এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০২ নভেম্বার ২০২৫, ১১:৪৫ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

স্ত্রীর ধর্মান্তর প্রসঙ্গে ভ্যান্সের মন্তব্যে বিতর্ক

স্ত্রীর ধর্মান্তর প্রসঙ্গে ভ্যান্সের মন্তব্যে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি এক মন্তব্যের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর স্ত্রী উষা ভ্যান্স—যিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও হিন্দু পরিবারে বেড়ে উঠেছেন—একদিন যেন তাঁর মতো ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন, সেই আশা তিনি করেন।

মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দর্শকের প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, “আমি কি চাই যে একদিন আমার স্ত্রীও গির্জায় এসে সেই অনুভূতিতে প্রভাবিত হন, যেমনটা আমি হয়েছিলাম? হ্যাঁ, সত্যি বলতে আমি তা-ই চাই, কারণ আমি খ্রিস্টীয় সুসমাচারে বিশ্বাস করি, এবং চাই আমার স্ত্রীও একদিন সেটিকে একইভাবে উপলব্ধি করুন।”

টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ আয়োজিত, প্রয়াত রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্ককে স্মরণে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে হাজারো শিক্ষার্থীর সামনে তাঁর এই বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই সমালোচনা করেন যে, ভ্যান্স তাঁর স্ত্রীর ধর্মীয় স্বাধীনতাকে যথেষ্ট সম্মান দেখাননি। বিশেষ করে ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের অনেকে বলেন, তাঁর এই মন্তব্য হিন্দুধর্মকে অবমূল্যায়ন করছে—একই সময়ে যখন কঠোর অভিবাসন নীতি ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সুহাগ শুক্লা মন্তব্য করেন, “তিনি আসলে বলছেন—আমার স্ত্রী যেমন আছেন, তা যথেষ্ট নয়।” তাঁর মতে, একজন সাধারণ ধর্মযাজক এমন কথা বললে বিষয়টি হয়তো তেমন গুরুত্ব পেত না, “কিন্তু তিনি দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী—তাঁর কাছ থেকে এটি অন্যরকম বার্তা দেয়।” শুক্লা আরও বলেন, “আমাদের কমিউনিটিতে আগেই অনিশ্চয়তা ছিল, এই মন্তব্য সেই আশঙ্কাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”

সমালোচনার পর ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তাঁর মন্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি তাঁকে অভিযুক্ত করেছিলেন যে, তিনি নাকি স্ত্রীর ধর্মকে ‘অপমান’ করেছেন, ভ্যান্স তাঁকে “ঘৃণ্য ও খ্রিস্টবিরোধী বিদ্বেষে ভরা” বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও লেখেন, উষা তাঁর জীবনের “সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ” এবং তিনিই তাঁকে আবার ধর্মীয় অনুশীলনে ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছেন।

ভ্যান্স বলেন, যদিও তিনি চান তাঁর স্ত্রী একদিন ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করুন, তবুও “তিনি যাই বিশ্বাস করুন না কেন,” তাঁকে সবসময় ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে যাবেন।

ধর্মভিত্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন আকাঙ্ক্ষা বিরল নয়—বিশেষত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যেই একে অপরকে ধর্মান্তরিত করতে উৎসাহিত করার প্রবণতা দেখা যায়। ক্যাথলিক মতবাদ অনুযায়ী, মুক্তির জন্য বাপ্তিস্ম আবশ্যক। ভ্যান্স নিজে একসময় নাস্তিকতার ধাপে ছিলেন, পরে ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন। তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও সেই প্রভাব স্পষ্ট—পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক রক্ষণশীলতা ও জনমুখী অর্থনৈতিক নীতির ওপর তিনি জোর দেন।

অন্যদিকে, উষা ভ্যান্স দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ভারতীয় অভিবাসী দম্পতির ঘরে জন্ম ও বেড়ে ওঠেন। দম্পতির পরিচয় ইয়েল ল’ স্কুলে পড়াশোনার সময়। তাঁরা তিন সন্তানের অভিভাবক এবং প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে, তাদের পরিবারে দুই ধর্মের ঐতিহ্যই স্থান পায়।

এক সাক্ষাৎকারে উষা বলেন, তাঁদের সন্তানরা ক্যাথলিক স্কুলে পড়ে, তবে বাপ্তিস্ম নেওয়া বা না নেওয়া সম্পূর্ণ তাদের নিজের সিদ্ধান্ত। “আমাদের বাড়িতে হিন্দু ধর্মের বই, গল্প ও ভারত সফরের সময় দেখা ধর্মীয় সংস্কৃতি—সবকিছুই তাদের শেখানো হয়,” তিনি বলেন।

তবে এই পারিবারিক প্রসঙ্গ এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন তাৎপর্য নিচ্ছে। ভারতে ইতিহাসগত কারণে ধর্মান্তর বা ধর্মপ্রচার বিষয়ে সংবেদনশীলতা রয়েছে, বিশেষ করে মুসলিম শাসনকাল ও খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবের কারণে।

ভ্যান্সের মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য বাড়ছে। এশীয়-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক আচরণ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘স্টপ এএপিআই হেইট’-এর আগস্ট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে অনলাইনে ঘৃণাচারণ বেড়েছে, বিশেষ করে রাজনীতিবিদ জোহরান মামদানীর মেয়র প্রার্থিতা ও এইচ–১বি ভিসা বিতর্কের সময়।

সম্প্রতি ফ্লোরিডার পাম বে সিটির এক কাউন্সিল সদস্য ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক পোস্ট দেওয়ায় তিরস্কৃত হন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, ভারতীয়রা নাকি “আমাদের অর্থ লুট করতে” যুক্তরাষ্ট্রে আসে। পরে তিনি শহর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেছেন।

ড্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ‘ডেসিস ডিভাইডেড: দ্য পলিটিক্যাল লাইভস অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকানস’-এর লেখক সাংগে মিশ্রা বলেন, “ভ্যান্স হয়তো ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে এমন বলেছেন, কিন্তু অনেকেই তাঁর বক্তব্যকে অভিবাসনবিরোধী, শ্বেত খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ এবং ‘রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’র রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।”

তবে সবাই সমালোচনামুখর নন। সান ডিয়েগোর হিন্দু মন্দির ‘শ্রী মন্দির’-এর চেয়ারম্যান রমি রেড্ডি মূত্যালা, যেখানকার ভক্তদের মধ্যে উষা ভ্যান্সের বাবা–মাও আছেন, বলেন, “তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক, নিজেদের জন্য যা ভালো মনে করেন, তা-ই করতে পারেন। আমি নিজেও আমার সন্তানদের ধর্মান্তরে বাধ্য করব না।”

এই বিতর্কে উষা ভ্যান্স এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি, তবে তাঁর স্বামীর বক্তব্য যে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্ম, রাজনীতি ও অভিবাসন ইস্যুকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে, তাতে কারও সন্দেহ নেই।