আইসিজের রায়ের প্রতিক্রিয়া : ৪২ বছর পরে হলেও আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা খুশি হয়েছেন।

 

বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অন্তর্বর্তীকালীন রায় দেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। ওই রায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধ করে তাদের সুরক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রায়ের পর অনেক রোহিঙ্গা ‘শুকরিয়া নামাজ’ আদায় করেছেন।

 

রায় উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। তারা বিভিন্ন দোকানে বসে টেলিভিশনের পর্দায় রায়ের ঘোষণা আর প্রতিক্রিয়া দেখে। অনেকে মোবাইলে রায়ের ব্যাপারে খোঁজখবর নেন বলে জানান উখিয়ার কুতুপালং দুই নাম্বার ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুল কাদের।

 

২ নাম্বার ক্যাম্প ২ ইস্ট এর সভাপতি মোহাম্মদ নূর বলেন, আমার মোবাইলের মাধ্যমে রায়ের খবর নিয়েছি। এ রায়ে আমরা খুব খুশি।

 

উখিয়ার ৪ নাম্বার ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের উপর যে নির্যাতন হয়েছে নিপীড়ন হয়েছে সেই বিষয়টি অন্তত ৪২ বছর পরে হলেও আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।

 

মধুর ছড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা গোলাম সোবহান বলেন, মামলার রায় দেওয়ার পরেও অং সান সু চি মিথ্যা বলে যাচ্ছে। নানাভাবে আমাদের উপর দোষ চাপাতে চেষ্টা করছে।

 

টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুব ভাল ছিল, তাই নেটের মাধ্যমে রায়ের বিষয়টি অবগত হয়েছি, এতেই আমরা খুব খুশি। মিয়ানমারে এখনো মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চলছে। আমরা চাই এই হত্যা বন্ধ হোক।

 

রোহিঙ্গা নেতা নুর মোহাম্মদ বলেন, বিশ্ববাসী আজ জানতে পারল মিয়ানমার অপরাধী। এটা আমাদের প্রাথমিক বিজয়। আমরা চাই এ রায়ের মাধ্যমে বিশ্বনেতারা মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করুক। যাতে আমরা নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে পারি।

 

রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হলো রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। বিশ্ব সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

 

শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার জেলার অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দোজা নয়ন বলেন, রায় ঘোষণায় রোহিঙ্গারা খুশি বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পগুলোতে থাকা কর্মকর্তারা। ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।

 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর স্থানীয় বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন এবং গণহত্যা চালায়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা। উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে এসব রোহিঙ্গা এখনও বসবাস করছে।

 

একাধিকবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বললেও মিয়ানমার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে অভিযোগে গত বছরের ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা দায়ের করে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট এই মুসলিম দেশটি।

 

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের হেগে এর শুনানি হয়। পরের দিন শুনানিতে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের নেত্রী শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চি গণহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং আদালতের এ বিষয়ে শুনানি করার এখতিয়ার নেই বলেও দাবি করেন।

 

তবে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা চলবে বলে জানিয়ে মিয়ানমারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) বলেছেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার দায় কোনোভাবেই মিয়ানমার এড়াতে পারে না।

 

গাম্বিয়ার তথ্য-প্রমাণের বিপরীতে মিয়ানমার যথেষ্ট যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি বলেও অন্তর্বর্তী আদেশে আদালত জানিয়েছেন। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন গণহত্যার শামিল বলে মন্তব্য করে আইসিজে বলেছেন, গাম্বিয়ার দাবি যথাযথ। রোহিঙ্গা গণহত্যার দায় কোনোভাবেই মিয়ানমার এড়াতে পারে না।

 

আইসিজে আরও বলেন, রাখাইনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক বহুবছরের। কিন্তু সেখানে সেনাবাহিনী দ্বারা জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এই অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতের রয়েছে।

 

আদালত যোগ করেন, ২০১৭ সালে রাখাইনে বেসমারিক নিরাপত্তায় ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার। জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। এক রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে। সেই সঙ্গে মামলার বিচার কাজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ আনেন বিচারিক আদালত।

You Might Also Like