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় না; তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এসব ব্যক্তি শুধু যে অর্থ উপার্জনের ধান্ধায় অর্থ দিয়েই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাবু করেছেন এমন কিন্তু নয়। তারা একই সাথে এই সমাজ ধ্বংসের নানারূপ অনুপান তৈরি করে সেগুলো তারা ব্যবহার করেছেন। তারা তৈরি করেছেন মধুকুঞ্জ, তারা তৈরি করেছেন এক শ্রেণীর নারী সরবরাহকারী দল। সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের যারা কন্টাক্ট দিতে পারে যারা এর সঙ্গে ভাগ করতে পারে। তাদের তারা যেখানে প্রয়োজন, অর্থ দিয়ে যেখানে প্রয়োজন, নারী দিয়ে যেখানে প্রয়োজন, তারা এই কাজগুলো করে গেছেন কিন্তু সেখানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। যেমন জি কে শামীমের কথাই আমরা বলতে পারি। শামীম ক্যাসিনো কাণ্ডে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন ঠিকাদার। গণপূর্তের এমন কোনো কাজ নেই, যা জি কে শামীমের হাতের বাইরে করা সম্ভব ছিল। তার বাসায়ও পাওয়া গেছে শত শত কোটি টাকা, যা আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির একাধিক নেতারও বাসায় পাওয়া গেছে শত শত কোটি টাকা। সম্রাট এ কথাও বলেছিলেন যে, ‘আজকাল তো আর ডাক দিলেই লোক আসে না। ক্যাসিনো দিয়ে টাকা জোগাড় করেছি এবং আওয়ামী লীগের জনসভায় মানুষ আনার জন্য আমি সে টাকা ব্যয় করেছি।’ সম্রাটের স্ত্রীও টেলিভিশনে বলেছেন যে, ‘হ্যাঁ এখনকার দিনে আর মানুষ এভাবে আসে না।’ সেটিই কি তাহলে সত্য ধরে নিতে হবে। তা না হলে, তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত কেন নেয়া হয়নি?

ক্যাসিনো কাণ্ডে গ্রেফতারকৃত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম প্রায় চার মাস ধরে হাসপাতালে। অস্ত্র ও মাদক মামলায় এই আসামিকে ডান হাতের ক্ষত স্থান থেকে প্লেট সরানোর জন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে দুই দিনের মধ্যে তাকে কারাগারে পাঠানোর কথা। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছয় দফা চিঠি দিলেও তাকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়নি। কেন? কারা কর্তৃপক্ষ যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছয় দফা চিঠি দিয়ে থাকে তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শামীমকে কেন কারাগারে ফেরত পাঠাচ্ছে না? যদি বলা হয় তার জীবন মরণ সমস্যা, কিন্তু এখন তার যে রোগের কথা বলা হচ্ছে তাতে তো তার জীবন মরণ সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। অর্থাৎ শামীমের অর্থ হাসপাতালেও কাজ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, এখন হাতের ব্যথার চেয়ে বুকের ব্যথার ছুতোয় হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন যাপন করছেন জি কে শামীম। পরিচিতজনদের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ চলছে নিয়মিত। তাকে ফেরত চেয়ে সর্বশেষ ৯ জুলাই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো জবাব দেয়নি। জি কে শামীম একা নন। কারা অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, সারা বছরই শতাধিক আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত বন্দী চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে হাসপাতালে থাকেন। কেউ কেউ থাকেন মাসের পর মাস বছরের পর বছর।

ক্যাসিনো কাণ্ড আর শুদ্ধি অভিযানে আটক যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাঈল চৌধুরী ওরফে সম্রাট এর মধ্যে একজন। তিনিও গত আট মাস ধরে হাসপাতালে। নানা বাহানায় মাসের পর মাস যারা হাসপাতালে আরামে সময় কাটাচ্ছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলার আসামি, ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিন। স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা, স্ত্রী ছবি কুরি হত্যা মামলার আসামি গোপাল চন্দ্র কুরি, লিবিয়ায় নিহত ২৬ বাংলাদেশীকে সেখানে পাঠানোর সাথে জড়িত সোহা হোসেন এবং এস এম উদ্দিন। তারা সবাই হাসপাতালে রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কাউকে কাউকে ফেরত চেয়ে ৩০ বারের বেশি চিঠি দেয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পরামর্শে অথবা প্রভাবশালীদের তদবিরে।

এ ব্যাপারে একটি সংবাদপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিল, কেমন করে এটা সম্ভব? কারা কর্তৃপক্ষ বলেছিল, অসুস্থ হলে আমরা বন্দীদের হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু ছাড়পত্র দিয়ে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রতি ১৫ দিন পর আসামিদের ফেরত পাঠানোর তাগাদা দিয়ে চিঠি পাঠাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন ফেরত পাঠাচ্ছে না সেটি তারাই বলতে পারবেন। কারা কর্তৃপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডা: কনক কান্তি বড়–য়া বলেছেন, ‘চিকিৎসা হয়ে গেলে কারাগারে ফেরত না পাঠানো অপরাধ। কিন্তু এরা কে কখন আসছে কে কখন যাচ্ছে তা আমার নলেজে নেই বা আমাকে জানানো হয়নি। পরিচালককে বলব অসুস্থ ছাড়া বা চিকিৎসা ছাড়া কেউ যদি হাসপাতালে থাকে তাহলে তাদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে। এ ছাড়া, একজন রোগী চিকিৎসার জন্য মাসের পর মাস হাসপাতালে থাকতে পারেন না। এই পরিস্থিতি আসলে চলছে। এখানে যেটা বলা হয়েছে যে, সেটি হলো অনেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তদবিরেও কারাগারের বদলে হাসপাতালে থাকছেন। অথচ ঢাকঢোল কম পেটানো হয়েছিল না তখন। তখন ঢাকঢোল পেটানোর হাবেভাবে মনে হয়েছিল সরকার মনে হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বিশাল অভিযান শুরু করেছে। কিন্তু আসলে দুর্নীতিবাজরা যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে জামাই আদরে রয়েছে সেটি এখন স্পষ্ট।

গত আট মাস ধরে ‘বুকেব্যথা’ নিয়ে হাসপাতালে আছেন যুবলীগের নেতা ইসমাঈল হোসেন ওরফে সম্রাট। এখানে ভর্তির পর ৯ জুলাই পর্যন্ত তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য কারা কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১১ দফা চিঠি দিয়েছেন। সম্রাট গ্রেফতার হয়েছিলেন গত বছরের ৬ অক্টোবর খেলার ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনার সময়। মাদক ও অস্ত্র আইনে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযগে মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ২৪ নভেম্বর তাকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সাধারণ সেবার মধ্যবর্তী ইউনিটে তিনি এসডি ইউতে আছেন। সম্রাটের চিকিৎসক চৌধুরী মেশকাত আলম একটি পত্রিকাকে বলেন, রোগীর যে সমস্যা তাতে যেকোনো সময় সঙ্কট হতে পারে। বিশেষ করে তার স্পন্দনের অনিয়মিত তার কারণে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে না। এখন তার এই বক্তব্য কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য, সেটি বলা দুষ্কর। নাকি কেউ তাকে এই কথা বলতে বলেছেন নাকি কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন? সেটি এখন বিচার্য। কারণ সম্রাট ছিলেন তখনকার সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি এবং গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তার হার্ট বিষয়ক কোনো সমস্যা নিয়ে কথা ছিল না। অর্থাৎ তাকেও রাখা হয়েছে যত্নে ও আদরে। সম্রাটকে শুধু কারা কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাসের পর মাস হাসপাতালে রাখার ক্ষমতা রাখে এটা সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন না। গত চার এপ্রিল ঠিকাদার জি কে শামীমকে কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল হাতের ক্ষতস্থানের প্লেট বদলাতে। তাকে হাসপাতালে পাঠাতে উচ্চ পর্যায়ের তদবিরও ছিল। এখন হাসপাতালের চিকিৎসক বলছেন, শামীমের অস্ত্রোপচারের সব ব্যবস্থা করা হলেও তিনি হাতের প্লেট বদলাতে রাজি হচ্ছেন না। কারা চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা তাকে হাতের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলাম। এখন শুনি বুকের ব্যথার চিকিৎসা হচ্ছে। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বহু টাকা মাদক, অস্ত্র ও দেহরক্ষী নিয়ে শামীমকে গ্রফতারের ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

ডেস্টিনির রফিকুল আমিনের অবস্থাও একই। কারা নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর রোগী হিসেবে রফিকুল আমিন বেশির ভাগ সময় বারডেম এবং বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি থেকেছেন। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে তিনিসহ ডেসটিনি গ্রুপের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা এখন বিচারাধীন। সর্বশেষ আমিন বিএসএমএমইউতে ভর্তি হয়েছেন গত বছরের ১১ মার্চ। প্রায় এক বছর চার মাস ধরে তিনি হাসপাতালের একটি কক্ষে আছেন। তাকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠাতে, কারাগার থেকে হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৭ বার চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে তার স্বজন ও কারাগারের চিকিৎসকদের দাবি, তিনি অসুস্থ। কার্যত এই অসুস্থতার নামে বড় বড় দুর্নীতিবাজকে, ঢাকঢোল পেটানো দুর্নীতিবাজদের কারাগারের বাইরে রেখে, শাস্তির বাইরে রেখে সরকার একটি স্ট্যান্ট প্রদর্শন করতে চেয়েছে সমাজের মানুষের মধ্যে। তারা দেখাতে চেয়েছে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

আসলে তারা সবাই আছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অত্যন্ত যত্নে। তারা যে ধরনের কারাভোগের যে শাস্তি বা যন্ত্রণা সেই ধরনের কোনো কিছু ভোগ করছেন না। কোভিডের দুর্নীতির বিষয়েও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কোভিডের দুর্নীতিতে গ্রেফতার হলেন রিজেন্ট হাসপাতালের মোহাম্মদ শাহেদ। তার যে দুর্নীতি তা যে প্রায় নরহত্যার মতো অপরাধ। তিনি তো এককভাবে সংঘটিত করতে পারেনি এবং তার যে অ্যাকসেস, তিনি কোথায় যেতে না পেরেছেন? তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে যেতে পেরেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পেরেছেন, তিনি সব মন্ত্রীর কাছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় সব নেতার কাছে যেতে পেরেছেন। সবাই তার চেনা এবং তার পাশে দাঁড়িয়েছেন, ছবি তুলেছেন। এমনকি যখন তার হাসপাতালে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে তখন তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করার ‘ক্ষমতা’ রেখেছিলেন। অর্থাৎ তিনি এমনই একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক যে, সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ফোন করতে পারেন। অর্থাৎ এই পর্যায়ের একজন ব্যক্তিকে খুব যে বেশি জটিল কোনো মামলায় আটকানো হবে বা আটকানো হলেও তাকে ছাড়ানোর জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ তদবির করবেন না সেটি বিশ্বাস করা খুবই কঠিন ব্যাপার। সুতরাং জি কে শামীম কিংবা সাবরিনা চৌধুরী এরা কেউই কার্যত কোনো শাস্তির মুখোমুখি হবে এ রকম আর বিশ্বাস হয় না। আমাদের তো মনে হয় সে দিন আর বেশি দূরে নয় যখন জি কে শামীমদের মতো, সম্রাটের মতো কিংবা খালেদ মাহমুদ ভূঞার মতো, মোহাম্মদ শাহেদ, সাবরিনা এবং অন্যরাও এসে হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ঠাঁই নেবেন। শাস্তি কারো হবে বলে কেউ বিশ্বাস করে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

You Might Also Like