রাশিয়ার সামরিক পরিবহনবাহী একটি বিমান সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অবতরণ করেছে, যা দেশটির প্রতি মস্কোর আগ্রহের নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই বিমানটি রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ও সাবেক ওয়াগনার ভাড়াটে গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
ফ্লাইট রেকর্ড অনুযায়ী, ‘ইলিউশিন আইএল-৭৬’ নামের বিমানটি (নিবন্ধন নম্বর RA-78765) রবিবার কারাকাসে পৌঁছায়। এটি রাশিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে আর্মেনিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, সেনেগাল এবং মৌরিতানিয়া অতিক্রম করে লাতিন আমেরিকায় পৌঁছায়। ধারণা করা হচ্ছে, মস্কো অঞ্চলের কোনো বিমানবন্দর থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল, কারণ টেকঅফের পরপরই এর ট্রান্সপন্ডার সংকেত শনাক্ত করা হয়।
এই দীর্ঘ ও জটিল রুটের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা আকাশসীমা এড়ানো এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কার্গো তল্লাশি থেকে বাঁচা। পাশাপাশি যাত্রাপথে কিছু সরঞ্জাম সরবরাহ বা সংগ্রহও করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি আলজেরিয়ায় রয়েছে; সেনেগালে তাদের শিল্পখাতেও অংশগ্রহণ দেখা যায়, আর মরক্কোর সঙ্গে সম্পর্কও তুলনামূলক ভালো। প্রতিবেশী মালি থেকে মৌরিতানিয়াতেও রুশ ভাড়াটে যোদ্ধাদের দেখা গেছে। পশ্চিম আফ্রিকার রাশিয়াপন্থী দেশগুলোয় বিরতি নেওয়ায় বিমানটি আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার আগে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পেরেছে।
‘আইএল-৭৬’ বিমানটি সর্বোচ্চ ৫০ টন পণ্য বা ২০০ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। এরকম বিমান অতীতে রাশিয়ার হয়ে ছোট অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এমনকি ভাড়াটে যোদ্ধাও পরিবহন করেছে বলে রেকর্ড রয়েছে। তবে বড় মাপের সামরিক সরঞ্জাম, যেমন ‘এস-৪০০’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাতে একাধিক ট্রিপ প্রয়োজন হয়।
এই বিমানের মালিক প্রতিষ্ঠান ‘আভিয়াকন জিটোট্রান্স’-এর বহরে মোট ছয়টি পরিবহন বিমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউক্রেন ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কারণ এটি রুশ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি অতীতে রকেট, ওয়ারহেড ও হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করেছে—বিশেষ করে যেখানে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ সক্রিয় ছিল।
ওয়াগনার গ্রুপ, যা একসময় ইয়েভগেনি প্রিগোঝিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, ছিল প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকাতেও কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে ওই গোষ্ঠীর বিদ্রোহের পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তাদের আফ্রিকান কার্যক্রম এখন ‘রাশিয়ান আফ্রিকা কর্পস’-এর অধীনে চলছে।
সাম্প্রতিক এই রুশ পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা উত্তেজনা। বহু বছর ধরেই মস্কো-সমর্থিত দেশ হিসেবে পরিচিত ভেনেজুয়েলা বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে, কারাকাস সরকার মাদক চোরাচালানে জড়িত। এ অভিযোগে অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক অভিযানও চলছে, এবং সন্দেহভাজন নৌযানে বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র একটি বিমানবাহী রণতরীসহ সম্পূর্ণ স্ট্রাইক গ্রুপ ওই অঞ্চলে মোতায়েন করেছে—যা সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে “যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছে।
তথ্যসূত্র: ডিফেন্স নিউজ (Defense News), বার্লিন