এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবার ২০২৫, ১০:৫৮ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

শারম আল–শেখে ট্রাম্প প্রশংসায় শাহবাজ, কূটনীতি না কৌশল

শারম আল–শেখে ট্রাম্প প্রশংসায় শাহবাজ, কূটনীতি না কৌশল

মিসরের শারম আল–শেখে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গাজায় যুদ্ধবিরতি, উপত্যকার পুনর্গঠন এবং সংঘাত-পরবর্তী কূটনীতি নিয়ে আয়োজিত ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের প্রভাবশালী নেতারা—মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, ফ্রান্সের এমানুয়েল মাখোঁ, তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানসহ অনেকে। তবে সবার নজর কেড়ে নেন শাহবাজ শরিফ, এক ভিন্ন কারণে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য প্রশংসা।

ভাষণে শাহবাজ ট্রাম্পকে ‘শান্তির মানুষ’ আখ্যা দেন, এমনকি তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের উপযুক্ত বলেও উল্লেখ করেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত ঠেকাতে ট্রাম্পের ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি। উপস্থিত বিশ্বনেতাদের অনেকেই এতে বিস্মিত হন, কেউবা হাস্যরসে প্রতিক্রিয়া জানান।

প্রশংসার কৌশল না কূটনৈতিক ভুল?

সাধারণ কূটনীতির মানদণ্ডে শাহবাজের বক্তব্যকে অনেকেই অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করেছেন। কারণ, এই সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে গাজা সংকটই ছিল মূল বিষয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শাহবাজের এই বক্তব্য হয়তো কোনো তাৎক্ষণিক ভুল নয়, বরং ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণের এক কৌশলও হতে পারে।

ডনের এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় যুক্তরাজ্যের রাজস্ব ও শুল্ক দপ্তর (এইচএমআরসি)-এর কর্মকর্তা ও চ্যাথাম হাউসের সদস্য আহমেদ সাজ্জাদ মালিক লিখেছেন, ট্রাম্পের রাজনীতি মূলত আনুগত্য ও প্রশংসার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই শাহবাজের বক্তব্য লজ্জাজনক নয়, বরং কৌশলগতভাবে সুচিন্তিত পদক্ষেপ হতে পারে।

ট্রাম্পের মনস্তত্ত্বে আঘাত

মনোবিশ্লেষকদের ভাষায়, ট্রাম্পের মতো আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রশংসা একধরনের “নার্সিসিস্টিক রিওয়ার্ড লুপ”—যেখানে প্রশংসা একটি বিনিময়যোগ্য মুদ্রার মতো কাজ করে। শাহবাজ হয়তো পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ তুলে ধরেননি, কিন্তু তিনি ট্রাম্পের ‘শান্তির ভাবমূর্তির’ সঙ্গে পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছেন, যা কিছুটা হলেও কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ এনে দিয়েছে।

অলংকারশাস্ত্রের পরিভাষায় একে বলা যায় “পারলোকিউশনারি মিসফায়ার”—বক্তার উদ্দেশ্য না হলেও বক্তব্যের প্রভাব শ্রোতার ওপর ভিন্নভাবে পড়ে, যা কখনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

কূটনৈতিক ব্যর্থতা নাকি মনস্তাত্ত্বিক সাফল্য

শাহবাজের বক্তব্যে অনেক কূটনীতিক বিস্মিত হলেও, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি হাসিমুখে প্রশংসা গ্রহণ করেন, এমনকি শাহবাজকে প্রশংসাসূচক ভঙ্গিতে ধন্যবাদও জানান। এতে বোঝা যায়, শাহবাজ অন্তত একজন গুরুত্বপূর্ণ শ্রোতার মন জয় করতে পেরেছেন।

এই ঘটনার মাধ্যমে আধুনিক কূটনীতির একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়—এখন নেতাদের ভাষণ কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং একধরনের প্রদর্শন। আজকের যুগে প্রশংসা কখনো দুর্বলতা নয়, বরং আলোচনার কেন্দ্রে আসার হাতিয়ার।

উপসংহার

শারম আল–শেখের সম্মেলনে শাহবাজের বক্তব্য গাজা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি বদলাবে না, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিও পুনর্গঠন করবে না। তবে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন ধারার এক দৃষ্টান্ত—যেখানে তোষামোদ কখনো কৌশল, আর প্রশংসা কখনো শক্তির প্রকাশ।

এ ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি কেবল নীতির নয়, বরং প্রভাব সৃষ্টির খেলাও বটে।

তথ্যসূত্র: ডন