কাঁচা লেখকদের নিয়ে আমরা কী করব?

আনিসুল হক : এটা অনেক সময়ই হয়। হয়তো খুব বড় সচিব, বা প্রকৌশলী বা ব্যবসায়ী বা শিক্ষক বা সেনাকর্তা… জীবনের সব কিছুতে সফল, একটা বই লিখে প্রকাশ করেছেন। বা কোনো বৃদ্ধ নিঃসঙ্গ মানুষ, ব্যর্থ তরুণ, শৌখীন গৃহবধূ। বইটা খুব ভালো প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে, কিংবা গ্রামের ছাপাখানা থেকে খুব দীনহীনভাবেই বের করা হয়েছে এটা।
বইটা আপনি হাতে নিলেন। ধরা যাক, প্রথম কবিতাটা তিনি লিখেছেন এ রকম:
প্রিয়তমা স্ত্রীকে (যাকে হারিয়েছি আজ তিন বছর)
মরণ তো আসিবেই ধরায়, তবু কেন কাঁদি তোমাকে হারায়
কেন যে কাঁদিব কী করে বলি,
তাই তো আজও চলি,
আর হে মহাজীবন,
নিঠুর ভুবন,
আমার প্রিয়তমা ছাড়ায় আমি কেন আছি
কেন আমি বাঁচি।
পরের কবিতা:
আমার ছোট নাতনি
সে খায় চাটনি
তার মা তার জন্য করে খাটুনি
সারাক্ষণ চালে চালুনি।
আপনি পড়ে বুঝলেন, তিনি কবিতা খুব পড়েননি। রবীন্দ্রনাথের পরের কবিতা নিয়ে তার কোনো ধারণা নাই।
এখন এই ভদ্রলোক এবং তার বইটি নিয়ে আপনি কী করবেন।
আমি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। রফিকুল ইসলাম স্যারের মত জেনেছি।
তাদের মতও আমার মতোই:
মানুষকে তার হৃদয়ের কথা বলতে দাও। তিনি তার মহত্তম আবেগ সুন্দরতম উপায়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তাকে সম্মান করো।
জ্যাক দেরিদা বলছেন, আমি যখন প্রতিবার লিখতে বসি, প্রতিবার আমার মনে হয় আমি অসহায়, আমি পারব না, আমার চিন্তা জট পাকিয়ে যায়। প্রতিবার আমি প্রথম লেখক।
যিনি একটা দুর্বল বাক্যও সাহিত্য হিসাবে রচনা করেছেন এবং প্রকাশ করেছেন, বা প্রকাশ করতে চান, আমি তাকে সম্মান করি।
সমুদ্র গুপ্তর কবিতা আছে এ রকম: আমি বললাম, ফুল। তুমি বললে, ফুল, সে তো কাগজের। আমি বললাম, তবুও তো ফুল, লোকটা তো কাগজ দিয়ে বন্দুকও বানাতে পারত।
একজন সাহিত্য করতে চাইছেন– আমরা সবাই তাই চাই– তাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।
প্রথম বই কাঁচা হলে ছাপা হবে না, এ রকম হলে বুদ্ধদেব বসুর মর্ম্মবাণী ছাপা হতো না। স্যামুয়েল বেকেটের প্রথম বইটা ৩৯ বার প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিল। ভালো নয় বলে। এই লেখক পরে নোবেল পেয়েছিলেন।
কার লেখা ভালো কার লেখা খারাপ, কে বিচার করবে?
নিশ্চয়ই আমার একটা রুচি আছে। তা অনুযায়ী কিছু লেখা আমার ভালো লাগে, কিছু লাগে না, কিন্তু আমার বিচারই তো সব নয়।
তাই জাজমেন্টাল না হয়ে লেখকমাত্রকেই আমি সালাম জানাই, শ্রদ্ধা করি, ভক্তি করি। যারা বই বের করেছেন, তা আমার কাছে কাঁচা মনে হলেও আমি তাদেরকে শ্রদ্ধা করব। আমার বিচার তো ভুলও হতে পারে।
দুই, খারাপ লেখার অধিকার লেখকের আছে। তবে প্রকাশকদের উচিত বইটাকে নির্ভুল করা। সুসম্পাদিত করা। ভুল বানানের বই বের করার অধিকার প্রকাশকের নাই।
শুধু দুটো কথা বলতে চাই। যারা সিরিয়াসলি লিখতে চান, তাদেরকে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে, এবং সারা জীবনই প্রস্তুতি নিতে হবে। জাতীয় ক্রিকেট দলে চান্স পেতে হলে যেমন বহু পথ পাড়ি দিতে হয়, অনেক প্রস্তুতি লাগে, অনেক ট্রেনিং লাগে। আবার চান্স পাওয়ার পরেও তাদের প্রাকটিস, কোচিং করেই যেতে হয়।
তাই বলে পাড়ার মাঠে আমি ক্রিকেট খেলতে পারব না, তা তো নয়।
আবার মোস্তাফিজের মতোন প্রতিভাবানরা সাতক্ষীরা থেকে এসেই বিশ্বসভায় স্থান পান।
আর দ্বিতীয় কথাটা হলো, সাহিত্য কথাটা এসেছে সহিত কথা থেকে। স+হিত। হিত মানে ভালো করা। সাহিত্য মানুষের ভালো করার জন্য। কলম অত্যন্ত পবিত্র শব্দ। কলম দিয়ে যেন আমি কারো ক্ষতি না করি। একজন মানুষেরও ক্ষতি হয় এমন কিছু যেন না লিখি। কলমের কাজ মানুষের ভালো করা।
আমি মিস্ত্রিদেরকে দেখেছি, তাদের যন্ত্রগুলোকে তারা খুব যত্ন করেন। হঠাৎ করে পা লেগে গেলে তাতে চুমু খান। আমরাও বই পড়ে গেলে তা তুলে চুমু খাই। আমরা যেন মনে রাখি, কলম পবিত্র জিনিস। এটা কারো ক্ষতি করবার জিনিস না। এটা দিয়ে যেন আমরা কাউকে অপমানিত না করি। কাউকে বিব্রত না করি। ব্যক্তিগত রোষ মেটানোর চেষ্টা না করি। আমার বয়স হচ্ছে। অভিজ্ঞতা বাড়ছে। তারই ভিত্তিতে আমি এটা বললাম।
প্রশ্নটা ছিল, কাঁচা লেখকদের নিয়ে আমরা কী করব?
এ প্রশ্নের উত্তর হলো, আমিও তো অনেকের চোখে কাঁচা লেখক। আমি অন্যের কাছে যে ব্যবহার আশা করি, অন্য লেখককেও আমি সেই ব্যবহার দেব।
(লেখাটি মাকসুদা আহমেদে’র ফেসবুক স্টেটাস থেকে নেয়া