জাতিসংঘে বাংলাদেশের সৈন্য বাড়বে : ড. মোমেন

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী, আমাদের সময়.কম: বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসলে  ও জাতিসংঘের শর্ত মেনে না নিলে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের সৈন্য ফেরত পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ধরনের কথা ২০০৯ সালের পর বার বারই এসেছে। যখন কোন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তখনই এটা বলা হয়েছে। আগাম নির্বাচন দিনে না হলেও আগামী দিনে জাতিসংঘ এই ধরনের হুমকি দিতে পারে কিংবা চাপ তৈরি করার জন্য এটা করতে পারে এমন কথা গত কয়েকমাস ধরে বার বার বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে এই সব কথার কোন ভিত্তি নেই। কারণ জাতিসংঘ বাংলাদেশে রাজনৈতিক হানাহানি চায় না। চায় না কোন অস্থিরতা বিরাজ করুক। এটাও চায় না সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হোক। জাতিসংঘ চাইছে বাংলাদেশ বিশ্ব শান্তি রক্ষায় এক নম্বর সৈন্য প্রেরণকারী দেশ, সেই দেশে অশান্তি থাকবে, রাজনৈতিক হানহানি থাকবে এমটা না হোক বরং এমন হোক যে সেখানে রাজনৈতিক সুস্থিরতা থাকবে। গণতন্ত্র অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও সকল রাজনৈতিক দলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। জাতিসংঘ আগেও এবং এখনও চায় বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র আর সেটার জন্য সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা চায়। এটা ৫ জানুয়ারীর আগেও চেয়েছে। এনিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশ সফর করেছেন। সেই হিসাবে বিরোধী দলের ও সরকারী দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের জন্য তাগিদ দিয়েছেন, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সমঝোতা করানোর যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটা সফল করতে না পারলেও আলোচনা শুরু করার উদ্যোগে সফল হন।

সূত্র জানায়,  ওই সময়ে শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছেন এই জন্য তাকে সমঝোতা করার জন্য উদ্যোগ নেয়ার তাগিদও দিয়েছেন । তবে উদ্যোগ নেয়া হলেও বিএনপি জানতো যে কাজে আসবে না, এই জন্য ওই উদ্যোগে সারা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতেও খালেদা জিয়া যাননি। এখনও দুই দলের মধ্যে অভ্যন্তরীন দ্বন্ধ রয়ে গেছে। বিএনপি চাইছে সরকারের পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচন। এই জন্য আন্দোলনও করতে চাইছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে তবে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। আবার সরকার চাইছে না এই অবস্থায় কোন নির্বাচন। সরকার চাইছে আগামী পাঁচ বছর ভাল কাজ করতে ও সরকারের মেয়াদ পূরণ করতে। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের বিপক্ষে থাকা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো চাইছে যে বাংলাদেশে আগাম নির্বাচন হোক। এই জন্য বিএনপির সঙ্গে সরকার আলোচনা করে সমঝোতা করুক। এটা যত দ্রুত সম্ভব হয় ততোই ভাল। জাতিসংঘও তেমনটি চাইছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু সরকার তা চাইছে না।  এখন বিএনপির সঙ্গে কোন আলোচনা ও আগাম নির্বাচন নিয়েও ভাবছে না। এই অবস্থায় জাতিসংঘ আবার কোন আলোচনার উদ্যোগ নিবে কিনা কিংবা এই ব্যাপারে দুই নেত্রীকে নতুন করে ফোন করবেন কিনা এমন নানা প্রশ্নই দেখা দিয়েছে।

এই ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের আবাসিক প্রতিনিধি ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন,  জাতিসংঘ বাংলাদেশের ব্যাপারে সব সময় ইতিবাচক। বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা থাকবে এটা সব সময় তারা চাইছে। এখনও চাইছে। তবে তারা এটা কখনো চাইছে না এখনই আগাম নির্বাচন হোক। যদি সেটা চাইতো তাহলে জাতিসংঘ এনিয়ে কথা বলতো। উদ্যোগ থাকতো। তারানকো আবার বাংলাদেশ সফর করতেন। বাংলাদেশের সরকারের উপর চাপ দিতো। কিন্তু এখন সেই রকম পরিস্থিতি নেই। আগামীতে সহসাই দুই দলের মধ্যে আলোচনার জন্য তারানকো ঢাকা সফরের কোন সম্ভাবনা নেই। সরকারের তরফ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি যেতে পারেন। এখনও এই ধরনের কোন আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এছাড়াও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের  নির্বাচনের ব্যাপারেও রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য বান কি মুন বাংলাদেশ সফর করতে পারেন এটাও ঠিক নয়। তার বাংলাদেশ সফরের আপাতত কোন সম্ভাবনা নেই। আগামীতে সরকার তাকে দাওয়াত দিলে তিনি তার সিডিউল মেলাতে পারলে সেখানে যেতে পারেন। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন কবে, কখন, কেমন করে হবে এই জন্য কথা বলতে তিনি যাবেন এমন কোন বিষয় নয়। তিনি চাইলে যে কোন সময়েও ফোন করে কথা বলতে পারেন।

বাংলাদেশে সরকারকে আগাম নির্বাচন করতে হবে, না হলে জাতিসংঘ প্রশাসক নিয়োগ করে বাংলাদেশের নির্বাচন করানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেই সেক্ষত্রে সেনাবাহিনীর সহায়তা নিতে পারেন এমন কথাও শোনা যায় এই ব্যাপারে আব্দুল মোমেন বলেন, এই ধরনের কথাগুলো বিরোধী শক্তিগুলো ছাড়াচ্ছে। তবে এর কোন ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘ কেন প্রশাসক নিয়োগ করতে যাবে। সেই ধরনেরতো কোন পরিস্থিতি হয়নি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরকারের কথাই চলবে। তারা কি সরকারকে বাদ দিয়ে জাতিসংঘের  কথায় চলবে, সেটাতো না। সব দেশেই কিছু চাকরির রুল আছে তাই না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কোন সমস্যা তৈরি হলে ও জাতিসংঘ কোন কথা বললেই বলা হয়  যে, বাংলাদেশ জাতিসংঘের কথা না শুনলে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের সৈন্য ফেরত পাঠাবে এই জন্য চাপ তৈরি করবে। এটা একটা প্রপাগান্ডা। কারণ এই ধরনের কোন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের এখনও নেই।্ ভবিষ্যতে হবে কিনা সেটা বলতে পারবো না। তবে স্বাভাবিকভাবেই এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে জাতিসংঘ তাদের মিশন থেকে সাড়ে আটহাজার বাংলাদেশী সৈন্য ফেরত পাঠিয়ে দিবে, সৈন্য নিয়োগ বন্ধ করে দিবে এটা ঠিক না। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জাতিসংঘ এমন কোন সিদ্ধান্ত নিবে না। তাই বলা যায় এগুলো অপপ্রচার।

একদিকে চলতি বছরের গোড়াতে যখন নির্বাচন হয়ে যাওয়া নিয়ে সব আয়োজন শেষ, তখন খবর আসছে জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেক সব সৈন্য ফেরত পাঠাবে।  এমনও খবর এল আর নতুন করে কোন সৈন্য নিবে না। এগুলো করে আমাদের সেনাবাহিনীর মধ্যে কেউ কেউ উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা ছড়ানোর চেষ্টা করে। আসলে এই ধরনের কোন উদ্যোগ জাতিসংঘ নেয়নি। এমন কোন কথা বলেওনি। ওই সময়ে যখন এই ধরনের প্রচারনা চলছে তার ঠিক এক সপ্তাহ আগেরই আমি নতুন করে জাতিসংঘে ১২০০ সৈন্য পাঠানোর অডার পেয়েছি। অগ্রিম পেয়েছি ৩৯ মিলিয়ন ডলারের চেক। ওই চেক ভাঙ্গাবো। চুক্তিও স্বাক্ষর করে ফেলেছি। আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে সবাই এসে পৌঁছুবে। এই অবস্থা চলছে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি সৈন্য আনার অন্য দিকে সৈন্য নিবে না বলে প্রচারনা চলছে। এই অবস্থা হলে কমেন করে চলবে। ঢাকার একটি ট্যাবলেট পত্রিকায় এমন খবরও প্রকাশ করে দিলো। আমাকে বাংলাদেশ থেকে রাত আড়াউটার সময় ফোন করে এই কথা জিজ্ঞেস করা হয়। ভাবুনতো কেমন অবস্থা। আমি বললাম এমন কোন সম্ভাবনা নেই। এই ঘটনাও সত্য নয়। কিন্তু পরের দিন ওরা ঠিকই নিউজটা করে দিলো। ঢাকা থেকে পরের দিন সরকারের লোকজন ফোন করে এর সতত্যা জানতে চাইলেন। আমি বললাম এর কোন ভিত্তি নেই।  অথচ ওই ধরনের একটি প্রচারনা কতটা ক্ষতি করেছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে এমটাই মনে করে জাতিসংঘ। তবে এই সমস্যা সমাধানে যদি কখনও প্রয়োজন মনে করে জাতিসংঘের সহায়তা প্রয়োজন তাহলে এই ক্ষেত্রে সরকার তা চাইলে জাতিসংঘ চেষ্টা করবে। এর বেশি না।

তিনি বলন, এই সব কথা থাক বরং এটাই বলি যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে আগামী এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈন্য আনবে। তা ১০০০ এর মতো কিংবা এর বেশিও হতে পারে। আর যে সব জায়গা যাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে সেখানে থেকে সৈন্য ফেরত যাবে, তাদের জায়গাগুলোতে নতুন,সৈন্যরা আসবে রিপলেসমেন্ট হবে। আগামী আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে একটা ব্যাটেলিয়ন ডাফুরে যাবে।  লেবেল টু হসপিটাল এর আওতায় ১৫৫-১৫৭ জন আসবে। এই জন্য প্রক্রিয়া চলছে। রিজার্ভ ফোর্সের জন্য আসবে ২৭৫ জন। এছাড়াও আরো কয়েকটি অর্ডার পেয়েছি।  আমি চেষ্টা করছি এই সংখ্যা আরো বাড়ানোর জন্য সেটা করতে পারলে সুবিধা হবে। এটা নিয়ে এখন জাতিসংঘের সঙ্গে দেন দরবার করছি। আশা করি সংখ্যা বাড়াতে পারবো। এই দেনদরবার করার জন্য আমার দেশে যাওয়া হলো ন্।া এই সপ্তাহে দেশে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা বাতিল করতে হয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশনের ব্যাপারে মহাসচিব বানকি মুন ভীষন হ্যাপী। বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের বাংলাদেশের মানুষ যত কথা বিরুদ্ধে বলে জাতিসংঘ  ও জাতিসংঘের কেউ তা বলে না। বরং বাংলাদেশের একজন বড় পিআরও হলেন বান কি মনে। তিনি সব সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। এটা আসলে বাংলাদেশে বসে বোঝা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের ইমেজও সেখানে অনেক উপরে। কেবল রাজনৈতিক ন্দ্বন্ধ টেনে এনে এটাকে নিয়ে কোন ধরনের অপপ্রচার করা উচিত নয়। তাছাড়া দশের ভেতরকার বিরোধ বাইরের কাউকেতো জানানোরও দরকার নেই। কিন্তু সেগুলোতো হয়ে আসছে। এগুলো হওয়া উচিত নয়। দেশের সমস্যা দেশেই সমাধান করতে হবে। আর জাতিসংঘে আমাদের যে ইমেজ আছে তা ধরে রাখতে হব্ েএবং আরো বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমাদের সৈন্য মিশনে আরো কেমন করে বাড়ানো যায় সেই ব্যাপারে চেষ্টার  করতে হবে। আমরা আরো কত ভাবে বেশি বেশি সহায়তা পেতে পারি সেই চেষ্টা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *