এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৪ নভেম্বার ২০২৫, ০৬:৫১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

রেকর্ড দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান, ট্রাম্পের স্বাক্ষরে পুনরায় খুলল যুক্তরাষ্ট্র সরকার

রেকর্ড দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান, ট্রাম্পের স্বাক্ষরে পুনরায় খুলল যুক্তরাষ্ট্র সরকার

টানা তেতাল্লিশ দিনের অচলাবস্থার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার আবার চালু হয়েছে বুধবার রাতে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাউসে অল্প ব্যবধানে পাস হওয়া ব্যয়বিলটিতে স্বাক্ষর করার পরই শেষ হলো দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি অচলাবস্থা।

“আমার স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই ফেডারেল সরকার এখন থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরবে,” বিল স্বাক্ষরের পর রিপাবলিকান নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন ট্রাম্প।

দিনের শুরুতে প্রতিনিধি পরিষদে ২২২–২০৯ ভোটে বিলটি পাস হয়। আটজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নিজেদের দলের অবস্থান ভেঙে রিপাবলিকানদের সঙ্গে বিলটি অগ্রসর করার পক্ষে ভোট দেন, যা তাদের দলের ভেতরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রায় দুই মাস পর এটি ছিল প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম ভোট, দীর্ঘ ছুটি ও অচলাবস্থার পর।

অচলাবস্থা শেষ হওয়ায় খাদ্য কুপনসহ (SNAP) নানা সহায়তা কর্মসূচি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় চালু হওয়ার কথা, যদিও অন্যান্য দপ্তরের কাজ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

বিল স্বাক্ষরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের দোষারোপ করে বলেন, তারা “চাঁদাবাজির রাজনীতি” করেছে এবং এর ফলে বিমান চলাচলসহ সরকারি কর্মচারীদের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকানই এই অচলাবস্থার জন্য রিপাবলিকানদের দায়ী করছেন।

“মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,” বলেন ট্রাম্প। “আমি শুধু আমেরিকানদের বলতে চাই—আপনারা যেন এই ঘটনাটা ভুলে না যান। আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় মনে রাখবেন কারা দেশের এই ক্ষতি করেছে।”

এই ব্যয়বিলের পক্ষে ছয়জন ডেমোক্র্যাট ও বিপক্ষে মাত্র দুইজন রিপাবলিকান (থমাস ম্যাসি ও গ্রেগ স্টিউবি) ভোট দেন। হোয়াইট হাউস বিলটিকে প্রশংসা করে বলেছে, এতে ডেমোক্র্যাটদের দাবিকৃত কোনো “বিতর্কিত রাজনৈতিক শর্ত” রাখা হয়নি।

অচলাবস্থার মূল বিতর্ক ছিল স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি বাড়ানো নিয়ে, যা বছরের শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলেছিল। রিপাবলিকানরা এ সম্প্রসারণের বিরোধিতা করলেও, ট্রাম্প প্রথমে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়ে পরে তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে দীর্ঘ অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের কথা বিবেচনা করে কয়েকজন সিনেট ডেমোক্র্যাট শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে হাঁটেন।

প্রতিনিধি পরিষদের ছয় ডেমোক্র্যাট যারা সরকারের কার্যক্রম পুনরায় চালুর পক্ষে ভোট দেন, তারা হলেন—ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাডাম গ্রে, ওয়াশিংটনের মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজ, মেইনের জারেড গোল্ডেন, টেক্সাসের হেনরি কুয়েলার, নিউইয়র্কের টম সুয়োজি এবং নর্থ ক্যারোলিনার ডন ডেভিস। এদের প্রত্যেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের প্রতিনিধি।

ওকলাহোমার রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম কোল বলেন, “গত ৪৩ দিনে বাস্তবতা পাল্টায়নি, ভোটের ভারসাম্যও পাল্টায়নি—তবু আমরাই জনগণকে খেসারত দিতে বাধ্য করেছি।”

অন্যদিকে, কিছু সিনেট ডেমোক্র্যাটের অবস্থান পরিবর্তনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ। তিনি বলেন, “অচলাবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন জনগণের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছে—খাদ্য সহায়তা বন্ধের চেষ্টা করেছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন আটকে দিয়েছে। আমরা আমাদের দুর্বলতার কারণে এ নিষ্ঠুরতাকে প্রশ্রয় দিতে পারি না।”

ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস ঘোষণা দেন, তারা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের (ওবামাকেয়ার) কর ছাড় তিন বছরের জন্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন, যদিও এতে রিপাবলিকানদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। “এই লড়াইয়ের দুটি পথ—রিপাবলিকানরা এখনই এই ভর্তুকি বাড়াক, না হলে জনগণ আগামী নির্বাচনে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেবে,” বলেন জেফরিস।

নতুন অনুমোদিত ব্যয়বিলে জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রম চালানোর অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, সামরিক নির্মাণ, ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স ও আইনসভা সংক্রান্ত খাতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনটি পৃথক ব্যয় বিল যুক্ত করা হয়েছে। এতে অচলাবস্থায় ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পুনর্বহাল ও বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এক গোপন ধারা, যা সিনেট নেতারা শেষ মুহূর্তে যুক্ত করেছেন। এতে জানুয়ারি ৬ ক্যাপিটল হামলা তদন্তে যেসব রিপাবলিকান সিনেটরের ফোন রেকর্ড জব্দ হয়েছিল, তারা সরকারকে অন্তত পাঁচ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা করতে পারবেন। এই ধারা নিয়ে দুই দলেরই বিরক্তি রয়েছে, তবে তা বাদ দিলে পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতো বলে আপাতত রেখে দেওয়া হয়েছে।

টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি চিপ রয় বলেন, “এই ধরনের শর্ত কীভাবে বিলের মধ্যে ঢুকে গেল, তা আমার বোধগম্য নয়। এ কারণেই মানুষ রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা হারিয়েছে।”

হাউস স্পিকার মাইক জনসন ঘোষণা দিয়েছেন, এই বিতর্কিত ধারা বাতিলের জন্য নতুন বিল আনা হবে এবং তা দ্রুত ভোটে তোলা হতে পারে আগামী সপ্তাহেই।

তথ্যসূত্রঃ The New York Times