আরামদায়ক শহর হিসেবে চাই প্রিয় শহর ঢাকাকে

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ প্রথাগত দরপত্র আহ্বানের পরিবর্তে অনলাইনে ই-টেন্ডারের মাধমে করা হচ্ছে। এটা একটা পজেটিভ দিক সন্দেহ নেই। ফলে দপরত্র নিয়ে স্বজনপ্রীতির আশংকা কমেছে অনেক। এ জন্য কাজকর্মে অনেক স্বচ্ছতা এসেছে

রেজাউল করিম খোকন

রেজাউল করিম খোকন

ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে কি হবে? তেমন অশুভ চিন্তাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও কেন জানি পারিনা। বার বার তাড়া করে ফিরে সেই ভয়ানক পরিস্থিতির কাল্পনিক চিত্র। ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে যত মানুষ মারা যাবে, তার কয়েকগুন বেশি মারা যাবে আগুনে পুড়ে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। ভূমিকম্পের পর গ্যাস লাইনে বিষ্ফোরণ ঘটবে। সেই আগুনে পুড়ে পুড়ে পুরো নগর দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে।

ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের নদী জলাশয়ের পানি নগরে বন্যার সৃষ্টি করবে। উপড়ে পড়া বিদ্যুতের খুটির তারের সংস্পর্শে এসে সেই পানি বিদ্যুতায়িত হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বিধ্বস্ত ঢাকা নগরীতে আক্রান্তদের উদ্ধারের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। উদ্ধারকাজে সাধারণ সময়ে যারা মূল ভূমিকা রাখেন, সেই ফায়ার সার্ভিসের অস্তিত্ব থাকবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। রাজধানী ঢাকা শহরে তেমন আশংকা বুকে চেপে রেখে আমরা দিনরাত পার করছি। দিনে দিনে রাজধানী ঢাকা আয়তন যেভাবে বাড়ছে তেমনি বাড়ছে জনসংখ্যা। বাড়তি মানুষের চাপে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

নানা সংকটে জর্জরিত নগরবাসীর নাভিশ্বাস চরমে উঠছে। যানজট, পানি গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট , মাদকের আগ্রাসন, চুরি ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মশার উপদ্রব প্রভৃতি সমস্যাকে নিত্যসঙ্গী করে বসবাস করছেন সবাই। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন, ছিন্নমুল বস্তিবাসি সবাইকে একধরনের অস্থিরতা, অতৃপ্তি, অশান্তি, অস্তুষ্টি নিয়ে থাকতে হচ্ছে এই শহরে। এতো সমস্যা, সংকট, অস্বস্তি, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তার কথা জানার পরও প্রতিদিনই গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে পা রাখছেন অগনিত নারী পুরুষ। দারিদ্রের কারনেই যে গ্রামের মানুষ শহরমুখী হন তা বলা যায় না এখন। স্বচ্ছলতা থাকার পরও আজকাল অনেকেই গ্রাম কিংবা মফস্বল শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং মানসম্মত জীবন যাপনের আশায় ঢাকায় চলে আসেছেন। গ্রামগুলো আগের চেয়ে অনেকটা উন্নত হলেও সামাজিক কাঠামোতে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন হয়নি।

ভিলেজ পলিটিক্স এখন আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। প্রানহানী ঘটেছে, সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। গ্রামীন সমাজ জীবনে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে শহরে চলে আসছেন, বাসা ভাড়া করে পরিবার পরিজন নিয়ে উঠছেন। আবার সন্তানদের উচ্চতর শিক্ষার ব্যাপারটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে কেউ কেউ শহরমুখী হচ্ছেন। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে গিয়ে রাজধানী ঢাকা বেসামাল একটি নগরীতে পরিণত হয়েছে, একথা সবাই স্বীকার করছেন।

রাজধানী ঢাকাকে একটি সুন্দর উন্নতমানের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন ঢাকা দক্ষিন ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দুই মেয়র। উভয়েই নগরবাসীকে জঞ্জাল, সংকটও সমস্যামুক্ত একটি বাসযোগ্য চমৎকার পরিবেশসমৃদ্ধ নাগরিকজীবন উপহার দিতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁদের দৌঁড়ঝাপ নগরবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বাণিজ্যিক এবং আবাসিক এলাকায় ময়লা আবর্জনা ফেলার হাজার হাজার বিন স্থাপন করা হয়েছে। এরপর কেউ আর যত্রতত্র ময়লা ফেলতে পারবেনা, পরিবেশ নোংরা করতে পারবেন না। করলে জরিমানা গুনতে হবে- তেমন নির্দেশনা জারি করার পরও আমরা দেখছি যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকতে। অনেক জায়গায় স্থাপিত ময়লা আবর্জনা ফেলার বিন চুরি করে নিয়ে গেছে চোর, তেমন ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যা দেখে মনটা দু:খ গøানিতে ভরে গেছে। এই শহরে আমরা যারা বাস করছি, তাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে শহরটিকে সুন্দর আকর্ষনীয় করে তোলার ব্যাপারে। এ শহরকে নিজ বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত ভালোবাসতে হবে। তাহলেই একে পরিচ্ছন্ন, বসবাস উপযোগী সুন্দর নগরীতে পরিণত করা সম্ভব হবে। পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর ঢাকা গড়তে নগরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতাই সফলতার শক্তি।
সমস্যায় জর্জরিত ঢাকার অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি । শহরের অধিকাংশ ফুটপাত দখল করে আছে দোকানপাট। এসব ফুটপাত সড়ক থেকে প্রায় এক ফুট উচু। শুধু তাই নয় যখন তখন যে কেউই তাদের ইচ্ছে মাফিক শহরের ফুটপাতে দোকান তুলছেন, পসরা সাজাচ্ছেন। এই দখল প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়নি। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়েছে সিটি করর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই উচ্ছেদের জায়গাগুলো আবার দখল হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া ফুটপাত পথচারীবান্ধব করা যাবে না। এই শহরে সারি সারি ভবন আর রাস্তাঘাটের বিস্তৃতি ঘটছে, কিছু কিছু এলাকার চাকচিক্য সৌন্দর্য বাড়ছে তবে সেই তুলনায় বস্তির কোনো উন্নয়ন হয়নি। সুযোগ সুবিধাও বাড়েনি। অথচ কর্তৃপক্ষ বস্তি উন্নয়নের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন-দুই সিটি করর্পোরেশনের খেলার মাঠগুলোর বেহাল অবস্থা খুব সহজেই চোখে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মাঠগুলোর নজরদারি করার কেউ নেই। খেলার মাঠে নেই খেলাধুলার পরিবেশ। মূলত দুই সিটি কর্পোরেশনের সুশাসনের অভাবেই এই দুর্দশা।

নগরের গুরুত্বপূর্ন জায়গাগুলোতে বিনামুল্যের ওয়াইফাই সেবার আওতায় আনার ঘোষনা দিলেও এটি বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি কেউই। আসলে যানজট, জলজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষ ওয়াইফাই বিষয়টির দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারছেনা। ঔষধ ছিটানোর পরও ঢাকার মশার উপদ্রব কমেনি। মশার যন্ত্রনা ঢাকা শহরবাসীর জীবনে চরম অস্বস্তি হয়ে আছে এখনও মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হছেন।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ প্রথাগত দরপত্র আহ্বানের পরিবর্তে অনলাইনে ই-টেন্ডারের মাধমে করা হচ্ছে। এটা একটা পজেটিভ দিক সন্দেহ নেই। ফলে দপরত্র নিয়ে স্বজনপ্রীতির আশংকা কমেছে অনেক। এ জন্য কাজকর্মে অনেক স্বচ্ছতা এসেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, কয়েক হাজার অবৈধ বিল বোর্ড উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছে, পুরো নগর জুড়ে প্রায় হাজার হাজার ময়লা আবর্জনা ফেলার বিন বসেছে, সড়কে বসেছে আধুনিক এলইডি বাতি, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় নগরজুড়ে অনেকগুলো গনশৌচাগার নির্মিত হয়েছে এবং এগুলো ঠিকঠাকমত পরিচালিত হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য কয়েকটি ভবন নির্মানের কাজ চলছে, পথে ঘাটে নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত জীবানুমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে বিশেষ ধরনের গাড়ি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে। এই সাফল্য এবং কৃতিত্বের জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয়।

দুই সিটি কর্পোরেশনের কাজ কর্মে আরো গতি আনতে সব কাউন্সিলরকে নিয়ে একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে। তা হলে বড় বড় সমস্যাগুলোকে আর পাহাড় পর্বতের মত মনে হবে না, সহজেই সমাধান করা যাবে।ঢাকা নগরীর বিদ্যমান সমস্যা সংকট, অব্যবস্থা, অনিয়ম ,অসুন্দর দূরীকরনের কাজগুলো রাতারাতি করা সম্ভব নয়। এ জন্য সময় লাগবে । ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রই সাধ্যমত চেষ্টা করছেন। উন্নয়ন কর্মকান্ডগুলোকে এক সুতোয় বাধার অর্থাৎ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহনের ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন। সাধারনত উন্নয়ন কর্মকান্ডগুলো প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে পারে না সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়মূলক কাজকর্মে নিয়োজিত এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আমরা সব সময়েই প্রত্যক্ষ করে আসছি। এটাকে উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কাজকর্মে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটাতে দুই মেয়রই তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং দক্ষতার প্রয়োগ করবেন আশা করি।

এই নগরীকে স্বপ্নের মত সুন্দর, বাসযোগ্য এবং আরামদায়ক করতে প্রত্যেক নগরবাসীর নিজস্ব কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যে যার অবস্থান থেকে সেই দায়িত্বগুলো পালন করে গেলে আমাদের এই প্রিয় শহর কোনোভাবে পিছিয়ে থাকতে পারে না, বিশে^র বাসের অযোগ্য শহরের কিংবা দুর্ভোগের শহরের তালিকায় ঠাঁই পেতে পারে না। দু:স্বপ্নের বোঝা আর অনাগত বিপদের শংকা বুকে বয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি দিন পার করতে চাই না আর। অনেক সম্ভাবনা এবং সুন্দরের হাতছানি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এই প্রিয় রাজধানী ঢাকা শহর দু:স্বপ্ন কিংবা দুর্ভোগের শহর হিসেবে বিবেচিত হোক আমরা কোনভাবেই প্রত্যাশা করিনা। আমরা মনে প্রাণে চাই , ঢাকা শহর একটি চমৎকার বাসযোগ্য স্বস্তিকর জীবনের সুনিবিড় আন্তর্জাতিক মানের আরামদায়ক শহর হিসেবে গন্য হোক বিশ্বজুড়ে ।

রেজাউল করিম খোকন : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *