আয় খেলা হবে! কোথায়? গরুর হাটে

পবিত্র ঈদুল আজহার চার-পাঁচ দিন আগের ঘটনা। নিত্যকার অভ্যাস মতো সে দিন বিকেলে শরীরচর্চার জন্য বের হয়েছিলাম। করোনা সঙ্কটের সময় আর যাই করি না কেন- প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা একনাগাড়ে দৌড়াতে ভুল করি না। কারণ রোগটির গতি-প্রকৃতি যতটুকু বুঝেছি তাতে মনে হয়েছে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রতিদিন কয়েকবার ফুসফুসের ব্যায়াম, শরীর থেকে ঘাম ঝরানো এবং মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি সাহসী মন ছাড়া এই রোগ থেকে যে রেহাই পাওয়া যাবে না, তা অনেক আগেই বুঝে গেছি। ফলে নিজে এবং পরিবারের লোকজনসহ অফিসের কয়েকজন মিলে গত চার মাস ধরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

করোনা সঙ্কটের এই সময়ে সারা বাংলাদেশের লোকজনের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, সেই আতঙ্কের ভাইরাস থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা অনবরত চালিয়ে যাচ্ছি। বেশির ভাগ অফিস- আদালত-দোকানপাট বন্ধ। যারা ওগুলো খুলে রেখেছেন তাদের বিক্রিবাট্টা বা কাজকর্ম নেই বললেই চলে। আমাদের অফিস ভবনে প্রায় দুই শ’র মতো অফিস-দোকানপাট রয়েছে। আছে খাবারের দোকান, সরকারি ব্যাংকের করপোরেট শাখা এবং বিভিন্ন নামকরা সমিতির অফিস। ফলে সাধারণ সময়ে সকাল ৭টা থেকে শুরু করে রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত পুরো ভবন গমগম করত। দৈনিক ১০-১৫ হাজার লোক আসা-যাওয়া করত। ভবনের সামনে হকারদের ভিড়, পথচারীদের জটলা এবং সামনের রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকত। গত কুড়ি বছর ধরে এভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু করোনা সঙ্কট শুরু হওয়ার পর পুরো এলাকা যেন অভিশপ্ত দুর্গম মরুভূমির মতো নির্জন হয়ে পড়ছে। পুরো ভবনে আমিসহ দুই-তিনজন লোক নিয়মিত অফিসে আসেন শুধু সময় কাটানোর জন্য।

আমার যে ব্যবসাবাণিজ্য ছিল তার ৯৫ শতাংশই অচল রয়েছে। দেনা-পাওনা নিয়ে কারো সাথে কথা বলা যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাগুলোও যেন কেমন হয়ে পড়েছে। কেউ ঘর থেকে বেরুতে চাচ্ছে না- সামাজিক সম্পর্ক যা গত তিন-চার দশক ধরে গড়ে তুলেছিলাম, সেগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। কারো বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ বা গল্পগুজব করতে যাবো- এমন ভরসা পাই না। কারণ কেউই এখন আর মেহমানদের জন্য ঘরের দরজা খুলছে না। শত চেষ্টা বা অনুনয় বিনয় করেও আমার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে দাওয়াত করে আমার বাসা বা অফিসে আনতে পারিনি। কাউকে ফোন করলে যে কথাবার্তা শুনি তাতে ভয়-আতঙ্ক এবং মন খারাপের গল্প ছাড়া অন্য কিছু থাকে না। তাই ফোনে কথাবার্তাও অনেক কমে গেছে। এ অবস্থায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা, শরীর মন ভালো রাখা এবং টিকে থাকা যে কত বড় সংগ্রাম, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

সাধারণত বিকেল ৪টার মধ্যেই ব্যায়াম করার জন্য বের হয়ে পড়ি। কারণ একটু আগে বের হলে সূর্যের আলো শরীরে লাগিয়ে ভিটামিন ডির অভাব পুষিয়ে নেয়া যায়, যদিও সকাল ৯টা থেকে ১১টার সময় যে সূর্যালোক পাওয়া যায় তা নাকি উৎকৃষ্ট ভিটামিন ডি সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু আমার যে জীবনযাত্রা তাতে করে সকালবেলা সূর্যালোক গায়ে লাগানোর ফুরসৎ নেই। ফলে বিকেল বেলাকেই বেছে নিয়েছি। কিন্তু করোনা আসার আগে সাধারণত পালা করে কখনো সকালে আবার কখনো বিকেল বা সন্ধ্যার পর বের হতাম। ধানমন্ডি লেক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, রমনা পার্ক অথবা ক্লাবে গিয়ে ব্যায়াম করতাম যেন একঘেয়েমির কারণ বিরক্তি না পেয়ে বসে। গত প্রায় তিন দশক ধরে আমি এটি করছি। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার শরীর চর্চারত নারী-পুরুষদের সাথে সখ্য ও জানাশোনা রয়েছে যারা ঝড়বৃষ্টি বন্যা-বাদল বা শীতকাল গরমকাল পরোয়া করতেন না। কিন্তু এই করোনাকালে হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া কাউকেই দেখছি না। যাদের দেখছি তাদের চিনতে পারছি না। হাতে-পায়ে পলিথিনের মোজা, মুখে মাস্ক মাথায় হেলমেট এবং চোখে অদ্ভুত চমশা নিয়ে তারা এমনভাবে হাঁটেন, যা দেখে মনে হয় পুরো পথে হয়তো কাঁটা বিছানো রয়েছে। মনুষ্য বিষ্ঠার উৎকট দুর্গন্ধ এবং আশপাশে ওঁৎ পেতে থাকা হায়েনার আক্রমণের ভয় থাকলে মানুষ যেমনটি করে, তারা ঠিক সেভাবেই চলাফেরা করে থাকেন।

আমার অফিসটি তোপখানা রোডে। সেখান থেকে বের হয়ে নিকটস্থ একটি সরু গলিপথ ধরে সেগুনবাগিচার মধ্যে ঢুকে পড়ি। তারপর রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনে দিয়ে মৎস্য ভবন পার হয়ে রমনা পার্কের ফুটপাথে উঠি। সেখান থেকে ফুটপাথ ধরে কাকরাইল মসজিদ-মিন্টো রোড, শাহবাগ হয়ে আবার মৎস্য ভবন আসি। এভাবে দু’বার চক্কর দিতে দেড় ঘণ্টা সময় চলে যায়। পথে নিয়মিতভাবে কিছু ভিক্ষুক, কিছু ছিন্নমূল পরিবার, কয়েকজন পাগল এবং কিছু ভ্রাম্যমাণ পতিতার অনাহার ক্লিষ্ট, চিন্তিত ও ব্যথিত মুখ দেখতে পাই। ফুটপাথের ওপর কিংবা পাশে প্রায়ই মানুষের মলমূত্রের উৎকট গন্ধও বীভৎস দৃশ্য আমাকে বারবার সিঙ্গাপুর-কানাডার কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির বাসভবন থেকে শুরু করে মন্ত্রিপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর এককালীন বাসভবন এবং পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের ফুটপাথের একদম মাঝখানে যখন তরতাজা বিষ্ঠা লেপটানো অবস্থায় দেখি তখন মনে মনে চিন্তা করার চেষ্টা করি, আমাদের উন্নয়ন, রুচিবোধ এবং পরিচ্ছন্নতার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এখন কোন মাত্রায় এবং কত উঁচুতে অবস্থান করছে।

করোনাকালে ঢাকা শহরের অন্য পার্কগুলোর কী অবস্থা তা জানি না। তবে রমনা পার্ক গত চার মাস বন্ধ রয়েছে, যার কারণে আমাদের ফুটপাথ ধরে হাঁটাহাঁটি বা দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। অন্য দিকে, কিছু ক্ষমতাশালী পদস্থ সরকারি কর্মচারী তাদের সরকারি গাড়ি, বডিগার্ড এবং পাত্রমিত্র নিয়ে রাজার হালে রমনা পার্কে আসেন। তাদের দেখলে পার্কের দ্বাররক্ষীরা সভয়ে সালাম ঠোকে এবং সিংহ দরজা খুলে দিয়ে মহারাজাদের পার্কের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তাদের কেউ কেউ আবার গাড়ি নিয়েও ভেতরে ঢুকে যান। আমরা যখন ফুটপাথ দিয়ে দৌড়াই, তারা তখন খোশগল্প করতে করতে পার্কের ভেতরের ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটেন এবং পিটপিটিয়ে গর্বভরে আমাদের দিকে তাকান। প্রথম কয়েক দিন আমার অবশ্য একটু খারাপ লেগেছিল। পরে অদ্ভুত একটি উপায় বের করার পর আর মন খারাপ হয় না। ওসব লোকের দিকে যখন নজর পড়ে তখন সেই নজর ফিরিয়ে এনে ফুটপাথের ওপর নিক্ষেপ করি এবং সেখানে যা দেখি সেগুলোকেই ওই মুহূর্তে আমার কাছে উত্তম বলে মনে হয়।

গত প্রায় চার মাস ধরে এ উপায়ে আমি প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটিয়ে আসছি এবং প্রায় প্রতিদিনই নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছি যেমনটি পেয়েছিলাম ঘটনার দিন। সে দিন যখন আমি তোপখানা রোডের নির্দিষ্ট গলিটি অতিক্রম করছিলাম তখন দেখলাম ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ নামের একটি সরকারি অফিসের সামনে বেশ কয়েকজন লোক জটলা করছেন। তাদের মধ্যে একজন আঙুল উঁচিয়ে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত এক আওয়ামী লীগ নেতার কণ্ঠ নকল করে বলছেন, আয়! খেলা হবে। পাশের লোকগুলো কৌতুক করে বলছে কোথায়! তখন লোকটি বলছেন গরুর হাটে! ঘাড় ফিরিয়ে লোকগুলোকে দেখার চেষ্টা করলাম এবং আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা নিয়ে মানুষ যে কী রূপ রঙ্গ-তামাশা করতে পারে তা হয়তো আমি সে দিনের ঘটনাটি না দেখলে আন্দাজ করতে পারতাম না।

যেদিন উল্লিখিত ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তা শুনেছিলাম, সে দিন থেকেই আমার মনে গরুর হাটের খেলা নিয়ে এক অজানা শঙ্কা কাজ করছিল। এমনিতেই আমাদের দেশে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন ফরজ-ওয়াজিব, সুন্নত বা নফল ইবাদত-বন্দেগি নিয়ে বিরূপ সমালোচনা ইদানীং কেমন যেন ক্ষ্যাপাটে হয়ে পড়েছে। মসজিদে গমন, আজান দেয়া, মাদরাসা শিক্ষা, দাড়ি-টুপি ইত্যাদি নিয়ে নাস্তিকেরা তাদের দোসরদের নিয়ে ১০ গলায় বাহারি টিপ্পনী কেটে আসছিল। এর বাইরে হজ, কোরবানি এবং ওমরাহ নিয়ে নানা নেতিবাচক কথাবার্তা বলে সামাজিক বিভেদ বিসংবাদ বাড়িয়ে তুলেছিল। ফলে দেশে যখন করোনা সঙ্কট শুরু হলো, তখন নাস্তিকদের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ল মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাতে নামাজ আদায় এবং জানাজার নামাজের ওপর। এরপর যখন পবিত্র ঈদুল আজহার সময় সমাগত হলো, তখন ভারতীয় গোরক্ষা কমিটির লোকজনের মতো অনেকে বলার চেষ্টা করেছে, এই বছর গরুর হাট বসানোর দরকার নেই। কী দরকার নিরীহ গরুগুলোকে জবাই করার? গরুর পরিবর্তে ছাগল জবাই করলেই তো হয়, ইত্যাদি কথাবার্তা বাজারে হরদম প্রচার করা হলো। ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীদের চক্রান্ত, ভারতীয় গরু চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট এবং দেশীয় চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বহুমুখী তৎপরতা যে একসাথে কোরবানির পশুর হাটে এসে জলকেলি শুরু করবে তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। অথচ কোরবানি ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে রাজধানীর একটি অখ্যাত গলির কয়েকজন বাউণ্ডুলে যুবক ঠিকই গরুর হাটের খেলা খেলার জন্য পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল। জানি না সেই যুবকেরা কী উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেছিল। কিন্তু এবারের কোরবানিকেন্দ্রিক পশুর হাটে যে নির্মম খেলা হলো তাতে কত মানুষ যে সর্বস্বান্ত হয়েছে এবং কত মানুষ যে কোরবানির পশু কিনতে না পেরে অসহায়ের মতো আর্তনাদ করেছে, তার ইয়ত্তা নেই।

এবারের পশুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে পশুপতিদের প্রথম খেলা ছিল এই কথা প্রচার করা যে, এবার রাজধানীতে পশুর হাট বসবে না। ফলে দেশের প্রথা অনুযায়ী গরুর ক্রেতা-বিক্রেতারা ঢাকাকেন্দ্রিক ক্রয়-বিক্রয়ের চিন্তা বাদ দেন। কেউ কেউ গ্রামগঞ্জ বা কোনো খামার থেকে পশু সংগ্রহের চেষ্টা করেন কেউবা অনলাইনে কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং বেশির ভাগ লোক কোরবানি না দেয়ার কথা ভাবতে থাকেন। পরে যখন সীমিত আকারে রাজধানীতে পশুর হাট বসানো হয়, তখন প্রথম কয়েক দিন এমন প্রচারণা চালানো হয় যে, এবার কেউ গরু কিনবে না, কোরবানি দেবে না এবং বাজারে দাম এতটাই কম যে, ২০০ টাকা কেজি দরে ওজন করে গরু বিক্রি হচ্ছে। এসব অপপ্রচারের ফলে দরিদ্র গরুর বেপারিরা লোকসান দিয়ে তড়িঘড়ি করে গরু ছাগল বিক্রি করে দেন- আবার অনেকে হতোদ্যম হয়ে পশু বিক্রি না করেই নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলেন। এ অবস্থায় কোরবানির দু’দিন আগে ঢাকাসহ সারা দেশের পশুর হাটগুলো পশুশূন্য পড়ে। ফলে হাজার হাজার ক্রেতা বিভিন্ন বাজারে ছুটোছুটি করেও কোনো পশু কিনতে পারেননি।

পশুপতিদের সিন্ডিকেট গরুর হাটের খেলা খতম করে এবার পশুর চামড়া নিয়ে নতুন খেলা শুরু করে। তাদের সেই অমানবিক খেলার কারণে কোরবানির চামড়ার দাম এমন পর্যায়ে নেমে আসে যা আমাদের দেশ তো দূরের কথা- আমাজনের গহিন জঙ্গলের অসভ্য সমাজেও ইতঃপূর্বে ঘটেনি। তিন লাখ টাকা মূল্যের একটি গরুর চামড়ার মূল্য যদি ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয় তাহলে সেই অবিচারের বিরুদ্ধে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে বিচার চাওয়া যে কত বড় নির্বুদ্ধিতা, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। গত বছরের কোরবানির চামড়া নিয়ে পশুপতিরা যে কাণ্ড করেছিল তাতে সারা বাংলাদেশে নিন্দা ও অভিশাপের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু এবারের কোরবানিকে কেন্দ্র করে পশুর হাটে এবং পশুর চামড়া নিয়ে যা হলো তা নিয়ে কী নিন্দা করব বা কিভাবে অভিশাপ দেবো তার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না।

লেখখ : সাবেক সংসদ সদস্য

You Might Also Like