ইসরাইলের তিন প্রতিপক্ষ ও ফিলিস্তিন

মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর রাষ্ট্র ও বিশ্বরাজনীতির বিন্যাস ও পুনর্বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত ইসরাইলের মানচিত্র সম্প্রসারণের ব্যাপারে এখন সবচেয়ে অনুকূল এক সময় বিরাজ করছে বলে মনে করেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা। এই সুবাদে জর্দান উপত্যকা ও পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের মানচিত্রভুক্ত করার আয়োজন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। গুগল-অ্যাপলের মতো সংস্থার মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মুছে দেয়ার খবরও গণমাধ্যমে বের হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল হলো একমাত্র দেশ যার রাষ্ট্রস্বীকৃত ও প্রকাশিত কোনো মানচিত্র নেই। এটিকে অদূরভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বৃহৎ পরিসর নিয়ে ইসরাইল গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষণ হিসাবে অনেকে দেখে থাকেন।

একসময় ইসরাইলের সাথে যেসব আরব রাষ্ট্রের যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে সেসব দেশ মিসর, সিরিয়া, লেবানন অথবা একটু দূরের সৌদি আরব, ইরাক বা সিরিয়াকে তেলআবিবের শত্রু মনে করা হতো। এখন সে ধারণা অনেকখানি পাল্টে গেছে। ইসরাইলের ডিপ স্টেট সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন তারা জানেন, মুসলিম বিশ্বের তিনটি রাষ্ট্রকে ইসরাইল এখন সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে। আর এ কারণে ইসরাইলের বর্তমানের নীতি কৌশল বিন্যাসে এই তিনটি দেশ বিশেষ ফোকাসে পরিণত হয়েছে।

এর মধ্যে ইরানকে ইসরাইলের ঘোষিত সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করা হয়। দেশটির পরমাণু স্থাপনা এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের জীবননাশের যেসব অন্তর্ঘাতী কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে তার পেছনে ইসরাইলের হাত রয়েছে বলে মনে করা হয়। সর্বশেষ ইরানের বেশ কিছু পরমাণু স্থাপনায় অন্তর্ঘাতী হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক তদন্তেও ইসরাইলের ইরানি এজেন্টদের যোগসূত্র পাওয়ার কথা জানা যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর সেখানে ধর্মীয় নেতারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ইরানের নেতারা ইসরাইলকে বর্জন করার আহ্বান জানান। তারা মনে করেন, ইসরাইল অবৈধভাবে মুসলমানদের ভূমি দখল করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

আর ইসরাইলও তাদের অস্তিত্বের জন্য ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখে। ইসরাইল সবসময় বলে এসেছে ইরানের অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র থাকা উচিত হবে না। ইসরাইলের নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর থেকে নানা অবয়বে অব্যাহত থাকা অবরোধ, বিধিনিষেধের পেছনেও ইসরাইলের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

ইসরাইল এখন দ্বিতীয় প্রধান প্রতিপক্ষ শক্তি মনে করে তুরস্ককে। ইসরাইল যে ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটি শত শত বছর ধরে তুরস্কের উসমানীয় খেলাফতের অধীনে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর তুর্কি খেলাফতের এলাকাগুলো ব্রিটেন ফ্রান্স গ্রিস ইতালি রাশিয়া ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। পরে ব্রিটেন ফ্রান্স মিলে এই অঞ্চলকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে স্বাধীনতা দেয়। লুজান চুক্তির আওতায় উসমানীয় খেলাফতের চূড়ান্ত অবসানের পর এর উত্তরাধিকারী রাষ্ট্র হিসাবে যে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয় সেটি নীতি হিসেবে সম্পূর্ণ বিপরীত এক আদর্শ গ্রহণ করে। কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আল্ট্রা সেক্যুলারিজমকে নতুন রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয় যাতে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পর্যায়ে ধর্মীয় বিধিবিধান অকার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

লুজান চুক্তিতে তুরস্কের ওপর যে বাধ্যবাধকতাগুলো আরোপ করা হয় তাতে শুরু থেকেই দেশটি আরববিমুখ ইসরাইলের স্বীকৃতিদানকারী একমাত্র মুসলিম দেশে পরিণত হয়। তুরস্কের রাজনীতি ও সেনাবাহিনীতে ইসরাইল ও তার মিত্রদের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ১০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী একজন জনপ্রিয় তুর্কি রাজনীতিবিদকে ফাঁসি দেয়া হয় প্রধানত অনেক বন্ধ মসজিদ উন্মুক্ত করে দেয়া এবং আরবিতে আজান দেয়ার অনুমতি প্রদানের কারণে। ২০০২ সালে রজব তৈয়ব এরদোগানের নেতৃত্বে একে পার্টি এবং এর আগে নাজমুদ্দিন আরবাকানের নেতৃত্বে ওয়েলফেয়ার পার্টির কোয়ালিশন সরকার তুরস্কের ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাষ্ট্রের পরিবেশ ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো কমিয়ে আনা হয়। সেনাবাহিনীর মধ্যকার অভ্যুত্থান প্রবণতাও কমতে থাকে। খেলাফত আমলের ঐতিহ্যগুলো এবং এর প্রভাব আবার সামাজিকভাবে ফিরে আসতে থাকে।

লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার সাথে সাথে তুরস্ক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়। সর্বশেষ ইস্তা¤ু^ল জয়ের প্রতীকে পরিণত হওয়া আয়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে রূপান্তর করার মাধ্যমে তুরস্কের এক নতুন যুগে পদার্পণের বিষয়ে ইঙ্গিত আসে।

ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও এসব পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুরস্কের ব্যাপারে ইসরাইলের সংশয় আরো বাড়িয়ে তোলে। যার ফলে ন্যাটোর অন্যতম প্রধান সদস্য হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র মূল্য পরিশোধের পরও আঙ্কারাকে এস-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেনি। এখন ইসরাইলি মিডিয়ার তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলের চাপেই যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এস-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়নি।

ইসরাইল ১৯৭৩ সালের আরবদের সাথে সর্বশেষ যুদ্ধের পর প্রত্যক্ষ যুদ্ধের চেয়েও প্রক্সি বা ছায়া যুদ্ধকে কৌশল হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ জন্য আরব দেশসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সঙ্ঘাত লাগিয়ে রাখা এবং শক্তিমান দেশগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টাকে দেশটির ঘোষিত ইনোন কৌশলের একটি অংশ করে নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কিছু দেশের বৈরিতাকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশল গ্রহণ করে। আবার কিছু রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের সামনে হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

চলতি দশকের শুরুর দিকের আরব জাগরণ এবং এর পরবর্তী গৃহযুদ্ধ ও আন্তঃরাষ্ট্র সঙ্ঘাতের পেছনে এই কৌশলের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই সঙ্ঘাতে সিরিয়া ও কুর্দি ইস্যুতে তুরস্ক সম্পৃক্ত হয়ে পড়লেও তাতে দেশটির সক্ষমতায় বড় কোনো আঘাত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সর্বশেষ ২০১৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার ফলে তুরস্ককে আঞ্চলিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার আরো একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর পর লিবিয়ার ইস্যুটি সামনে আসার পর অরেকবার প্রক্সিযুদ্ধে তুরস্ককে জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। যার সাথে আরব দেশগুলোকে সরাসরি সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।
ইসরাইলের সামনে আরেক শক্তিধর প্রতিপক্ষ হলো পাকিস্তান। দু’টি দেশ প্রায় কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনতা লাভ করে। ইসরাইল গঠিত হওয়ার পর প্রথম সংসদেই ভাষণ দেয়ার সময় তদানীন্তন ইসলাইলি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ইসরাইলের এক নাম্বার শত্রু কিন্তু কোনো আরব দেশ নয়, এক নাম্বার শত্রু হলো পাকিস্তান। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পর এ ধারণা ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের ওপর আরো গভীরভাবে ভর করে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান বিভক্তির প্রস্তাব নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে ইসরাইলের নেতাদের গোপনভাবে কাজ শুরু করার কথা এখন পুরনো অনেক তথ্যে প্রকাশ হচ্ছে।

দু’টি দেশই ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তাদের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক বন্ধন নেই। মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান ইসরাইলকে কখনো রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করেনি। বহিঃবিশ্বের কাছে ইসরাইল ও পাকিস্তান পরস্পর শত্রু দেশ হিসেবে পরিচিত। ‘দি এশিয়ান এজ’-এর সাংবাদিক আদ্রেয়ান লেভি ও ক্যাথরিন স্কট ক্লার্কের বইয়ে বলা হয় যে, ইসরাইল ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের গুজরাটের জামনগর বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের কাহুতা নিউক্লিয়ার স্থাপনায় হামলা চালাতে চেয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজেদের সীমানার খুব কাছে তিনটি দেশের এমন সম্ভাব্য পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পরিকল্পনাটি রদ করে দেন।

’৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত করা এবং এতে পাকিস্তানকে জড়ানোর মাধ্যমে দেশটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বোঝা চাপানো হয়। সর্বশেষ টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর অভিযানে তালেবান সরকারের পতন ঘটানোর মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল। তালেবান পতনের পর নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের যে সরকার আফগানিস্তানে গঠিত হয় তার সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বেসামরিক প্রশাসন- সবকিছুর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতের বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি হয়। আর এরপর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতী তৎপরতায় আফগান সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনকে নানাভাবে ব্যবহার করার তথ্য আসতে থাকে।

আফগানিস্তানে আমেরিকার অভিযান কার্যত ব্যর্থ হওয়ার পর এখন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে কাশ্মির ফ্রন্টকে। ঠিক এক বছর আগে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনসংবলিত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর থেকে সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সাথে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা বিভিন্ন বৈশ্বিক গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে।

ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে ইসরাইলের স্বার্থের একটি হলো তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী বিক্রি করা। আর দ্বিতীয়টি হলো ইসরাইলের কৌশলগত তিন শত্রুর একটি পাকিস্তানকে দুর্বল করা অথবা সম্ভব হলে আরো খণ্ড বিখণ্ড করা।

ইসরাইলের কৌশলগত এই তিন প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার ব্যাপারে দেশটির প্রধান নীতি থাকে প্রক্সি তৈরি করে তাদের দিয়ে মোকাবেলা করা। এ ক্ষেত্রে ইরানের বিপ্লব রফতানি ও শিয়া মতাদর্শ প্রচারের সাথে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলোর সামনে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য থাকে এক দিকে কোনোভাবেই ইরানকে প্রবল শক্তিমত্তা বা সক্ষমতা অর্জন করতে না দেয়া, আবার দেশটির অবস্থা যেন এমন নাজুক না হয় যাতে আরব প্রতিপক্ষগুলো দেশটিকে হুমকি ভাবতে না পারে। ইরানের প্রভাবকে ইরাক সিরিয়া হয়ে সৌদি সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, অন্য দিকে ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করা এ সব ইসরাইলের সার্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে ঘটছে বলে অনেকের ধারণা।

ধারণা করা হয় যে, ইরানের কৌশলবিদদের সামনে দুই প্রধান শত্রুর একটি হলো ইসরাইল অন্যটি সৌদি রাজতন্ত্র। ইসরাইল ইরানি হুমকি মোকাবেলার জন্য সবসময় সৌদি আরব ও তার উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।

ইরানের ব্যাপারে ইসরাইলের যে কৌশল একই কৌশল কিছুটা ভিন্নভাবে তুরস্কের ওপরও প্রয়োগ করা হয়। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হিসেবে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের বৈরিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশটির রাজনীতি ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার যে কৌশল কয়েক দশক ধরে ইসরাইল অনুসরণ করে আসছিল সেটি এখন সেভাবে কাজ করছে না। এখন উসমানীয় খেলাফতের সময়কার কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সাথে আরব জাতীয়তাবাদীদের সঙ্ঘাতের ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর আঙ্কারার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের স্যাটেলাইট মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিসরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তুরস্কের বৈরী প্রতিবেশী অন্য দেশকেও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হচ্ছে।

২০২৩ বা ২০২৪ সালে লুজান চুক্তি শেষ হওয়ার পর তুরস্ক নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রয়াস নিচ্ছে সেটিকে তুর্কি খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসাবে তুলে ধরে এসব দেশের সাথে তুর্কি শাসকদের শত্রুতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও তুরস্কের ঘোষিত নীতির লক্ষ্য হলো বর্তমান রাষ্ট্রিক সীমানা বহাল রেখেই মুসলিম দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা এবং সাধারণ শক্তি অর্জন ও সক্ষমতা সৃষ্টিতে সহায়তা করা। এ ক্ষেত্রে তুর্কি শাসকদের বক্তব্যে অতীত ঐতিহ্য জাগিয়ে তোলার প্রচেষ্টা থাকলেও অতীত মানচিত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো হঠকারী বক্তব্য বা ইঙ্গিত কোনো সময় মেলে না।
এখন সর্বব্যাপী চাপের মধ্যে থাকা ইরান ও পাকিস্তান তুরস্কের সাথে মিলে একটি শক্তিমান বলয় তৈরির লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হয়। এর মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্যের সাথে সরাসরি সঙ্ঘাতে না গিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নিয়ে রাষ্ট্রিক অখণ্ডতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাইছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক বৈরিতার মোকাবেলায় রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে চাইছে ইরান।

যেভাবেই হোক না করোনাভাইরাসের আগের যে পৃথিবী ও বিশ্বব্যবস্থা ছিল সেটি করোনা-উত্তরকালে আর সেভাবে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। এই সময়ের মধ্যে যে বড় ব্যবধান সেটি হলো ভারসাম্যের পরিবর্তে দুই প্রধান পক্ষের মধ্যে সরাসরি সঙ্ঘাত সৃষ্টি হওয়া। এই মেরুকরণে ইসরাইল ও ভারত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বলয়ের সাথে চলে যাচ্ছে। কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে ভারতের যে সঙ্ঘাত সম্প্রতি দেখা দিয়েছে তাতে ভারতের পাশে তেলআবিবের একাত্ম ভূমিকা পালনের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এখন দেখা যাচ্ছে। এতে করে দীর্ঘকাল ধরে ইরানের সাথে ভারতের যে একধরনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ছিল তা ভেঙে পড়ছে। আর চীনের সাথে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ইরানের।
অন্য দিকে চীনের সাথে ইসরাইলের যে দীর্ঘ সময়ের বাণিজ্য ও বেসামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের অংশীদারিত্ব ছিল সেটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইসরাইলে চীনা কূটনীতিকের রহস্যজনক মৃত্যু, ভারতে চীনা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিন্ন করতে সহযোগিতা প্রদান আর কাশ্মীরে চীনকে মোকাবেলায় দিল্লির প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান আয়া সোফিয়ার পর একসময় আল আকসা জয়ের যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তা অর্জনে এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সম্ভবত করোনা-উত্তর ২০২১ সালে চীন-রাশিয়া ও মিত্র বলয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র শক্তির সর্বাত্মক যে স্বার্থ সঙ্ঘাত শুরু হতে যাচ্ছে তাতে ইসরাইল ও তার প্রতিপক্ষ তিন মুসলিম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা থাকবে। সেই সঙ্ঘাতের আগে ও পরে এসব দেশের নিজস্ব সামরিক-বেসামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য অর্জনের কথা ওআইসি ও অন্যান্য মুসলিম ফোরামে উচ্চারিত হয়েছে তা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। আর এ সময় ইসরাইলের মিত্র শক্তির বিপরীতে যে পাল্টা একটি মুসলিম শক্তির অভ্যুদয় ঘটছে সেটি হতে পারে মুসলিম জনগণের জন্য আশার গুরুত্বপূর্ণ বাতিঘর।

You Might Also Like