প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বার ২০২৫, ০৫:০৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

রাজনীতি ছিল একটি আদর্শের জায়গা

রাজনীতি ছিল একটি আদর্শের জায়গা

রাজনীতি আজকের দিনে অনেকের চোখে ক্ষমতার খেলা বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনীতি একদিন ছিল ত্যাগ, কৃচ্ছসাধন, সততা ও জনকল্যাণের এক মহান অঙ্গন। উপমহাদেশের বহু নেতা তাঁদের জীবনযাপন ও কর্মকাণ্ডে প্রমাণ করেছেন। রাজনীতি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আয়ের পথ নয়, বরং জনগণের কল্যাণে আত্মোৎসর্গের নাম।

মহাত্মা গান্ধি (১৮৬৯–১৯৪৮) এর এক অনন্য উদাহরণ। আইনপেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি রাজনীতি থেকে কখনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেননি। Unto This Last পড়ার পর তিনি খদ্দর কাটা ও চর্কাকে আত্মনির্ভরতার প্রতীক বানালেন। আশ্রমে তাঁর জীবন ছিল সন্ন্যাসীর মতো সরল, যেখানে তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানেই কৃচ্ছসাধন ও আত্মসংযম।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (১৯০৪–১৯৬৬) প্রধানমন্ত্রিত্বে থেকেও আর্থিক সততার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাখেন। ১৯৫৬ সালে রেল দুর্ঘটনার পর তিনি নৈতিক দায় স্বীকার করে রেলমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথম নৈতিক পদত্যাগ। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটি সাধারণ ফিয়াট গাড়ি কেনার জন্য তিনি পাঁচ হাজার রুপির ব্যাংক ঋণ নেন; আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সেই ঋণ পারিবারিক পেনশন থেকে শোধ করেন।

খান আব্দুল গফফার খান (১৮৯০–১৯৮৮), যিনি “ফ্রন্টিয়ার গান্ধি” নামে পরিচিত, অহিংস সংগ্রামের ধারায় পাশতুন্ন জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর খুদাই খিদমতগার সংগঠনের সদস্যরা শপথ নিয়েছিল। তাঁরা বিলাসী জীবন ত্যাগ করে কৃচ্ছসাধনের জীবনযাপন করবেন।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮–১৯৫৮) ছিলেন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী এবং নৈতিক রাজনীতির এক অনন্য প্রতীক। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে আজীবন নির্যাতিত হয়েছেন, তবুও তাঁর জীবনযাপন ছিল সরল। শিক্ষানীতি ও বিভাজন বিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে তিনি জনসেবাকে রাজনীতির মূল কেন্দ্রে রেখেছিলেন।

বাংলার রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানী (১৮৮০–১৯৭৬) ছিলেন কৃচ্ছসাধনের প্রতীক। তাঁর সারা জীবন কাটে কৃষক–শ্রমিকের অধিকার রক্ষায়। ব্যক্তিগত আরাম আয়েশ থেকে তিনি দূরে ছিলেন। তাঁকে বলা হতো “মজলুম জননেতা”। এমন নেতা, যিনি ক্ষমতার ভোগে নয়, বরং জনগণের কষ্টে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক (১৮৭৩–১৯৬২) কৃষকের স্বার্থকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি বাংলার দরিদ্র কৃষকদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন উদার, নীতিবান এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের উর্ধ্বে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৩৬–১৯৮১) সৈনিক জীবনের মতো রাষ্ট্রপতিত্বেও শৃঙ্খলা ও কৃচ্ছসাধনের প্রতীক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েও সরল জীবনযাপন বজায় রাখেন। নিরাপত্তার চাপে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশতেন, নিজের ব্যক্তিগত বিলাসিতাকে কখনো রাজনৈতিক জীবনে স্থান দেননি। তাঁর কর্মসূচিগুলো ছিল আত্মনির্ভরতা ও গ্রামীণ উন্নয়নকেন্দ্রিক। গবেষণায় দেখা যায়, তাঁর প্রশাসনিক সংস্কারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন ছিল।

নেপালের বিপি কৈরালা (১৯১৪–১৯৮২) বহু বছর কারাবন্দি থেকেও ন্যায়ের নীতি আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর লেখনী ও স্মৃতিকথায় দেখা যায়, রাজনীতি তিনি দেখেছিলেন “ভাল মানুষ হওয়ার এক প্রশিক্ষণশালা” হিসেবে। ক্ষমতায় থাকাকালীনও তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত বিলাসিতার কোনো স্থান দেননি।

শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ডাডলি সেনানায়েকে (১৯০২–১৯৭৩) সাধারণ জীবনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ক্ষমতার উচ্চস্থানে থেকেও তিনি নিজে ছোট গাড়ি চালাতেন এবং ব্যক্তিগত জাঁকজমক থেকে দূরে থাকতেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ (১৮৭৬–১৯৪৮) ছিলেন সততা ও আইনের শাসনে আপসহীন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর নির্দিষ্ট আয়ের পথ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কখনো অর্থোপার্জনের সঙ্গে যুক্ত করেননি।

এসব উদাহরণ আমাদের সামনে এক অনন্য শিক্ষা রাখে। রাজনীতি যদি আয়ের পথ হয়ে দাঁড়ায়, তবে দুর্নীতি ও স্বার্থপরতা সমাজকে গ্রাস করে। কিন্তু রাজনীতি যদি জনকল্যাণ ও আত্মসংযমের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার আসন হয়। দল বা সংগঠন কোনো কর্মীকে পূর্ণকালীন কাজে নিয়োজিত করলে তার জন্য ন্যূনতম ভাতা রাখা যেতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মীর জীবনযাপন হবে কৃচ্ছসাধনের, বিলাসিতার নয়। আজকের সময়ের রাজনৈতিক সংকটের মূল সমাধান এখানেই নিহিত। রাজনীতি আবারও হতে হবে আদর্শের জায়গা, যেখানে ক্ষমতা নয়, বরং সেবাই সর্বোচ্চ ব্রত।