এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

হার্ভার্ডের কাছে ট্রাম্পের ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি

হার্ভার্ডের কাছে ট্রাম্পের ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক ও শিক্ষা মহলে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করে সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনের নীতির টানাপোড়েনের মাঝে নতুন করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্ক। সোমবার গভীর রাতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক বিস্ফোরক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তার প্রশাসন এখন বিশ্বখ্যাত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। এর আগে হার্ভার্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, সরকারের সাথে চলমান আইনি ও আর্থিক বিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়টি কিছু ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছে। সেই খবরের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়েই ট্রাম্প সরাসরি এই বিশাল অঙ্কের অর্থদাবি এবং ভবিষ্যতে হার্ভার্ডের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার হুঁশিয়ারি দিলেন।

ট্রাম্প তার বার্তায় অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করে লিখেছেন, "আমরা এখন ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চাইছি এবং ভবিষ্যতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক রাখার ইচ্ছা নেই।" নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে তিনি উল্লেখ করেন যে, হার্ভার্ডের ভেতরকার অনেকেই মনে করছেন শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় আসা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা নেই। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে ক্রমাগত গবেষণার অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা কার্যকর হলে হার্ভার্ড এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে পড়বে। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত ফেডারেল ফান্ডের ওপর ভিত্তি করেই তাদের বিশাল বাজেটের কাঠামো দাঁড় করিয়েছে।

উল্লেখ্য যে, এর আগে সোমবার নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, দীর্ঘ আলোচনার পর ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো হার্ভার্ডের কাছে থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে। কিন্তু ট্রাম্পের রাতের পোস্ট সেই ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়ে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, হার্ভার্ডের সাথে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু কারিগরি বা ভোকেশনাল স্কুল খোলার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সোমবারের পোস্টে ট্রাম্প সেই পরিকল্পনাকে 'জটিল ও অপর্যাপ্ত' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেন, হার্ভার্ড আসলে এই ধরনের অস্পষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ পরিশোধ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। ট্রাম্পের মতে, হার্ভার্ড যে ধরনের 'জঘন্য বেআইনি কর্মকাণ্ড' পরিচালনা করেছে, তাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার খুবই সামান্য, এবং এর পরিমাণ অনেক বেশি হওয়া উচিত। যদিও তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কোন আইন লঙ্ঘনের কথা বলছেন, তা স্পষ্ট করেননি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই হার্ভার্ডসহ বিভিন্ন লিবারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে 'ওক' (woke) মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগ আনা হচ্ছে। পাশাপাশি, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যে ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে, সেখানে ইহুদি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে হার্ভার্ড ব্যর্থ হয়েছে বলেও হোয়াইট হাউস অভিযোগ করে আসছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সরকার কয়েক দফায় আইনি অভিযোগ ও বিশাল অঙ্কের জরিমানা দাবি করেছে। তবে হার্ভার্ডের জন্য সেপ্টেম্বর মাসে একটি বড় আইনি জয় এসেছিল যখন ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ অ্যালিসন বারোজ রায় দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন হার্ভার্ডের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদান স্থগিত করে দিয়ে প্রথম সংশোধনীর (First Amendment) অধিকার এবং ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে। বিচারক বারোজ তার রায়ে সরকারের এই কর্মকাণ্ডকে 'সরকার-চালিত আক্রমণ' হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন যে, এটি ইহুদি বিদ্বেষ দূর করার চেয়ে বরং সরকারি মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা।

এখন ট্রাম্পের এই ১ বিলিয়ন ডলারের নতুন দাবি পুরো পরিস্থিতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে আইনি লড়াই, অন্যদিকে বিশাল আর্থিক জরিমানা—সব মিলিয়ে হার্ভার্ডের প্রশাসনিক কাঠামো এখন খাদের কিনারায়। সমালোচকরা মনে করছেন, এটি আসলে উদারপন্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রশাসনের একটি পরিকল্পিত চাপ সৃষ্টির কৌশল। হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের এই নতুন দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি, তবে পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আমেরিকার এই প্রাচীনতম এবং প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

বিশ্লেষকদের মতে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এই নজিরবিহীন আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, বরং এটি মার্কিন উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে চায়। যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তার আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ফেডারেল অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন সেই নির্ভরশীলতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একাডেমিক স্বাধীনতাকে খর্ব করার এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য এক বিপজ্জনক সংকেত। জজ বারোজের রায়ে যে 'সরকারি গোঁড়ামি' বা 'অরথোডক্সি'র কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা মূলত এই আশঙ্কারই প্রতিফলন যে রাষ্ট্র যখন গবেষণার অর্থায়নকে রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সত্য ও মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। হার্ভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠান যদি ১ বিলিয়ন ডলারের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে, তবে এটি দেশের অন্যান্য ছোট ও কম প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি ভীতিকর নজির তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াই আদালত কক্ষ ছাড়িয়ে আমেরিকার জনমত ও শিক্ষার মূল দর্শনের লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। যদি সমঝোতা না হয় এবং প্রশাসন সত্যিই হার্ভার্ডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন উচ্চশিক্ষার যে শ্রেষ্ঠত্ব ও আবেদন রয়েছে, তা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। এই সংকট নিরসনে আইনি যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষাই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।