এই ধারণা বদ্ধমূল

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম
আমরা অনেকেই স্বভাবে এমন যে আমাদের অভাবের শেষ নেই। অভাব শুধু আর্থিক নয়- অনেক শাখা রয়েছে তার। প্রতিভার অভাব, ভালো বন্ধুর অভাব, সমর্থনের অভাব, সম্মানের অভাব, জনপ্রিয়তার অভাব, সর্বোপরি জ্ঞানের অভাব। একটাতে একটু এগিয়ে গেলেই বাকিগুলোর পেছনে ছুটে মরি। অন্যের যা আছে তা কেন আমার নেই? তাই যার আছে তার সফলতায় ঈর্ষায় মরি। তা গ্রহণ বা অর্জন করতে না পেরে তার সম্পর্কে নেতিবাচক বদ্ধমূল ধারণা পোষণ করে পরিবেশ বিষিয়ে তুলি। অতপর নিজের সব অভাব পূরণ করতে না পেরে আজীবন অতৃপ্তির জগতে বসবাস করে মৃত্যুর পরে অন্যের দোয়া, বরকতে স্বর্গবাসী হই(!)

অন্যের সম্পর্কে নেতিবাচক বদ্ধমূল ধারণার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। একটি উদাহরণ প্রয়োগ করতে ধরে নিই, মিস্টার চেয়ার খুব একজন ভালো মানুষ। মিস্টার বেঞ্চ তার প্রতিবেশী বা একই অঙ্গনের কেউ। কোনো এক ব্যক্তি, ধরি মিস্টার টেবিল মিয়া, কোনোভাবেই মিস্টার চেয়ার সম্পর্কে কিছু জানেন না। তিনি নতুন প্রতিবেশী হিসেবে মিস্টার চেয়ার এবং মিস্টার বেঞ্চের সমাজে বা অঙ্গনে বসবাস শুরু করেছেন। মিস্টার বেঞ্চের সাথে মিস্টার টেবিলের প্রথম পরিচয়। মিস্টার বেঞ্চের পক্ষ থেকে হোক বা মিস্টার টেবিলেরই পক্ষ থেকে হোক কথাচ্ছলে মিস্টার চেয়ারের নাম উঠে এলো।

মিস্টার বেঞ্চ যেহেতু মিস্টার চেয়ারের কারণে বা কাছ থেকে তার মন্দ স্বার্থ হাসিল করতে পারেননি সুতরাং তিনি মিস্টার চেয়ার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে মিস্টার টেবিলের কান ভারি করে তুললেন। এখানেই পক্ষপাতের সৃষ্টি। এরপর থেকে মিস্টার টেবিল মিয়া মিস্টার চেয়ারের সাথে খুব গভীরভাবে না মেশা পর্যন্ত মিস্টার চেয়ার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারবেন না। এমনকি এমনও হতে পারে যে, প্রতিবেশী বা একই অঙ্গনের লোক হিসেবে মিস্টার চেয়ার সাহেব যতই মিস্টার টেবিলকে সুপরামর্শ দিন বা উপকার করুন না কেন মিস্টার টেবিলের মাথায় যা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা মিস্টার টেবিলের মাথা থেকে সহজে যেকোনো ইরেজারে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। মিস্টার বেঞ্চ মিয়া এখানেই একজন সফল প্রচারক, প্রতারকও। পূর্বাহ্নেকৃত প্রতিকূল ধারণা তাই মিস্টার টেবিলের অন্তরে গ্রোথিত। এতে করে মানুষ পক্ষপাতগ্রস্থ হতে পারেন এটা সহজেই অনুমেয়।

মিস্টার বেঞ্চ আসলে মিস্টার চেয়ারের থেকে তার নিজের মন্দ স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারেননি। তাই মিস্টার চেয়ারের বিরুদ্ধে অন্যান্যদের সামনে এমনসব নেতিবাচক কথা তুলে ধরলেন। এতে করে মিস্টার চেয়ার অন্যান্যদের কাছে আর ভালো থাকতে পারছেন না। ভালো থাকতে পারছেন না এর মানে এই নয় যে মিস্টার চেয়ার তাঁর স্বভাব পরিবর্তন করে খারাপ হয়েছেন। বরং মিস্টার চেয়ার ভালোই রয়েছেন কিন্তু মিস্টার বেঞ্চের জন্য অন্যের কাছে তিনি (মিস্টার চেয়ার) প্রচারিত খারাপ এবং প্রতারিত হচ্ছেন। কারণ মন্দ স্বার্থ সিদ্ধি করতে না পেরে যে মিস্টার বেঞ্চ মিয়া মিস্টার চেয়ারের খারাপ গুণ প্রচার করছেন তার থেকে আর বাকি মিস্টার টেবিলগণ মিস্টার চেয়ার সম্পর্কে একেকটি নেতিবাচক বদ্ধমুল ধারণা পোষণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

দেখা যাক, মানুষ কেন এমন বদ্ধমূল ধারণা বা স্বভাবের গভীরে গ্রোথিত হন? আসলে বিষয়টা বোঝা সহজ। কিন্তু অনেকেই সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করেন। এর একমাত্র কারণ হলো সীমাবদ্ধতা। আমাদের সকলের সীমাবদ্ধতা আছে। তাহলে কোন সীমাবদ্ধতার কথা বলছি? বলছি অপ্রতিরোধী, কর্মবাচ্যসূচক, নিষ্ক্রিয়দের সীমাবদ্ধতার কথা যাদের চিন্তা-চেতনা পরোক্ষ অর্থাৎ যারা মন্দভাবে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হন। এরা কখনো সুন্দরের অনুকূলে যেতে না পেরে মন্দের প্রতিকূলে ছোটেন। এরা নিজের চিন্তাশক্তিকে কাজে না লাগিয়ে, ভালোমন্দ বিচার না করে অন্যের কথামতো আর সকলদের ভাবতে বা বুঝতে শুরু করেন। এতে করে আমরা অনেকেই মন্দদের সম্পর্কে ভালো ভাবতে শুরু করি আর অনেক ভালোগণ মন্দের তালিকায় যুক্ত হন। এসব বদ্ধমূল ধারণার ফল কখনো মিষ্টি হয় না।

আমরা অবশ্য প্রতিটি কর্মের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক খুঁজি। এটা খুব ভালো ফল এনে দিতে পারে কারণ এতে চিন্তাশক্তি প্রখর হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কেউ কাউকে নেতিবাচক কিছু বললে আমরা অনেকেই উক্ত ব্যক্তির জানা ইতিবাচক গুণগুলোকে বিষ মেখে গুলিয়ে ফেলে তার নেতিবাচক দিকগুলো প্রচারে মেতে উঠি। আমরা সত্য-সুন্দরের নামে করে পরনিন্দা আর পরশ্রীকাতরতায় ব্যস্ত অনেকেই। যার দ্বারা উপকৃত হই পরক্ষণেই তাঁর নামে নিন্দা ছুঁড়ে তাঁকে বহিষ্কার করি। কে কাকে কেন তেল মারে নাকি মারে না এটা নিয়ে তারা কষ্ট করে মানুষ খুঁজে বিনে পয়সার প্রচার করে মানুষকে জ্ঞান বিতরণের চেষ্টা করে যেখানে তারা নিজেরাই জ্ঞানশূন্য।

এমন মানুষের কাছ থেকে সমাজ ভালো কিছু আশা করতে পারে না। এরা ক্ষতিকর জীব। আর আমরা অনেকেই অনুধাবন করি না যে, আমাদেরও অনেক নেতিবাচক দিক রয়েছে। বেঁচে থাকা এমন কাউকে দেখাতে পারবেন যিনি দুধে ধোয়া? এমন তিক্ত কথায় অনেকেই কষ্ট পেতেই পারেন, কিন্তু যার সম্পর্কে কেউ এর চেয়েও বেশি তিক্ত কথা বলছেন তিনি সেটা শুনে থাকলে তিনি কতটা কষ্ট পাবেন সেটাও অনুধাবন করা উচিৎ। কারণ আপনি যার সম্পর্কে মন্দ বলছেন তিনি কখনোই আপনার বলা মন্দ কথাটা শুনতে পাবেন না- আপনার এমন ভাবনাও ভুল। মন্দ-ভালো মিলেই মানুষ। তাই বলে ভালোদেরকে যারা মন্দ বলে মজা লুটছেন তাদের জন্য বিশেষ দ্রষ্টব্যে আমি কি বলতে পারি যে, তারা ঠিক কাজটিই করছেন?

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম : শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *