মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী মোড় নিয়ে ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের দ্বিতীয় দিনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি (IRIB) এবং আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম ও ফার্স নিউজ এই মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছে। খামেনির মৃত্যুতে দেশটিতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সাতদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
খামেনির প্রাসাদ ধূলিসাৎ, নিহত শীর্ষ কর্মকর্তারা
রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার ভোরে হামলার শুরুতে খামেনি তেহরানের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত গোপন বাংকারে তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খামেনির সুউচ্চ প্রাসাদটি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং স্থাপনাটির চারপাশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মাটির গভীরে থাকা সুরক্ষিত কক্ষও ধ্বংস করতে সক্ষম এমন শক্তিশালী ‘বাংকার-বাস্টার’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, হামলায় খামেনির কন্যা, জামাতা, নাতি এবং একজন পুত্রবধূ নিহত হয়েছেন। এছাড়াও ইরানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌর সহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
ট্রাম্পের হুমকি ও ‘লায়ন’স রোর’ অভিযান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় সরাসরি এই অভিযানে মার্কিন সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বলেছেন, “ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা। আত্মসমর্পণ করুন, নইলে মৃত্যু নিশ্চিত।” ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে ইরানে সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অভিযানের কোডনেম দিয়েছেন ‘লায়ন’স রোর’ (সিংহের গর্জন), অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী একে ‘এপিক ফিউরি’ নামে অভিহিত করেছে।
হামলায় ৮৬ শিশুর মৃত্যু: আইআরজিসি’র প্রতিশোধের ঘোষণা
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হরমোজগানের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। দিনের আলোতে স্কুল চলাকালীন এই হামলায় এখন পর্যন্ত ৮৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আল জাজিরা।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক পাল্টা অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, “কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অধিকৃত অঞ্চল ও আমেরিকান সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালানো হবে।”
কে ধরবে ইরানের হাল?
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের কার্যনির্বাহী নেতৃত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও খামেনি মৃত্যুর আগে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানিকে দেশ পরিচালনার বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, তবুও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’-এর (Assembly of Experts)।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি আগে থেকেই সম্ভাব্য তিনজনের একটি নামের তালিকা তৈরি করে রেখেছিলেন:
১. বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই
২. খামেনির দপ্তরপ্রধান আলি আসগর হেজাজি
৩. সংস্কারপন্থি নেতা হাসান খোমেনি
তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি-র ভূমিকা এই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
নেপথ্যে ইসরায়েল-সৌদি অক্ষ: নতুন মেরুকরণ
ওয়াশিংটন পোস্ট এবং রয়টার্সের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের চাপ। সৌদি যুবরাজ প্রকাশ্যে হামলার বিরোধিতা করলেও, ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। প্রতিবেদনে সৌদি-ইসরায়েলকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের অস্বাভাবিক মার্কিন মিত্র জুটি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ট্রাম্পকে খামেনিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য অভিযানে উদ্বুদ্ধ করেছে।