ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

লোহিত সাগরে আধিপত্যের লড়াই: কোণঠাসা আমিরাত-ইসরায়েল জোট

লোহিত সাগরে আধিপত্যের লড়াই: কোণঠাসা আমিরাত-ইসরায়েল জোট

লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের সাজানো ছক এখন বড় ধরনের হোঁচট খাচ্ছে। পর্দার আড়ালে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক ও রাজনৈতিক জোট এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক কিছু নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ করে ইয়েমেনে আমিরাতি স্বার্থে সৌদি আরবের সরাসরি আঘাত এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নেপথ্যের কারণ

গত এক দশক ধরে আরব আমিরাত নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের এক শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে জাহির করে আসছে। তবে এই শক্তির পেছনে কাজ করছে ইসরায়েলের সাথে তাদের গভীর সামরিক ও গোয়েন্দা আঁতাত। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, গাজায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে আমিরাত তাদের লোহিত সাগরের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সুদান থেকে শুরু করে লিবিয়া পর্যন্ত দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করে সেখানে নিজেদের অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করার মাধ্যমে এই জোট আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রবেশদ্বারগুলো কবজা করার চেষ্টা করছে।

ইয়েমেনে সৌদি আরবের ‘সারপ্রাইজ’ হামলা

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে আমিরাত সহযোগী হিসেবে থাকলেও, তাদের নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষা রিয়াদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে আমিরাতি অস্ত্রবাহী সামরিক বহরে সৌদি বিমান হামলাটি ছিল সেই উদ্বেগের চরম বহিঃপ্রকাশ। রিয়াদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ইয়েমেনের ভেতরে আমিরাত যদি আলাদা কোনো ‘প্রক্সি’ বাহিনী (যেমন- এসটিসি) গড়ে তুলে একক প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তবে সৌদি আরব তা কঠোরভাবে দমন করবে। বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে আমিরাতি রাজতন্ত্রের জন্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অবমাননা হিসেবে দেখছেন।

সোমালিয়ার প্রতিরোধ ও নতুন অক্ষের উত্থান

লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরায়েল সম্প্রতি ‘সোমালিল্যান্ড’কে স্বীকৃতি দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা মূলত ছিল আমিরাতি পরিকল্পনারই অংশ। এর মাধ্যমে তারা সোমালিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানে বন্দর ও ঘাঁটি স্থাপনের স্বপ্ন দেখছিল। তবে সোমালিয়া সরকার এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে আমিরাতের সাথে সব ধরনের সামরিক চুক্তি বাতিল করেছে এবং তাদের ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি বড় শক্তি— সৌদি আরব, মিসর এবং তুরস্কের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা গড়ে উঠছে। এই দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে, ইসরায়েল ও আমিরাতের এই জোট তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। প্রথমবারের মতো সৌদি ও মিসরীয় নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া সেই নতুন জোটের শক্তিরই মহড়া ছিল।

নেপথ্যের নীলনকশা: ইসলামোফোবিয়া যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার

এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের আড়ালে আরও একটি অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে—বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে—পরিকল্পিতভাবে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি ছড়ানোর কাজ করছে। এটি কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং একটি অত্যন্ত সুসংগত রাজনৈতিক কৌশল।

এই অশুভ অক্ষটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী লবিস্ট এবং সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে যেকোনো মুসলিম জাগরণ বা গণতান্ত্রিক দাবিকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে তকমা দেওয়া সহজ হয়। মূলত নিজেদের রাজতন্ত্র রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবৈধ দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতেই তারা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চেতনাকে বিশ্বদরবারে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত এই অপপ্রচার এখন বিশ্বব্যাপী সচেতন মহলের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে, যা আমিরাতি ও ইসরায়েলি কূটনীতির জন্য এক বড় নৈতিক পরাজয়।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করছে যে, আমিরাত ও ইসরায়েলের এই ‘নিও-কলোনিয়াল’ বা নয়া-উপনিবেশবাদী প্রকল্প এখন পতনের মুখে। সৌদি আরবের হার্ডলাইন অবস্থান এবং তুরস্ক-মিসরের মতো দেশগুলোর সক্রিয়তা এই অঞ্চলে আমিরাতের একচেটিয়া প্রভাবকে খর্ব করে দিয়েছে। লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই লড়াই শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে কোথায় নিয়ে ঠেকায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।