জাতীয়চরিত্র হননের এই রাজনীতি বড় ভয়ংকর

সময়টা অস্থির, সামাজিকভাবে তো বটেই, রাজনৈতিকভাবেও। এমন সময় আমরা পার করেছি খুব কমই। ঘরে খুন, বাইরে গুম, হত্যা, সংঘর্ষ, কাদা ছোড়াছুড়ি, চরিত্র হনন আগে অতটা চোখে পড়েনি, এখন যতটা ঘটছে সমাজে। এই অবস্থা বস্তুগতভাবে খারাপ তো বটেই, আবার উত্তরণের পথও অনেকটা রুদ্ধ। অতীতেও আমাদের অবস্থা খারাপ ছিল। কখনোই ভালো ছিল না। তাই বলে অতটা ছিল না। অতীতে আশাটা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেটাও প্রায় নেই বললেই চলে। একটা সময় বিদেশিদের, বেনিয়াদের, পাকিস্তানিদের শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। এখন শত্র“ চলে এসেছে ঘরের ভেতর।
সামগ্রিক বিবেচনায় যেটা বেরিয়ে আসছে, যেটা বোঝা যায় তা হলো, ব্যক্তিকে দোষী করে লাভ নেই। ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি যায়। অপরাধী হলো গোটা ব্যবস্থাটা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা। মূলত কাঠামো। যেকোনো সমাজের দিকে তাকালে দুই রকম মানুষ আমরা দেখতে পাবে, একটি শ্রেণি হলো যোদ্ধা, অন্যটি ভিক্ষুক। যোদ্ধারা ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়, ভিক্ষুকেরা চায় না। ভিক্ষুকেরা অবস্থার সুযোগ নিতে চায়, সুযোগ নেয়। তারা যতটা অনুগ্রহ নেওয়া সম্ভব, সেটা নিয়ে একধরনের সুবিধা লাভ করে। ভোগ করে।
ঐতিহাসিকভাবে একটা যুদ্ধ চলছিল, যারা আমাদের শোষণ করছিল তাদের বিরুদ্ধে। শত্র“গুলোকে, ব্যক্তিগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম, সরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ব্যক্তি সরে গেছে, শোষণকাঠামো আর ব্যবস্থাটা রয়ে গেছে। তাহলে যুদ্ধ তো এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যেটা আগে বোঝা যায়নি। ভাঙবে কে তবে এই ব্যবস্থা? ভিক্ষুক? না, সে তো সুবিধাবাদী, অনুগ্রহবাদী। ভাঙবে তারাই যারা মুক্তির জন্য যুদ্ধ করবে। যারা রাষ্ট্রের ব্যবস্থা, সমাজের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। যোদ্ধা মানুষ এখন কমে গেছে। খুবই আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এখন কারও ওপরই কোনো ভরসা করা যাচ্ছে না। আশা নেই। গৃহে এবং গৃহের বাইরে মানুষ বিপন্ন। যে তরুণ প্রজšে§র কাছে আমাদের ভরসা ছিল, তারাও এখন বিপদগ্রস্ত। তারা পর্নোগ্রাফি, মাদক, অনেক ধরনের অপরাধের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। জাল থেকে তারাও বেরোতে পারছে না। অভিভাবকেরা মেয়েদের নিয়ে যেমন বিপদগ্রস্ত, ছেলেদের নিয়েও তেমনি শঙ্কিত। সামাজিক বাস্তবতা আজ এটাই।
তাহলে ভরসার জায়গা কোথায়? জায়গা সেই যুদ্ধই। সেই যোদ্ধার আজ খুব অভাব। মানুষ বুঝতে পারছে না, তাকে বুঝতে দেওয়াও হচ্ছে না যে সে একধরনের নিপীড়ণের মধ্যে আছে। তাকে বুঝতে হবে তার অবস্থা এবং এই অবস্থার জন্য পুঁজিবাদই দায়ী। সারা দুনিয়াজুড়েই পুঁজিবাদ নিজেও বিপন্ন অবস্থার মধ্যে আছে। লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে উপার্জন করতে হবে, শ্রম মেধা পরিশ্রম ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবে না, সবকিছুতেই মুনাফা গুনতে হবে, মুনাফা পেতে হবে, ব্যক্তিগত সুখ চাইবে, লাভ চাইবে, অন্যের কথা সে একটুখানিও ভাববে না, সমাজ থেকে ব্যক্তি থেকে এমনকি নিজের থেকেও সে বিচ্ছিন্ন ও একা পড়ছে। যখন বুঝতে পারছে তখন তার আর কোনো মুক্তি নেই। মুক্তি পাবার পথ ও সময় দুই-ই নেই। পুঁজির এই শত্র“কে প্রধান শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করার সময় এসেছে। আজকে সভা-সেমিনারে হচ্ছে, টেলিভিশনে টক শো হচ্ছে, পত্রিকায় কলাম সম্পাদকীয় লেখা হচ্ছে কিন্তু মূল কাজটা হচ্ছে না।
আজকের রাজনীতি বড় ভয়ংকর রাজনীতি। পরস্পরকে ঘায়েল করার রাজনীতি। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে জব্দ করার রাজনীতিতে ব্যস্ত। পরস্পর চরিত্র হননে ব্যস্ত। আওয়ামী লীগ তার বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। ‘সমালোচনা’ বলে কোনো শব্দ তারা রাখতে চাইছে না। এটাই হয়ে উঠছে এখন প্রধান রাজনীতি। তাতে গণতন্ত্রের শক্তিটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিরোধী দল, সরকারের সমালোচকেরা এখন কোথায় যাবে, তাদের কোনো জায়গা নেই। হয় তারা নিশ্চিহ্ন হবে, নয় অন্য কোথাও ডানা বাঁধবে। তাদের শক্তিটা তখন মৌলবাদীরা, অপশক্তিরা কাজে লাগাবে এবং বাস্তবে তাই হচ্ছে। সরকার যতই উগ্র হয়ে উঠছে, একে-ওকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে, অবাঞ্ছিত করছে, মৌলবাদীরা ততই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
মৌলবাদ এখন আঞ্চলিক সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক। পুঁজিবাদই মৌলবাদকে তৈরি করছে, ব্যবহার করছে নিজের প্রয়োজনে। আজকে সারা দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদী আন্দোলনের বিপক্ষে কোনো আন্দোলন গড়ে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। এই মৌলবাদীরাও পুঁজিবাদের সমর্থক। যদি লক্ষ করি, সংসদীয় রাজনীতি যেহেতু গণতান্ত্রিকভাবে হচ্ছে না, করতে দিচ্ছে না সরকার তখন উগ্রবাদীরা সামনে চলে আসতে বাধ্য। তারা সুযোগ পেতে বাধ্য। এই মৌলবাদীদেরই সক্রিয়তা বাড়বে ভবিষ্যতে।
পুঁজিবাদের বিরোধী আন্দোলন আওয়ামী লীগ করবে না, বিএনপি করবে না, জামায়াতও করবে না। কারণ তারা এই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী। করবে তারাই যারা এই রাষ্ট্রটা বদলাতে চায়। আর বামপন্থীরা তো সুবিধার সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে আরও আগেই, ফলে তারাও করবে না। যারা সমতায় বিলাস করে, বৈষম্য যারা চায় না, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে যাদের বিশ্বাস তারাই পরিবর্তন করবে। বড় দুটো রাজনৈতিক দলের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা স্বপ্ন দেখাতেও ব্যর্থ। তাদের কারণেই মৌলবাদ বিকশিত হচ্ছে, তাদের আর দেওয়ারও কিছু নেই।
সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন ও সংগ্রাম ছাত্রদের মধ্য দিয়েই বিকশিত হতো। ছাত্রসংগঠনগুলো সক্রিয় ছিল। ছাত্র সংসদও এখন টেন্ডার, ব্যবসা, মুনাফা এসবে ব্যস্ত রয়েছে। তাদের কেউ কেউ ভর্তি-বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত। তারা ভাগাভাগি, কাড়াকাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। তাদেরকে ব্যস্ত করে তোলা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যস্ততাও লুণ্ঠন তাদেরও বিচ্ছিন্ন ও একাকী করে দিচ্ছে। তারা দুটো দলের হয়ে কাজ করছে। তারা মনে করছে, দল দুটো বাঁচলেই তারা বাঁচবে। তারা শক্তি ও সময় অপচয় করছে।
আমরা মধ্যবিত্তের কথা বলি। মধ্যবিত্ত কোনো পরিবর্তন আনবে না, মধ্যবিত্ত পরিবর্তন আনতে পারবে না। কারণ তারা শক্তিহীন ও অসহায় হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্তের একটা ভাগ ওপরে চলে গেছে। লুণ্ঠনে, ভোগবিলাসিতায় সে নিমজ্জমান। সে ভেতরে ভেতরে রিক্ত, শূন্য, তার আর কিছু নেই। তেমনি যে আরও নিচে চলে গেছে, সেও নিঃস্ব। প্রান নিয়ে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এই মধ্যবিত্ত এখন শক্তিহীন ও ভঙ্গুর। আমরা এখন প্রায় সকলেই ভিক্ষুক হয়ে পড়েছি। ভিক্ষুক দিয়ে কোনো পরিবর্তন হবে না। যে যুদ্ধের কথা বলেছিলাম, সেই যুদ্ধ কিন্তু শেষ হয়নি। পরিবর্তন আসেনি এখনো। ফলে যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। এই অবস্থার বিকল্প যুদ্ধই। যুদ্ধ আসলে প্রতিদিনের যুদ্ধ। যুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট দিনের নয়। যুদ্ধ আমাদের নতুন সময়ের। যে যুদ্ধে সবাইকে আসতে হবে। শ্রমজীবী মানুষকে, শ্রমজীবী প্রতিটি মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। হাত মেলাতে হবে, হাতে হাত রাখতে হবে, একের সঙ্গে অন্যের। অপেক্ষা আমাদের নতুন সময়ের।
লেখক : প্রফেসরস ইমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
লেখাটি দৈনিক আমাদের অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও সাপ্তাহিক কাগজের বর্তমান সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।