যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ব রাজনীতির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্র ডিক চেনি মারা গেছেন। সোমবার ৮৪ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘদিনের হৃদযন্ত্র-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়।
চেনি ছিলেন এমন এক রাজনীতিবিদ যিনি জনপ্রিয়তা নিয়ে খুব কমই চিন্তা করতেন। ২০১৩ সালের একটি তথ্যচিত্রে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—যদি ভালোবাসা পেতে চাও, তবে সিনেমা তারকা হও, রাজনীতিবিদ নয়। কিন্তু এই মনোভাবই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাবান ভাইস প্রেসিডেন্টে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর বৈশ্বিক রাজনীতির মোড় ঘোরানো “ওয়ার অন টেরর” নীতির পেছনে ছিল তারই মূল ভূমিকা।
ইরাক ও আফগানিস্তান অভিযানের সময় চেনির অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। ইরাকে হামলার ভিত্তি হিসেবে দেওয়া গোপন অস্ত্রের (WMD) তথ্য পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলে বিশ্বের বহু দেশে তার নাম ঘিরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। তবুও তিনি প্রায় সব সিদ্ধান্তের পক্ষে জীবনভর অটল থেকেছেন। গুয়ানতানামো বে ও সিআইএ–র গোপন আটককেন্দ্রে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে তদন্তে তীব্র নিন্দা আসার পরও তিনি বলেন—একই পরিস্থিতি হলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
চেনির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ওয়াইওমিংয়ের ক্যাসপার শহর থেকে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর স্থায়ী হতে না পেরে তিনি নানা খণ্ডকালীন কাজ করেন এবং দুইবার মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে ধরা পড়েন। পরে আবার পড়াশোনায় ফিরে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করেন এবং সেখান থেকেই ওয়াশিংটনের অঙ্গনে ঢুকে পড়েন।
ডোনাল্ড রামসফেল্ড তার রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। দু’জনে মিলে রিপাবলিকান প্রশাসনে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী জুটি হিসেবে পরিচিত হন। ১৯৭৫ সালে চেনি জেরাল্ড ফোর্ডের প্রেসিডেন্ট প্রশাসনে হোয়াইট হাউসের চিফ অফ স্টাফ হন—এটি তখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বয়সে কারও হাতে যাওয়া দায়িত্ব ছিল। কংগ্রেসে তিনি পরবর্তীতে রক্ষণশীল নীতির ধারাবাহিক সমর্থক হয়ে ওঠেন।
তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি কিছু বিষয়ে দলের প্রচলিত অবস্থান থেকে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার ছোট মেয়ে ম্যারি সমকামী হওয়ায় তিনি সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সময় তিনি প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। পানামা এবং উপসাগরীয় যুদ্ধে তিনি অপেক্ষাকৃত সংযত ও সতর্ক ভূমিকার জন্য প্রশংসিত হন। কিন্তু ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর চেনি এক নতুন আগ্রাসী নীতি-কৌশলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আফগানিস্তান ও ইরাকে আক্রমণ, পোস্ট-সদাম প্রশাসন গঠনের দুর্বল পরিকল্পনা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে।
চেনি ১৯৯৫ সালে হলিবার্টন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হন, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে বেসরকারি সামরিক ঠিকাদারিত্ব বিস্তারে তার বড় ভূমিকা ছিল বলে গবেষকদের মত। যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি কোম্পানির উত্থান পরবর্তীকালে নানা নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
২০০৬ সালে শিকার করতে গিয়ে তিনি ভুলবশত তার বন্ধু আইনজীবী হ্যারি হুইটিংটনকে গুলি করলে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
ডিক চেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বিতর্কের কেন্দ্রে। কেউ তাকে জাতীয় নিরাপত্তার কঠোর রক্ষক মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন তার সিদ্ধান্তগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার কারণ হয়েছে। তবুও তিনি আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসে এমন একটি নাম, যাকে এড়িয়ে আলোচনা করা প্রায় অসম্ভব।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা