উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানি বৃদ্ধি; ১৪ জেলায় ৫ লাখ মানুষ গৃহহীন

দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৪টি জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। পানিতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট। ধ্বংস হয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত।

এসব জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পানিবন্দি হয়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। ঘনবসতিপূর্ণ এসব অঞ্চলে খাদ্য-পানীয়-বাসস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।

ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

বানের পানি দীর্ঘায়িত হওয়ায় বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলছে। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে  অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে।

বহু মানুষ বেড়িবাঁধে, খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করছেন পানিবন্দি মানুষগুলো।

সিলেটের গোলাপগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি।

সুনামগঞ্জে ৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত, ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। বগুড়ার ধুনটে বানিয়াজান স্পারে আরও ৫০ মিটারে ধস। বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি প্রবেশ করে কলাপাড়ার ১৫টি গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। জামালগঞ্জে দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত, ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি।

কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। বানভাসি ২ লাখ মানুষের দুর্ভোগ চরমে। ত্রাণের জন্য হাহাকার। তিস্তার ভাঙনে ১ কি.মি. বাঁধ বিলীন। কুড়িগ্রামে দেড় শতাধিক পরিবার গৃহহীন।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলো জ্বালানি, খাবার ও পানি সঙ্কটে ভুগছে। ফলে বানভাসি মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সোমবার সকাল থেকে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চারটি ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

গত তিন দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যানন্দ, নাজিমখান, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও ছিনাই ইউপি’র গ্রামগুলো ঢুবে গেছে। পানিবন্দি পরিবারগুলো অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।

কুড়িগ্রামের পানিবন্দি পরিবারগুলো জ্বালানি, খাবার ও পানি সঙ্কটে ভুগছে। ফলে বানভাসি মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনার পানি সামান্য কমলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল দুপুরে বিপদসীমার ১৩  সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এদিকে, সিরাজগঞ্জ সদর, চৌহালী, কাজিপুর, বেলকুচি এনায়েতপুর, শাহজাদপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের কয়েক হাজার ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। এসব এলাকার অনেক স্কুল তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।

অপরদিকে, যমুনায় পানি স্থিতিশীল থাকলেও অভ্যন্তরীণ নদ-নদী করতোয়া, হুরাসাগর, গুমানী, বড়াল নদীর পানি বেড়েছে। বর্তমানে জেলার ৭টি উপজেলার ৮২ ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬০টি ইউনিয়ন কমবেশি বন্যাকবলিত হয়েছে।

রবিবার বিকালে চৌহালী উপজেলার মুরাদপুর চরে কৃষক আব্দুস ছালাম ফকিরের আড়াই বছরের শিশুপুত্র নাহিদ বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর ভাঙন রক্ষায় নির্মিত স্পারে বানিয়াজান এলাকায় আবারও ৫০ মিটার মাউথ বেল্টের ঢালাই অংশে ফাটল ধরেছে। যে কোন মুহূর্তে ওই ৫০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালির জিও ব্যাগ ফেলে ফাটল অংশটুকুকে রক্ষার চেষ্টা করছে। এদিকে যমুনার পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, সুরমা-কুশিয়ারার পানি বিভিন্নস্থানে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ভাদেশ্বর, শরীফগঞ্জ, উত্তর বাদেপাশা, বুধবারীবাজার, ঢাকা দক্ষিণ ও আমুড়া ইউনিয়নের অনেক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। শরীফগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার রেহান উদ্দিন জানান নুরজাহানপুরসহ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। ফসলি জমি বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জনদুর্ভোগ বেড়ে গেছে।

এলাকার বিত্তশালীদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক এলাকার স্কুল-মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার ৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।  ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। রাস্তাঘাটে পানি ওঠায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে অনেকস্থানে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বন্যাকবলিত এলাকার প্রতিটি স্কুল-কলেজ আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সড়কে পানি ওঠায় সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ-ছাতকের দোয়ারাবাজার অংশের বেশ কিছুস্থান দিয়ে পাহাড়ি ঢল প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামের মানুষ।

সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগর, কাজির পয়েন্ট, সাহেববাড়ির ঘাট, মধ্যবাজার, বড়পাড়া, লঞ্চঘাট, পশ্চিমবাজার, পশ্চিম তেঘরিয়াসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পানি উঠেছে। ছাতক শহরেরও বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে ৫ শ’ টন চাল ও ত্রাণসামগ্রী চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও   দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১০ টন চাল ত্রাণসামগ্রী হিসেবে  দেয়া হয়েছে। রবিবার রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার আশঙ্কায় সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে ভেঙে গেছে  বেড়িবাঁধ। লোনা পানি প্রবেশ করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। মানুষের ভোগান্তি ওঠানামা করছে প্রতি ছয় ঘণ্টা পরপর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সঙ্গে।

প্রতিদিন দুই দফা জোয়ারে গিলে খাচ্ছে ওইসব গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু। ভোগান্তির শেষ নেই সাধারণ মানুষের।