এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:০১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

‘৩০০ বছর আমরা যুদ্ধ শুরু করিনি, কিন্তু শেষটা আমাদের হাতেই হবে’— তেহরানের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি

‘৩০০ বছর আমরা যুদ্ধ শুরু করিনি, কিন্তু শেষটা আমাদের হাতেই হবে’— তেহরানের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদ আর অনিশ্চয়তায় ঢাকা, তখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ‘ভুল হিসাব-নিকাশের’ বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, খামেনির শাহাদাতের পর ইরান ভেঙে পড়েনি, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে’র জন্য তারা এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

লারিজানির হুঁশিয়ারি: ‘৬ হাজার বছরের সভ্যতা রক্ষার লড়াই’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) দেওয়া এক বার্তায় আলি লারিজানি ইরানের ঐতিহাসিক অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, "গত ৩০০ বছরে ইরান নিজে থেকে কোনো যুদ্ধের সূচনা করেনি। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কেবল আত্মরক্ষার তাগিদেই অস্ত্র ধরেছে।"

লারিজানি আরও যোগ করেন, "আমরা যেকোনো মূল্যে আমাদের ছয় হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতাকে রক্ষা করব। শত্রুরা যে ভুল হিসাব করেছে, তার জন্য তাদের অচিরেই অনুতপ্ত হতে বাধ্য করা হবে।" লারিজানির এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইরান এই লড়াইকে কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে।

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এখন ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’

সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে লারিজানি বলেন, ট্রাম্প তার ‘ভ্রান্ত কল্পনা’ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। লারিজানির মতে, ট্রাম্পের স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম), কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি একে ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’-এ রূপান্তর করেছেন। ইসরায়েলের ক্ষমতালোভী উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য মার্কিন সেনাদের জীবন উৎসর্গ করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, "এর চড়া মূল্য দিতে হবে মার্কিন সেনা ও তাদের পরিবারকে।"

আরাগচির ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ ও যুদ্ধের শেষ অংক

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করলেও তা কীভাবে এবং কখন শেষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।"

ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়ের প্রসঙ্গ টেনে আরাগচি জানান, ইরান গত দুই দশক ধরে মার্কিন কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করেছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তেহরানে বোমাবর্ষণ হলেও ইরানের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমবে না। কারণ হিসেবে তিনি ইরানের ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ (Mosaic Defense) কৌশলের কথা উল্লেখ করেন। এই বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে প্রতিরোধ জারি রাখা সম্ভব।

আলোচনার পথ বন্ধ: লারিজানির সাফ জবাব

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন— যেখানে দাবি করা হয়েছিল ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান পুনরায় পারমাণবিক আলোচনা শুরু করতে চায়— তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন লারিজানি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেছেন, "আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।" খামেনির হত্যার পর ওয়াশিংটনের সাথে কোনো ধরনের আপোষের সম্ভাবনা যে নেই, এটি তারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

ইরান কি আসলেই দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত?

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানি ও আরাগচির এই বক্তব্যগুলো কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করে:

১. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: ইরান দেখাতে চায় যে তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা চেইন অফ কমান্ড অটুট আছে।

২. ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান মডেল: আরাগচির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইরান সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ‘গেরিলা’ বা ‘অপ্রতিসম’ (Asymmetric) যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করে দিতে চায়।

৩. আঞ্চলিক প্রভাব: ইসরায়েলের স্বার্থে মার্কিন সেনাদের ব্যবহারের যে অভিযোগ লারিজানি তুলেছেন, তা মূলত মার্কিন জনমতকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার একটি কৌশল।

রণক্ষেত্র এখন কোথায়?

ইরান এখন কেবল আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা যুদ্ধের সময় ও পরিণতি নির্ধারণের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে রাখার দাবি করছে। লারিজানির ভাষায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, কিন্তু ইরান প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবা খেলায় পরবর্তী চালটি তেহরান কখন এবং কোথায় দেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ।