ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও মার্কিন অর্থনীতি এখন এক অদ্ভুত দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে খাতা-কলমে এবং শেয়ার বাজারে নজিরবিহীন উন্নতির ঝিলিক, অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মার্কিনিদের জীবনে আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কশাঘাত। একটি সাম্প্রতিক এবিসি নিউজ/ওয়াশিংটন পোস্ট/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫২ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশের অর্থনীতি আরও খারাপ হয়েছে। বিপরীতে মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ট্রাম্পের 'আমেরিকাকে আবার সাশ্রয়ী করার' (Make America Affordable Again) প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
অর্থনীতির দুই পিঠ: পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা
কাগজে-কলমে মার্কিন অর্থনীতি বর্তমানে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার স্থিতিশীল, বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং শেয়ার বাজার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রেকর্ড স্পর্শ করছে। কিন্তু এই গাণিতিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
সরকারি মুদ্রাস্ফীতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
ইউটিলিটি বিল বা পরিষেবার খরচ বেড়েছে ১২ শতাংশ।
বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে ৫ শতাংশ।
ডে-কেয়ার বা শিশু পরিচর্যার খরচ বেড়েছে ৫ শতাংশ।
ভাড়া বেড়েছে ৩.৫ শতাংশ।
খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে ৩ শতাংশ।
ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল টেকনিশিয়ান এবং তিন সন্তানের একক মা জুলি লুসেনি জানান, সব বিল পরিশোধ করার পর তার হাতে পরবর্তী পে-চেক আসার আগে মাত্র ১০০ ডলার অবশিষ্ট থাকে। এমনকি স্কুলের নতুন সেশন শুরু হলেও তিনি তার সন্তানদের জন্য মাত্র দুই জোড়া জুতো কিনতে পেরেছেন। এই চিত্রটি এখন আমেরিকার অসংখ্য পরিবারের নিত্যদিনের গল্প।
ট্যারিফ এবং মুদ্রাস্ফীতির যোগসূত্র
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর চাপানো ট্যারিফ বা শুল্ক এই মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্যারিফের প্রভাব উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে কিছুটা সময় নেয়। এই বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই বর্তায়, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে প্রতিটি পরিবার গত বছরের তুলনায় একই পণ্য ও সেবা কিনতে মাসে গড়ে ২০৮ ডলার বেশি খরচ করছে।
একটি বিভক্ত অর্থনীতি এবং এর ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে বর্তমান মার্কিন অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অসম বণ্টন এবং ভোগব্যয়
বর্তমান আমেরিকান অর্থনীতি মূলত শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনী পরিবারের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে এই সামর্থ্যবান গোষ্ঠী থেকে। ফলে শেয়ার বাজার চাঙ্গা থাকলেও এবং সার্বিক অর্থনীতি শক্তিশালী মনে হলেও, সমাজের নিচের স্তরের মানুষেরা তার সুফল পাচ্ছেন না। এটি একটি 'কে-শেপড' (K-shaped) রিকভারি বা প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবরা মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে।
২. রাজনৈতিক প্রভাব ও জনমত
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জরিপে দেখা যাচ্ছে অর্ধেকের বেশি মানুষ তার অর্থনৈতিক নীতিতে অসন্তুষ্ট। এই জনমত আগামী নির্বাচনগুলোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মানুষ অর্থনীতির বড় পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজের পকেটের অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
৩. জীবনযাত্রার সংকটে সামাজিক প্রভাব
জুলি লুসেনির মতো সাধারণ মানুষের সংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি সামাজিক সংকটও তৈরি করছে। খাদ্য, বাসস্থান এবং শিশু পরিচর্যার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে যখন সাধারণ মানুষ হিমশিম খায়, তখন দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
৪. নীতিগত দ্বন্দ্ব: ট্যারিফ বনাম মুক্ত বাজার
ট্রাম্পের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি (ট্যারিফ) একদিকে অভ্যন্তরীণ শিল্পকে রক্ষার কথা বললেও, অন্যদিকে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই নীতিগত দ্বন্দ্বই মূলত বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম জ্বালানি। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই নীতি ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হওয়া কঠিন।
আমেরিকার অর্থনীতি বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে ওয়াল স্ট্রিটের উৎসব, অন্যদিকে মেইন স্ট্রিটের হাহাকার। ট্রাম্প প্রশাসন যদি দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা নিতে না পারে, তবে এই ক্ষোভ কেবল জরিপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।