যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সিবিএস নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এ উপস্থিত হয়েছেন—যে চ্যানেলের বিরুদ্ধে তিনি কয়েক মাস আগেই ১৬ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ জিতেছিলেন কথিত “প্রতারণামূলক সম্পাদনা” মামলায়।
গত শুক্রবার তার ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো বাসভবনে সিবিএস উপস্থাপক নোরা ও’ডনেল সাক্ষাৎকারটি ধারণ করেন, যা রবিবার সম্প্রচারিত হয়। সেখানে ট্রাম্প সরকারী অচলাবস্থা, অবৈধ অভিবাসীদের ওপর কঠোর অভিযান, পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেন।
ট্রাম্প সাধারণত রক্ষণশীল গণমাধ্যম ফক্স নিউজে নিয়মিত উপস্থিত হলেও সিবিএসের সঙ্গে তার সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাপূর্ণ। ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে তিনি ‘৬০ মিনিটস’-এর একটি সাক্ষাৎকার মাঝপথে ত্যাগ করেন, অভিযোগ করেন যে অনুষ্ঠানটি তার প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে।
সাক্ষাৎকারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঠিক এক বছর পর, যখন ট্রাম্প সিবিএসের মালিক প্যারামাউন্টের বিরুদ্ধে মানসিক ক্ষতির অভিযোগে মামলা করেছিলেন। অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসের সাক্ষাৎকারকে এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল যাতে তা ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে দেখায় এবং তার প্রচারণায় প্রভাব ফেলে।
প্যারামাউন্ট ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে ট্রাম্পের সঙ্গে ১৬ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় পৌঁছে, যা তার পরিকল্পিত প্রেসিডেন্ট লাইব্রেরিতে দান করা হয়। সাংবাদিক সংগঠনগুলো তখন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছিল, এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক নজির। তবে কোম্পানি জানায়, তারা ক্ষমা চাইবে না, বরং বিষয়টি সমাপ্ত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ সময় প্যারামাউন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তার মিত্র ল্যারি এলিসনের স্কাইড্যান্স কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হওয়ার অনুমোদনের জন্যও চেষ্টা করছিল। পরে ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (এফসিসি) সেই একীভূতকরণ অনুমোদন দেয়।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন, চীনের সঙ্গে বৈঠকের পর বিরল ধাতুর সরবরাহ সংকট “সম্পূর্ণভাবে সমাধান” করেছেন। যদিও বেইজিং কেবল পাঁচ ধরনের ধাতুর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিলম্বিত করার ঘোষণা দিয়েছে; আরও সাতটি ধাতুর ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানেন “যদি আক্রমণ চালানো হয় তবে কী ঘটবে”। প্রশ্ন করা হলে তিনি সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি, বরং মন্তব্য করেন, “সময় এলে সবাই জানবে, অন্য পক্ষ বিষয়টি ভালোভাবেই বোঝে।”
ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাওকে সম্প্রতি ক্ষমা করার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, “আমি জানি না তিনি কে।” তিনি দাবি করেন, ঝাওকে পূর্ববর্তী বাইডেন প্রশাসন “রাজনৈতিক কারণে” টার্গেট করেছিল। তবে ঝাও ২০২৩ সালে অর্থপাচারের অভিযোগে দোষ স্বীকার করে চার মাস কারাভোগ করেছিলেন।
একইসঙ্গে ট্রাম্প সরকারের অনুমোদনে তার পরিবারের কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ বিন্যান্সের ব্লকচেইনে নিজস্ব ক্রিপ্টো কয়েন চালু করেছে, যা নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া সাক্ষাৎকারের দীর্ঘতর অংশে ট্রাম্প জানান, তার সরকার ৩৩ বছর পর পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করেছে কারণ “রাশিয়া, চীন এবং পাকিস্তানও তা করছে।” তবে এসব দেশের কেউই সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউস।
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে অস্ত্রবিরতি হয়েছে তা “খুবই স্থিতিশীল।” যদিও যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় ২৩৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “হামাস যদি চুক্তি না মানে, তাদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হবে।”
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানান, দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর “দিন শেষের পথে।” যদিও তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পথে যাচ্ছে না, বরং “আইনের মধ্যে থেকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে।” জাতিসংঘ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
চলমান সরকারী অচলাবস্থার জন্য ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেন। তার দাবি, তারা নতুন বাজেট অনুমোদন করছে না কারণ এতে স্বাস্থ্য বীমার ট্যাক্স ছাড় পুনর্বহাল এবং স্বাস্থ্যখাতে কাটা ব্যয় ফেরানোর দাবি জানাচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি এই শর্তে রাজি নন, যদিও ১.৪ মিলিয়ন সরকারি কর্মচারী এই অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বাণিজ্যিক শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যদি তার সরকারের নীতি বাতিল করে, দেশটি “তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রে পরিণত হবে” বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
অভিবাসীদের ধরপাকড় নিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আইসিই অভিযান এখনো যথেষ্ট নয়।” তার অভিযোগ, “বাইডেন ও ওবামা আমলের উদারপন্থী বিচারকদের কারণে অভিযান সীমিত করতে হচ্ছে।”
সবশেষে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানীকে ট্রাম্প “কমিউনিস্ট” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “যদি মামদানী জয়ী হন, তাহলে নিউইয়র্কে অর্থ সহায়তা দেওয়া কঠিন হবে।”
সূত্র: আলজাজিরা