এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মিনিয়াপোলিসে রাজনৈতিক ভূমিকম্প: রিপাবলিকান প্রার্থীর নাটকীয় সরে দাঁড়ানো

মিনিয়াপোলিসে রাজনৈতিক ভূমিকম্প: রিপাবলিকান প্রার্থীর নাটকীয় সরে দাঁড়ানো

যুক্তরাষ্ট্রের মিনসোটা স্টেট এর রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দশকে এমন তীব্র ও নাটকীয় মোড় আর দেখা যায়নি। মিনিয়াপোলিসের সুপরিচিত আইনজীবী ক্রিস ম্যাডেল সোমবার যখন ঘোষণা করেন যে তিনি রিপাবলিকান দল থেকে নিজের গভর্নর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছেন, তখন সেটি কেবল একটি নির্বাচনী প্রচারণার সমাপ্তি ছিল না, বরং তা ছিল একটি আদর্শিক বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। মিনসোটা স্টেট এর রাজনীতিতে এই ঘটনাটি একটি বিশাল রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে যখন ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত অভিযানে দ্বিতীয় এক মার্কিন নাগরিক ও বিক্ষোভকারী প্রাণ হারালেন, তখন ম্যাডেলের এই সরে দাঁড়ানো জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্রিস ম্যাডেল তার এক ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং কঠোর ভাষায় জানান যে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক দলের অংশ হতে পারেন না যারা নিজের স্টেট এর নাগরিকদের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণকে সমর্থন করে। ম্যাডেল একজন আইন বিশেষজ্ঞ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমান প্রশাসনের ফেডারেল অপারেশন মেট্রো সার্জ যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকারকে বিপন্ন করছে, তা তিনি মেনে নিতে পারেননি।

ম্যাডেলের এই রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। একজন রাজনৈতিক বহিরাগত হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব দ্রুত জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মিনিয়াপোলিসের পুলিশ অফিসার্স ফেডারেশন তাকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিল, যা একজন রিপাবলিকান প্রার্থীর জন্য মিনসোটার মতো স্টেট এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ম্যাডেল নিজেকে একজন কঠোর প্রশাসক এবং সংবিধানের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তবে ভাগ্যের পরিহাস এই যে, তিনি চলতি মাসে জোনাথন রস নামক এক আইসিই এজেন্টের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন, যার বিরুদ্ধে ৩৭ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ নারী রিনি গুডকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ছিল। এই ঘটনাটি ম্যাডেলকে পেশাগত ও নৈতিকভাবে এক কঠিন দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। রিনি গুডকে যখন তার গাড়ির ভেতর গুলি করা হয়েছিল, তখন প্রশাসন থেকে দাবি করা হয়েছিল যে তিনি এজেন্টদের ওপর হামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে তিনি কেবল গাড়ি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মিনিয়াপোলিস ভিএ মেডিকেল সেন্টারের আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেটির মৃত্যু পুরো পরিস্থিতিকে আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত করে তোলে।

অ্যালেক্স প্রেটি ছিলেন একজন সেবামূলক পেশাজীবী এবং তিনি ফেডারেল এজেন্টদের বিতর্কিত অভিবাসন বিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন। ভিডিও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, তাকে গুলি করার ঠিক আগে একজন ফেডারেল অফিসার তার কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র সরিয়ে নেন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সশস্ত্র হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ বলছে অন্য কথা। প্রেটির এই মৃত্যু মিনিয়াপোলিসের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, তা ম্যাডেলকে তার রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। তিনি তার বিবৃতিতে সরাসরি অপারেশন মেট্রো সার্জ এর সমালোচনা করে বলেন যে এই অভিযান এখন কেবল অপরাধ দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। ম্যাডেলের মতে, মার্কিন নাগরিকদের বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের কেবল গায়ের রঙের কারণে হেনস্তা করা হচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র দাবি করা হচ্ছে। তিনি এই সংস্কৃতিকে আমেরিকান মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং অমানবিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতির প্রভাব কেবল রিপাবলিকান শিবিরেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ডেমোক্র্যাটদের মাঝেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমান গভর্নর টিম ওয়ালজ তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হওয়ার পর আগেই পুনর্নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই শূন্যস্থানে এখন সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ক্লোবুচার মিনসোটা স্টেট থেকে আইসিই এবং ফেডারেল কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যে লিসা ডেমুথ এখনো তার অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং তিনি মনে করেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্ত নীতি মিনসোটার জন্য সুরক্ষা বয়ে আনবে। কিন্তু ম্যাডেলের এই বিদায় এবং তার করা অভিযোগগুলো লিসা ডেমুথের মতো প্রার্থীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ম্যাডেল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জাতীয় রিপাবলিকানদের বর্তমান উগ্র অবস্থান মিনসোটার মতো স্টেট গুলোতে দলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে। ২০০৬ সালের পর থেকে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী মিনসোটা স্টেট এ জয়ী হতে না পারার কারণ হিসেবে তিনি দলের এই জনবিচ্ছিন্ন নীতিগুলোকেই দায়ী করেছেন।

ম্যাডেলের এই নাটকীয় প্রস্থানের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে অপারেশন মেট্রো সার্জ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে। হোয়াইট হাউস এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দাবি করছে যে তারা কেবল আইন প্রয়োগ করছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে এখন ক্রিস্টি নোয়েমের অভিশংসন দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। ১২০ জন প্রতিনিধি এখন সরাসরি নোয়েমের পদত্যাগ বা অপসারণ চাচ্ছেন। মিনসোটার রাজপথে এখন স্লোগান উঠছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে এবং ফেডারেল আগ্রাসনের বিপক্ষে। সাধারণ মানুষের ঘরে বিনা পরোয়ানায় ঢুকে পড়া এবং গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় গুলি চালানোর ঘটনাগুলো কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে না বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ক্রিস ম্যাডেল তার ভিডিও বার্তার শেষে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছেন যে তিনি তার সন্তানদের সামনে অপরাধী হয়ে থাকতে চান না। তিনি প্রমাণ করতে চান যে রাজনীতির চেয়েও মানুষের জীবন এবং সত্য অনেক বড়। মিনিয়াপোলিসের এই রাজনৈতিক ভূমিকম্প কেবল একজন প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আদর্শিক সংকটের প্রতীকী রূপ।

ক্রিস ম্যাডেলের এই সাহসী সিদ্ধান্তটি মূলত মার্কিন স্টেট পলিটিক্স এবং ফেডারেল পাওয়ারের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, তার একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে যখন নাগরিক অধিকার খর্ব করা হয়, তখন ম্যাডেলের মতো কট্টরপন্থীরাও যে বিদ্রোহ করতে পারেন, তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। অপারেশন মেট্রো সার্জ এর মাধ্যমে সরকার যে কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছিল, তা হিতে বিপরীত হয়ে জনরোষে পরিণত হয়েছে। মিনসোটা স্টেট এর ভোটাররা এখন নিরাপত্তার চেয়ে মানবিক মর্যাদা এবং আইনি স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ম্যাডেলের বিদায় রিপাবলিকান দলকে মিনসোটাতে আরও দুর্বল করে দিতে পারে, তবে এটি নাগরিক অধিকারের আন্দোলনে একটি শক্তিশালী নৈতিক সমর্থন যোগাল। আগামী দিনে এই স্টেট এর নির্বাচনী ফলাফল নির্ভর করবে কোন দল জনগণের এই ক্ষোভকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে এবং ফেডারেল আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে পারে তার ওপর।