ইসরাইলকে নিয়ে কেন সৌদির ইউটার্ন

ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করেন সৌদি রাজপুত্র তুর্কি বিন ফয়সাল

ইলিয়াস হোসেন
ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যাচ্ছে বলে কিছুদিন ধরে জল্পনা কল্পনা চলছিল। তবে বাইরাইনে এক নিরাপত্তা সম্মেলনে দুই প্রভাবশালী সৌদি যুবরাজ ইসরাইলের নজিরবিহীন সমালোচনা করেছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে সৌদি কেন হঠাৎ এমন অবস্থান নিলো। সৌদি আরবের বিদেশনীতিতে কিছু আকস্মিক পরিবর্তন এবং এর নেপথ্য কারণ নিয়ে থাকছে আজকের বিশ্লেষণ।

ঘটনাগুলো ঘটছে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়ের পরপরই সৌদি আরবে গোপন সফরে গিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বা এমবিএসের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সেই বৈঠকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দাবি নাকচ করে দেন এমবিএস। এরপর কাতারের ওপর সৌদি জোটের অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

সৌদি বাদশা সালমান গত মাসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে ফোন করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার আহ্বান জানিয়েয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছে বাহরাইনে নিরাপত্তা সম্মেলনে। সেখানে প্রভাবশালী দুই সৌদি যুবরাজ তুর্কি বিন ফয়সাল ইসরাইলকে তুলোধুনে করেছেন।

ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করে সৌদি রাজপুত্র তুর্কি বিন ফয়সাল একেবারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, যতক্ষণ স্বাধীন ফিলিস্তিন না হচ্ছে, ততক্ষণ ইসরাইল যেন আরব বিশ্বের আর কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন না করতে পারে। গত ৬ জুন মানামা ডায়ালগের শেষ দিনে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

সাবেক গোয়েন্দা প্রধান যুবরাজ ফয়সাল যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী হাউস অব সৌদের সদস্য। মানামা ডায়ালগে সৌদি আরবের প্রতিনিধি দলে ছিলেন তিনি। ফয়সাল যখন ইসরাইলকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন, তখন ইহুদিবাদী দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাবি আশকেনাজিও সেখানে ছিলেন।

সম্প্রতি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য বাহরাইন ও আমিরাতের প্রতিনিধিদের ইসরাইল তাদের দেশে ধুমধাম করে স্বাগত জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের এই আক্রমণের মুখে পড়ে হতচকিত হয়ে পড়েন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সৌদি বাদশাহ সালমানের ঘনিষ্ঠ প্রিন্স ফয়সাল বলেন, ইসরাইল নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের বাস্তব ছবিটা হলো, তারা একটি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনে আছে। ইসরাইল তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে অত্যাচার করছে। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ কেউই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। ইসরাইল ইচ্ছামতো ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ধ্বংস করছে, যাকে খুশি মেরে ফেলেছে।

যুবরাজ তুর্কি বিন ফয়সালের মতে, সমস্যার সমাধান একমাত্র তখনই হতে পারে, যখন ইসরাইল ১৯৬৭ সালে অধিকৃত ভূখন্ড ফিলিস্তিনকে ফিরিয়ে দেয় এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনকে মেনে নেয়। তা হলে আরব দেশগুলির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব হতে পারে।

বোঝাই যাচ্ছে যে সৌদি রাজপুত্রের ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি সোজাসাপ্টা অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে। আর তারা ও তাদের পোষা মিডিয়া সমানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে রক্তপিপাসু হত্যাকারী আছে, যারা সৌদির অস্তিত্বকেই মুছে ফেলতে চায়। তার পরও ইসরাইল প্রচার করে, তারা সৌদির বন্ধু হতে চায়।

এর পরই বক্তব্য দেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌদি প্রতিনিধির মন্তব্যে আমরা ক্ষুব্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তন আসছে। সৌদি প্রতিনিধির কথায় তার ছাপ নেই। তার মতে, শান্তিচুক্তি না হওয়ার জন্য ফিলিস্তিন দায়ী।

এদিকে মানামায় ওই সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যেসব কথা বলেন, তাও ইসরাইলকে হতাশ করেছে। প্রিন্স ফয়সাল বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হলে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের স্বাভাবিক সম্পর্ক হবে না। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সৌদি অবস্থান শক্ত।

সৌদি আরব বলেছে, ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলে ফিলিস্তিন বিরোধ সমাধান করতে হবে, ২০০২ সালে আরব শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীন টেকসই একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে হবে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের বিরোধ না মিটলে এ অঞ্চলে সত্যিকারের শাস্তিও স্থিতিশীলতা আসবে না।

সৌদি আরবের উদ্যোগে ২০০২ সালের শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূমি ইসরাইলকে ছেড়ে দিতে হবে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, সৌদি রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্যের মুখে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যা শোনা গেছে, তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ইহুদিবাদী দেশটির নেতারা। সৌদি আরব পিছিয়ে গেলে বাকি আরব দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে তা নিয়েও তাদের মনে উদ্বেগ ঢুকছে সন্দেহ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ব্যাপক ক্ষমতাধর হলেও ভবিষ্যত অস্তিত্ব নিয়ে সবসময়ই উদ্বিগ্ন থাকে দেশটির নীতি নির্ধারকরা । সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ইসরাইল অনেকটাই নির্ভার হতে পারে। সৌদি আরবের নিওম শহরে গত মাসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে গোপন এক বৈঠকের পর পর্যবেক্ষকরা বলতে শুরু করেন যে, সৌদি আরব-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সৌদি আরবের বর্তমান অবস্থানের ফলে ইসরাইলের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে স্বাভাবিক সম্পর্কের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সৌদি আরব এখন কেন ইসরাইলের সমালোচনায় সোচ্চার? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক করতে তার আরব মিত্রদের সামনে ঠেলে দিলেও সৌদি আরব নিজে যে পিছিয়ে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিত দিনে দিনে স্পষ্ট হচ্ছে।

লন্ডনে ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান ড সাদি হামদি বিবিসিকে বলেন, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফারহান বা প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সালের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে বাদশাহ সালমান এবং তার ছেলে যুবরাজ মোহাম্মদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সাল বাদশাহ সালমানের খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি মানামায় ইসরাইলকে আক্রমণ করে যা বলেছেন তা সৌদি বাদশাহের মনোভাবের প্রতিফলন। ফিলিস্তিনিদের কিছু না পাইয়ে দিয়ে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সৌদি বাদশাহর তীব্র আপত্তি রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের বড় একটি অংশ এখনো সাধারণ আরব জনগণের মতামত নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তিত। তুরস্কের কাছে তাদের নেতৃত্ব এরই মধ্যে অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে।

গোপনে ইসরাইলের সাথে বেশ অনেক দিন ধরে নানা সম্পর্ক থাকলেও সৌদি নেতৃত্বের এই অংশটি এখনও দেখাতে চা যে মক্কা ও মদিনার মসজিদের রক্ষক হিসাবে ফিলিস্তিন সমস্যার মত মুসলিম বিশ্বের মূল কিছু বিষয়কে সৌদি আরব গুরুত্ব দেয়। যেমন দীর্ঘদিন পর সৌদি আরব সম্প্রতি কাশ্মীরে ভারতের মুসলিম নিপীড়ন নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। সুতরাং এটা প্রজন্মের বিভেদ, বাবা ও ছেলের মধ্যে বিভেদ। প্রশ্ন উঠছে ইসরাইল এ নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন।

ইসরাইলে নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা জেরুসালেম ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির গবেষক ড. জনাথন স্পায়ার বিবিসিকে বলেন, সম্পর্ক নিযে সৌদিদের এই দ্বিধা অবশ্যই ইসরাইলের কাছে উদ্বেগের। কারণ সৌদি আরব খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। অন্য কিছু দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের জন্য রিয়াদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেমন, মরক্কো।
কিন্তু,বেশ কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে গোপনে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা চলছে তা অব্যাহত থাকবে। গবেষক সাদি হামদিও মনে করেন, ইসরাইলের সাথে সর্ম্পকের শর্ত হিসাবে ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গ নিয়ে আসার অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হচ্ছে।

এই বিশ্লেষক বলেন, মিসর ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলেন এখন তো তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। সৌদি বাদশাহ কি আরব আমিরাতের নিন্দা করেছেন? না করেননি। সৌদি সবুজ সংকেত ছাড়া বাহরাইন এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই নিতে পারতো না। ইসরাইলের বিমানের জন্য সৌদি আকাশ খুলে দেওয়া হয়েছে। ড. হামদি বলেন, সৌদি নেতাদের কাছ থেকে এখন যা শুনছি তার কিছুটা অভ্যন্তরীণ মতভেদের বহিঃপ্রকাশ এবং কিছুটা জনসংযোগের চেষ্টা।-বিডিভিউজ