প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবার ২০২৫, ০৬:০৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

শরিয়াহ ভিত্তিক ন্যায় ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার

শরিয়াহ ভিত্তিক ন্যায় ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার

ইতিহাসের গোধূলি থেকে ভেসে আসে সুরা সফের আহ্বান—“তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও।” এই আহ্বান যেন এক অমর ডাক, যা ঈসা ইবনে মরিয়ম তাঁর শিষ্যদের দিয়েছিলেন, আর কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক উম্মতের ঈমানদারকে ছুঁয়ে যায়। বিজয়ের গোপন রহস্য এখানে। আল্লাহর পথে দৃঢ় হও, খালেছ নিয়্যাত রাখো, ন্যায় ও সত্যের জন্য প্রস্তুত হও। তাহলেই সাহায্যের হাত অদৃশ্য আকাশ থেকে নেমে আসে, দুর্বলকে শক্তি দেয়, অল্পকে অগণিতের শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

আজকের মানুষ বিভ্রান্তির আঁধারে ন্যায় ও শান্তির খোঁজে অস্থির। দুনিয়ার সভ্যতা যতই অগ্রসর হোক, অবিচার, বৈষম্য, দুর্নীতি ও অবাধ ভোগবাদ মানুষের অন্তরকে শূন্য করে দিয়েছে। এমন এক সময়ে কুরআনের এই আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শরিয়াহ মানে কেবল বিধানের তালিকা নয়, বরং ন্যায়ের ছায়াতলে মানুষের মর্যাদা, নারীর নিরাপত্তা, অমুসলিম নাগরিকের নিশ্চিন্ত অধিকার এবং দুর্বলদের জন্য শক্তির আশ্রয়। এটি সেই আলোর দিশা, যা খুলাফায়ে রাশেদার সরলতা ও ন্যায়পরায়ণতার হাতে জীবন্ত হয়েছিল, যা সাহাবায়ে কারাম রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে রক্ষা করেছিলেন, যা ইতিহাসের প্রতিটি জুলুমের অন্ধকারে মানুষের মুক্তির পথ দেখিয়েছে।

আজ আবার সেই আহ্বান বাজছে: তুমি কি আল্লাহর সাহায্যকারী হবে? তুমি কি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করবে? যদি হৃদয়ে খালেছ নিয়্যাত থাকে, দৃঢ়তা থাকে, তবে ইতিহাস যেমন সাক্ষী ছিল, তেমনি ভবিষ্যতও সাক্ষী হবে, আল্লাহর সাহায্যকারীরা কখনো একা পড়ে না।

বিস্ময়ের সাথে আহ্বানটি আসছে সুরা সফের শেষ আয়াত থেকে “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও… যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, আমি তাদেরকে শত্রুর মোকাবেলায় শক্তি দিলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো” (৬১:১৪)। এই আয়াত শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, আজকের দায়িত্ববোধেরও মর্মবাণী। ঈসা ইবনে মরিয়ম তাঁর শিষ্যদের যেভাবে আল্লাহর পথে নুসরতি হতে ডাক দিয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবে আজকের বিশ্বাসী মানুষকেও ডাকা হচ্ছে ন্যায়ভিত্তিক শারঈ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় সাহায্যকারী হয়ে দাঁড়াতে। প্রতিজ্ঞা, প্রস্তুতি, খালেছ নিয়্যাত এবং দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে গেলে আল্লাহর সাহায্য অবধারিত। এ আশ্বাস কুরআন বারংবার দিয়েছে। “তোমরা যদি আল্লাহর দীনের সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা স্থির করবেন” (মুহাম্মদ ৪৭:৭)। “যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ নিষেধ করে” (হজ ২২:৪১)। নীতির সারমর্ম স্পষ্ট। ইবাদত, সামাজিক ন্যায় এবং জনকল্যাণ এক সুতোয় গাঁথা।

ইসলামি শরিয়াহর লক্ষ্য কেবল বিধান প্রয়োগ নয়, মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। উসূলবিদ ও ফুকাহা যে “মাকাসিদুশ্ শরিয়াহ” ব্যাখ্যা করেছেন। দীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পদের সংরক্ষণ, এগুলো রাষ্ট্রনীতি ও সমাজব্যবস্থার প্রাণভোমরা। ইমাম আল-গাজালি এই পাঁচটি উদ্দেশ্যকে শরিয়াহর কেন্দ্রভাগে স্থাপন করেন এবং ইমাম আশ-শাতিবি এগুলোকে নীতিগত কাঠামো হিসেবে সুসংহত করেন। তাই শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র মানে অনুদার বা রুক্ষ শাসন নয়, বরং ন্যায়, করুণা, শূরা, দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণের সুসংহত সংবিধানিক রূপ।

কুরআনের ন্যায়নীতির আয়াতগুলো একটি ন্যায্য রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি। “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর জন্য দৃঢ়ভাবে ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষ্য বহনকারী হও… তোমরা ন্যায়বিচার করো” (মায়েদা ৫:৮)। “হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও, তা তোমাদের নিজেদের বিপরীত হলেও” (নিসা ৪:১৩৫)। “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও সদাচরণ করার আদেশ দেন” (নাহল ১৬:৯০)। বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের নৈতিকতা এসেছে, “হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পরকে জানতে পার” (হুজুরাত ৪৯:১৩)। আর ধর্মে জবরদস্তি নেই, “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই” (বাকারা ২:২৫৬)। আন্তর্জাতিক ও প্রতিবেশী নীতিতেও ন্যায় ও সদাচরণ, "দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের ক’রে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নি। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।" (মুমতাহিনা ৬০:৮)।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যে মদীনা সনদ প্রণয়ন করেন তা ছিল প্রাথমিক সংবিধান, যেখানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক “উম্মাহ ওয়াحدة” রাজনৈতিক কাঠামোর নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার নিশ্চয়তা পায়। তাঁর বিদায়ী খুতবায় জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার পবিত্রতাকে অক্ষুণ্ন রাখার বিধান আসে, নারীর অধিকার ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য নির্ধারিত হয়, সুদ-শোষণ ও রক্তের প্রতিশোধের প্রথা বাতিল ঘোষণা করা হয়। হাদিসে জিম্মি বা অমুসলিম নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে, “যে ধিম্মিকে অত্যাচার করে তার মোকাবিলাকারী কিয়ামতের দিন আমি হবো” এ মর্মের বয়ান বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত। “নারীরা পুরুষদের সহচর অংশ” এ কথায় পারস্পরিক সম্মান ও মানবিক সমতার নীতিও প্রতিফলিত।

খুলাফায়ে রাশেদার যুগ হলো এই ন্যায়নীতির গভীরতম প্রয়োগ। আবু বকর রা. ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই বলেন, “আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ নই, কিন্তু আমি তোমাদের ওপর নিয়োজিত। আমি সৎকাজে সাহায্য করো, অসৎকাজে সংশোধন করো। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে থাকলে তোমরা আমার আনুগত্যে থাকবে, অন্যথায় তোমাদের ওপর আমার কোনো আনুগত্য প্রাপ্য নয়।” এটি শাসকের জবাবদিহির ঘোষণা। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে ক্বাজি নিয়োগ করেন এবং ক্ষুধামন্দার বছরে চুরির হদ প্রয়োগ স্থগিত রেখে প্রমাণ করেন যে শরিয়াহ কড়া কাঠামো নয়, বরং প্রেক্ষিত-সংবেদনশীল ন্যায়পরায়ণতা। তিনি বায়তুল মালকে দরিদ্র ও অপারগ মানুষের অধিকারভিত্তিক কল্যাণকোষে রূপ দেন, বৃদ্ধ ইহুদি ভিক্ষুকের জীবিকা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে নির্ধারণ করেন। উসমান রা. কুরআনের রসম সংকলন করে জ্ঞান ও ঐক্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং নগর-পরিকল্পনায় পানীয় জল ও সড়কব্যবস্থা উন্নত করেন। আলী রা. ন্যায়ের প্রশ্নে প্রিয়জন ও শত্রুর মধ্যে কোনো পক্ষপাত দেখাননি, তাঁর মালিক আল-অশতারের প্রতি বিখ্যাত চিঠিতে প্রশাসনের ন্যায়, কর-ব্যবস্থা, দুর্নীতি-নিরোধ, কৃষি ও বাজার তত্ত্বাবধায়নের নীতিসমূহ লিপিবদ্ধ করেন। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, শরিয়াহভিত্তিক শাসন মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা, রিজিক ও ইবাদতের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যবস্থা-সংস্কৃতির নাম।

ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় আল-মাওয়ার্দি “আহকামুস সুলতানিয়্যা”য় রাষ্ট্রপতি, বিচারক, বাজার তত্ত্বাবধায়ক, ফৌজদারি ও দেওয়ানি নীতির কাঠামো বর্ণনা করেন। ইবনু তাইমিয়া “সিয়াসাহ শরইয়্যাহ”য় প্রশাসনিক ক্ষমতা ও শরিয়াহর উদ্দেশ্যকে সমন্বয় করে “মাসলাহা”কে কেন্দ্র করেন। ইবনু খালদুন রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় ‘আসাবিয়্যা’, কর-নীতি, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থার সম্পর্ক উন্মোচন করেন। আধুনিক কালে মাকাসিদের আলোকে আর্থ-সামাজিক অধিকারের আলোচনা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কারাদারিত্ব, শাস্তি ও পুনর্বাসনের প্রশ্নে “ক্ষতি অপসারণ” ও “জনকল্যাণ” নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার ধারাও গড়ে উঠেছে। সমসাময়িক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ন্যায় ও সক্ষমতা সম্পর্কিত আলোচনা, যেমন ন্যায্যতার কাঠামো বা সক্ষমতা-অভিগমন, শরিয়াহর মাকাসিদের সাথে বহু জায়গায় সমান্তরাল। ইসলামি দৃষ্টিতে ন্যায় মানে শুধু সমান বণ্টন নয়, বরং দুর্বলকে শক্তিশালীর সমকক্ষ করে বসানো, যাতে তার অধিকার বাস্তবে ভোগ্য হয়। এ জন্য যাকাত, ওয়াক্‌ফ, ফিতরা, কফ্‌ফারা, ইহসানমূলক সহায়তা এবং বৈধ রাজস্ব ন্যায্যতার টেকসই সেতু।

নারীর অধিকার ও মর্যাদা শরিয়াহর মৌলিক প্রশ্ন। কুরআন বলছে, “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের সহচর, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়” (তওবা ৯:৭১)। ইবাদত ও নৈতিক গৌরবের তালিকায় নারী-পুরুষ সমানভাবে উল্লেখিত, “মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী… আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহান পুরস্কার রেখেছেন” (আহযাব ৩৩:৩৫)। প্রাচীন সমাজে নারী উত্তরাধিকারের অধিকার ছিল বিরল, কুরআন তা নিশ্চিত করেছে ন্যায্য পরিমাপে। বিবাহে পারস্পরিক সন্তুষ্টি, মহর, ভরণপোষণের দায়িত্ব, নির্যাতন-নিষেধ, অপবাদ ও মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন। এসবের মাধ্যমে নারীর মানমর্যাদা রক্ষিত হয়েছে। রাসূল ﷺ ঘরে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন,।কন্যাসন্তান লালনকে জান্নাতের মাধ্যম বলেছেন। বিদায়ী খুতবায় নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। শরিয়াহ রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তা মানে জনসমক্ষে হয়রানি প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার, আশ্রয় ও চিকিৎসা, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি ও মাতৃত্ব-সুরক্ষা, শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ ও মর্যাদার নিশ্চয়তা। বিশ্বনন্দিত যে নীতিগুলো আজ মানবাধিকারের অংশ, ইসলাম চৌদ্দশত বছর আগে সেগুলোর ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে।

অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা শরিয়াহ রাষ্ট্রের অন্যতম গৌরব। মদীনা সনদে তাদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা, সম্পদের নিরাপত্তা, আদালতে সুবিচার, এবং হুমকি এলে সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা, সবই স্বীকৃত। কুরআনের নির্দেশ, “যদি কোনো মুশরিক নিরাপত্তা প্রার্থনা করে, তাকে নিরাপত্তা দাও, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পারে, তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও” (তওবা ৯:৬)। এটি নীতিগত আশ্রয়-ব্যবস্থার প্রাচীনতম নজিরগুলোর একটি। অর্থনৈতিকভাবে জুলুম, কর-অসাম্য বা বৈষম্য শরিয়াহ বিরোধী। কারও ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার খর্ব করা ন্যায়ের পরিপন্থী। আদালতে সাক্ষ্য, চুক্তি, বাণিজ্য, ভাড়া, অংশীদারি সব ক্ষেত্রে আইন সকল নাগরিককে নৈতিকতার অধীন করে।

শাসনে শূরা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার সোনালি ত্রিভুজ। “তারা তাদের কাজ পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করে” (শুরা ৪২:৩৮)। শূরা মানে প্রজ্ঞার সমাবেশ, দল বা গোষ্ঠীর অন্ধ সমর্থন নয়। শূরার প্রক্রিয়ায় আইনি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির সিদ্ধান্ত হয়, সংখ্যালঘু মতের মর্যাদা থাকে, জনসাধারণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করা হয়। জবাবদিহির দিকটি হাদিসে সুস্পষ্ট, “তোমাদের প্রত্যেকেই পালক এবং প্রত্যেকেই তার পালিতদের বিষয়ে দায়িত্বশীল”। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে বাজার-পরিদর্শক পর্যন্ত সবার ওপর দায়বদ্ধতা। বাজারে নকল বা কারসাজি প্রতিরোধে হিসবাহের ব্যবস্থা, ওজন ও মাপের সুবিচার, একচেটিয়া মজুতদারির বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধ, এসব শুধু নীতিকথা নয়, বাস্তব নীতিমালা। উমর রা. বাজারে নিজে পরিদর্শনে যেতেন, খাদ্যসঙ্কটে গুদাম উন্মুক্ত করতেন। এ ধারাকেই আজকের ভাষায় বলা যায় ন্যায়ভিত্তিক রেগুলেশন এবং দায়ী কল্যাণরাষ্ট্র।

ফৌজদারি নীতিতে শরিয়াহর লক্ষ্য প্রতিহিংসা নয়, জীবনের সুরক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ ও পুনর্গঠন। “যে ব্যক্তি প্রাণহানি করে না এমন একজনকে হত্যা করলো, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করলো” (মায়েদা ৫:৩২)। কোনো শাস্তি প্রমাণের কঠোর মানদণ্ড ছাড়া আরোপযোগ্য নয়, সন্দেহ থাকলে শাস্তি পরিহার, এ নীতি ফিকহে প্রতিষ্ঠিত। উমরের আমলে খাদ্য সংকটে চুরির হদ স্থগিতকরণ দেখায় যে পরিস্থিতির অবিচারকে সমাধান না করে ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া ন্যায় নয়। আধুনিক অভিঘাতে এটিকে বলা যায় কনটেক্সট-সেন্সিটিভ জাস্টিস এবং রেস্টোরেটিভ অ্যাপ্রোচের পূর্বসূরি।

অর্থনীতিতে শরিয়াহ সুদ-শোষণের বিকল্প দেয় অংশীদারিত্বভিত্তিক ন্যায়পর বাণিজ্যে- মুশারাকা, মুদারাবা, ইজারা, সালাম, ইস্তিসন, যেখানে ঝুঁকি ও মুনাফা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়। রাজস্বে যাকাত বাধ্যতামূলক সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো, যার ব্যয়ক্ষেত্র কুরআনে নির্দিষ্ট (তওবা ৯:৬০)। ওয়াক্‌ফ জনকল্যাণের দীর্ঘমেয়াদি ইঞ্জিন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয়, সড়ক, আশ্রয়। বায়তুল মাল দরিদ্র, এতিম, পথিক, প্রতিবন্ধী ও অভাবীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান। এসব নীতিকে আধুনিক জাতীয় বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা নেট, পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ ও দায়বদ্ধ এনজিও কাঠামোর সাথে সমন্বয় করা যায়, যদি মাকাসিদের লক্ষ্য সামনে থাকে জনকল্যাণ, ন্যায়, ক্ষতি অপসারণ।

রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কুরআনের ন্যায় ও শান্তির নীতিতে আবদ্ধ। চুক্তি পালন, বিশ্বাসঘাতকতা পরিহার, নির্দোষের প্রাণ রক্ষা, যুদ্ধেও নৈতিক সীমানা বজায় রাখা, এসবই নববী শিক্ষার অনিবার্য অংশ। অত্যাচার প্রত্যাখ্যান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একইসাথে লক্ষ্য। তাই শরিয়াহ রাষ্ট্র প্রতিবেশীদের সাথে ন্যায্য বাণিজ্য, ভিসা ও মানবিক সহযোগিতায় উন্মুক্ত থাকে। তবে জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তায় আপস করে না।

এবার প্রশ্ন: এ রূপরেখা আজ কিভাবে জীবন্ত হবে। কুরআন পরিকল্পনার নৈতিক মানচিত্র দিয়েছে। “আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন আমানত যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো ন্যায়ভাবে বিচার করতে” (নিসা ৪:৫৮)। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ নিয়্যাতের শুদ্ধি।

দ্বিতীয় ধাপ জ্ঞানের ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ, ক্ল্যাসিক ফিকহ ও সমসাময়িক জ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি সব একত্রে। তৃতীয় ধাপ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছ রাজস্ব, ন্যায়ভিত্তিক বাজার-নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা নেট, শিক্ষা-স্বাস্থ্যকে ওয়াক্‌ফ ও বায়তুল মাল দিয়ে শক্ত করা।

চতুর্থ ধাপ জনসম্পৃক্ততা, শূরা, নাগরিক সমাজ, মিডিয়ার নৈতিকতা, তথ্য স্বচ্ছতা। পঞ্চম ধাপ নৈতিক নেতৃত্ব খুলাফায়ে রাশেদার মতো জবাবদিহি, সরলতা ও সেবাধর্মিতা। এসবের কোনোটাই একদিনে নয়, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর নুসরতের প্রতিশ্রুতির আওতায় পড়ে যখন উদ্দেশ্য হয় ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

আহ্বানটি তাই কেবল স্লোগান নয়। এটি চরিত্র গঠনের ডাক। আল্লাহ বলেন, “তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে তোমরাই শ্রেষ্ঠ” (আলে ইমরান ৩:১৩৯)। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে মহল্লা, মহল্লা থেকে জেলা- প্রতিটি স্তরে ইবাদত, সত্যবাদিতা, পরিশ্রম, amanah, প্রতিবেশীর হক আদায়, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা, অমুসলিম প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ, বাজারে প্রতারণা–বিরোধী সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেব্যমূলক ওয়াক্‌ফ- এসবই শরিয়াহ রাষ্ট্রের জীবনরস। মাঠে নামার আগে ভেতরে এই চরিত্র না জন্মালে কেবল কাঠামো বদলালে ফল হয় না। আর যখন চরিত্র ও কাঠামো মিলেমিশে যায়, তখন আল্লাহর সাহায্য আসে যেভাবে এসেছে পূর্বসূরিদের ওপর।

মুমিনগণ, নুসরাতুল্লাহ হও। ঈমানের জ্বালানিতে ন্যায়, করুণা ও জ্ঞানের আলোকযাত্রা শুরু করো। শপথ নাও যে ইসলামি শরিয়াহর মাকাসিদের আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়বো। নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে আইনের শিরোমণি করবো। অমুসলিম নাগরিকের ধর্ম ও সম্পদের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের সুনামের মানদণ্ড করবো। দরিদ্রের হককে রাজস্বের প্রথম অধিকার করবো। বিচারকে ক্ষমতার বাইরে রাখবো। শূরাকে সিদ্ধান্তের প্রাণ করবো। এবং সবকিছুর ওপরে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য করে নিরলস পরিশ্রম করবো। প্রতিজ্ঞা, প্রস্তুতি ও প্রার্থনা একসাথে চলুক: “রব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরান ও সাব্বিত আকদামানা ওনসুরনা আলাল কওমিল কাফিরিন”—“হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের উপর ধৈর্য ঢেলে দাও, আমাদের পদযুগলকে দৃঢ় রাখো এবং আমাদেরকে সাহায্য করো” (বাকারা ২:২৫০)। আল্লাহর সাহায্যকারীরা কখনো একা পড়ে না। ইতিহাসের মতো ভবিষ্যতেও তাদের প্রাপ্য বিজয় আছে, ইনশাআল্লাহ।