এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

মার্কিন গণতন্ত্রে ট্রাম্প-সংশয়: সংকটে নির্বাচনী ব্যবস্থা

মার্কিন গণতন্ত্রে ট্রাম্প-সংশয়: সংকটে নির্বাচনী ব্যবস্থা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থা। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু পরিকল্পনা ও মন্তব্য মার্কিন গণতন্ত্রের চিরাচরিত কাঠামোকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি ডেস্ক থেকে পাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জনমত জরিপে এটি এখন স্পষ্ট যে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আর আগের মতো ভরসা রাখতে পারছেন না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, তিনি দেশের সংবিধানের প্রচলিত ধারাকে উপেক্ষা করে প্রায় ১৫টি স্টেটের নির্বাচনী কার্যক্রম কেন্দ্রীয় সরকার বা রিপাবলিকান পার্টির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দীর্ঘকালীন ঐতিহ্যকে একটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি মোটেও শ্রদ্ধাশীল নন। বিপরীতে মাত্র ৪৩ শতাংশ মানুষ তার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট' বা নিরপেক্ষ ভোটারদের অবস্থান। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিরপেক্ষ ভোটারই মনে করেন যে ট্রাম্প নির্বাচন নিয়ে সঠিক পথে চলছেন না। এই আস্থাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে তার ক্রমাগত ভিত্তিহীন দাবি ও অভিযোগ। তিনি বারবার দাবি করে আসছেন যে ডেট্রয়েট, পেনসিলভানিয়া, ফিলাডেলফিয়া এবং আটলান্টার মতো জায়গাগুলোতে "ঘোরতর দুর্নীতি" হয়েছে। এই কথিত দুর্নীতি রোধের অজুহাতে তিনি এখন ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারকে বিভিন্ন স্টেটের নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ট্রাম্প প্রথমে একটি পডকাস্টে এই বিষয়ে তার পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং পরবর্তীতে ওভাল অফিসে বসেও তার অবস্থানে অনড় থাকেন। তার মতে, যদি কোনো স্টেট সঠিকভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে কংগ্রেস সদস্যদের হস্তক্ষেপ করা উচিত। হোয়াইট হাউসের নীতি-নির্ধারকরা প্রথমে ট্রাম্পের এই চরম মন্তব্যকে 'SAVE Act' নামক একটি প্রতিষ্ঠিত আইনের সাথে মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, ট্রাম্প নিজেই তা নাকচ করে দেন। তিনি সরাসরি "Nationalize the voting" বা নির্বাচনকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে সওয়াল করছেন। এর ফলে বিভিন্ন স্টেটের নিজস্ব ক্ষমতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মার্কিন সংবিধানের 'States' Rights' বা স্টেটগুলোর অধিকারের সরাসরি পরিপন্থী।

এরই মধ্যে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে এফবিআই-এর একটি অভিযান বা রেইড নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালের ব্যালটের ওপর এই অভিযানের ফলে "Chain of Custody" বা ব্যালটের নিরাপত্তার ধারাবাহিক শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে বলে দাবি করছেন আইনজীবীরা। এর ফলে ব্যালট পেপারগুলো পরিবর্তন বা ম্যানিপুলেট করার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফুলটন কাউন্টির কমিশন প্রধান রব পিটস জানিয়েছেন, যতক্ষণ এই ব্যালটগুলো তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল, ততক্ষণ তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারতেন, কিন্তু বর্তমানে সেই নিশ্চয়তা দেওয়া আর সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো মূলত ২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর গভীর অবিশ্বাস তৈরি করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই 'জাতীয়করণ' বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা মার্কিন গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল হুমকি। মার্কিন নাগরিকরা ঐতিহাসিকভাবেই স্থানীয় বা স্টেট পর্যায়ের সরকারের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। জরিপের তথ্য বলছে, ৬৯ শতাংশ মানুষ তাদের স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করা হচ্ছে। রিপাবলিকান পার্টির আদি আদর্শ যেখানে ছিল স্টেটগুলোর অধিকার রক্ষা করা, সেখানে ট্রাম্প এখন সেই অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছেন। ফুলটন কাউন্টিতে এফবিআই রেইড এবং ব্যালটের নিরাপত্তার চেইন ভাঙার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৬৪টি আদালতে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের এই ক্রমাগত অভিযোগ এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে সাধারণ ভোটাররা পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে দাঙ্গা বা চরম অস্থিতিশীলতা তৈরির এক ভয়াবহ আশঙ্কা রয়ে গেছে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ নির্বাচন, আর সেই ভিত্তিতেই যদি আঘাত করা হয়, তবে তার পরিণাম পুরো দেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।