এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৭ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মার্কিন শুল্ক নীতির ঘনঘন পরিবর্তনে সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি

মার্কিন শুল্ক নীতির ঘনঘন পরিবর্তনে সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সাম্প্রতিক শুল্ক নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক চরম অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আমদানি শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে এক প্রকার ‘অর্থনৈতিক চাবুক’ বা ‘হুইপল্যাশ’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে পূর্ববর্তী শুল্ক ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণার পরই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী এবং সরকারগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

শুল্ক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও আকস্মিক পরিবর্তন

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রশাসনের পূর্ববর্তী ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করে। আদালতের মতে, জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে এই শুল্ক আরোপ করা ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার। এই রায়ের পর প্রশাসন পিছু হটার বদলে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শুক্রবার ১০ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও, শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।

এই নতুন শুল্ক নীতিটি মার্কিন আইনের ১২২ ধারার অধীনে কার্যকর করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। তবে এই শুল্ক ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনিশ্চিত।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ায় মিশ্র চিত্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে অধিকাংশেরই অবস্থান এখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ (Wait and Watch) নীতিতে।

ভারত: ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির আবার কিছুটা উদ্বেগের। ভারতের সাথে মার্কিন প্রশাসনের একটি সম্ভাব্য চুক্তি ছিল যেখানে শুল্কের হার ১৮ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। এখন বৈশ্বিক হার ১৫ শতাংশ হওয়ায় ভারত তাত্ত্বিকভাবে লাভবান হতে পারে। তবে ভারতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আগে এই অস্থিরতা আলোচনার গতি কমিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া: এই দুই দেশ ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ শুল্কের বিনিময়ে চুক্তি করেছিল। নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা এখন যুক্তরাজ্যের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রাজিল: মজার ব্যাপার হলো, ব্রাজিল এই পরিস্থিতিতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির ওপর আগে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের খড়্গ ছিল, যা এখন সাময়িকভাবে ১৫ শতাংশে নেমে আসবে।

চীন: চীন বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রশাসনের এই খামখেয়ালি আচরণ চীনকে বিশ্বের কাছে আরও ‘নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। ইতোমধ্যে চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শুল্ক কমিয়ে এবং ভিসা নীতি শিথিল করে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও আইনি লড়াই

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা কেবল বাণিজ্যে নয়, বরং মার্কিন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের সংকটেরও প্রতিফলন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, পূর্ববর্তী বেআইনি শুল্কের অধীনে আদায় করা প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার দাবিতে এক হাজারেরও বেশি কোম্পানি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হবে, যা মার্কিন অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

এই শুল্ক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মার্কিন ভোক্তারা। হিসেব অনুযায়ী, উচ্চ শুল্কের কারণে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে বছরে গড়ে অতিরিক্ত ১,৭০০ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় মানুষ এখন কম দামী বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া, শুল্কের এই অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক উৎপাদনে।

আগামী ১৫০ দিন: কোন দিকে যাচ্ছে বিশ্ব?

আগামী ১৫০ দিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২২ ধারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মার্কিন প্রশাসন সম্ভবত ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ (২৩২ ধারা) বা ‘অন্যায্য বাণিজ্য নীতি’ (৩০১ ধারা) এর মতো অন্যান্য আইনি অজুহাত ব্যবহার করে এই শুল্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং অটোমোবাইল খাতের ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে যে তারা আর ‘সরল’ হয়ে বসে থাকবে না। প্রয়োজনে তারাও পাল্টা ব্যবস্থা (Retaliation) গ্রহণ করবে। তবে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব এই পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিশেষে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের এই অননুমেয় বাণিজ্যিক আচরণ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনের শাসন এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ না করা হচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্ব বাণিজ্যের এই টালমাটাল অবস্থা কাটার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।