এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৩:৫৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মরক্কোর ট্রফি জয়ে আরব ফুটবলে নতুন ইতিহাস

মরক্কোর ট্রফি জয়ে আরব ফুটবলে নতুন ইতিহাস

লুসাইল স্টেডিয়ামের উত্তাল পরিবেশে নাটকীয় এক ফাইনাল উপহার দিয়ে ফিফা আরব কাপের শিরোপা জিতেছে মরক্কো। বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে জর্ডানকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় উত্তর আফ্রিকার এই শক্তিশালী দলটি। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের ফলাফল নিষ্পত্তি না হওয়ায় অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গড়ানো এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাসি হাসে মরক্কানরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে নামে মরক্কো। তাদের এই কৌশল ফলপ্রসূ হয় প্রথমার্ধেই। উসামা তান্নানের চমৎকার গোলে এগিয়ে যায় মরক্কো। অভিজ্ঞ এই দল প্রথম থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করে। তবে জর্ডানও সহজে হাল ছাড়েনি। প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলার সুযোগ পাওয়া দলটি মাঠে প্রচণ্ড লড়াকু মনোভাব প্রদর্শন করে।

দ্বিতীয়ার্ধে খেলার চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করে। বিরতির পরই নতুন উদ্যমে মাঠে নামে জর্ডান। তাদের পরিশ্রম সফল হয় দ্রুতই। দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র তিন মিনিটের মাথায়, ৪৮তম মিনিটে আলী ওলোয়ানের দুর্দান্ত হেডিং গোলে সমতা ফেরায় জর্ডান। এই গোল জর্ডান শিবিরে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। তাদের খেলায় আসে নতুন গতি।

জর্ডানের উত্থান এখানেই থেমে থাকেনি। ৬৮তম মিনিটে পেনাল্টি অর্জন করে তারা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করে ম্যাচে প্রথমবারের মতো লিড নেয় জর্ডান। মরক্কোর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এগিয়ে যাওয়ায় স্টেডিয়ামে জর্ডান সমর্থকদের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। তাদের স্বপ্ন দেখার যথেষ্ট কারণ ছিল এই মুহূর্তে।

কিন্তু অভিজ্ঞ মরক্কো দল হার মানতে প্রস্তুত ছিল না। বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলা দলের অভিজ্ঞতা এবং মানসিক দৃঢ়তা কাজে লাগে এই সংকটকালে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র দুই মিনিট বাকি থাকতে, ৮৮তম মিনিটে আব্দেররাজ্জাক হামেদ আল্লাহ দলের হয়ে সমতা ফেরান। এই গোল ম্যাচকে নতুন মোড় দেয়। জর্ডানের স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করে।

অতিরিক্ত সময়ে মাঠে নামে দুই দল। ক্লান্তি সত্ত্বেও থেমে থাকেনি আক্রমণের ধারা। মরক্কো তাদের সব শক্তি নিয়োগ করে বিজয়ের জন্য। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের ১০০তম মিনিটে আবারও গোল করেন হামেদ আল্লাহ। এই স্ট্রাইকারের দ্বিতীয় গোল মরক্কোর জয় নিশ্চিত করে। ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।

জর্ডানের জন্য এই পরাজয় হতাশাজনক হলেও তাদের অর্জন কম নয়। প্রথমবারের মতো ফাইনালে পৌঁছে তারা ইতিহাস রচনা করেছে। মরক্কোর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই করে তারা প্রমাণ করেছে আরব ফুটবলে তাদেরও জায়গা আছে। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তাদের প্রাণবন্ত এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

মরক্কোর জন্য এই চ্যাম্পিয়নশিপ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তারা ইতিহাস গড়েছিল। আফ্রিকার প্রথম দল এবং আরব বিশ্বের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছিল তারা। তিন বছর পর আবার কাতারের মাটিতে ফিরে আরেকটি বড় শিরোপা জিতে তারা প্রমাণ করল সেই সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।

ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জয় মরক্কোর আত্মবিশ্বাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে। আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য আফ্রিকা নেশনস কাপে তাদের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ের মাধ্যমে দলে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা আফ্রিকা কাপে তাদের জন্য সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফাইনাল ম্যাচ আরব ফুটবলের ক্রমবর্ধমান শক্তির আরেকটি প্রমাণ। বিশ্বকাপে কাতারের আয়োজনের পর থেকে এই অঞ্চলে ফুটবলের জনপ্রিয়তা এবং মানোন্নয়ন দুটোই ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মরক্কো এবং জর্ডান উভয় দলই তাদের সক্ষমতা প্রদর্শন করে প্রমাণ করেছে আরব ফুটবল এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিতে পারে।

মরক্কান কোচিং স্টাফ ম্যাচ শেষে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, কঠিন পরিস্থিতিতে দল যেভাবে লড়াই করেছে, তা তাদের মানসিক শক্তির পরিচায়ক। পিছিয়ে থেকেও হাল না ছেড়ে ফিরে আসার এই ক্ষমতা বড় টুর্নামেন্টে সফল হওয়ার জন্য অপরিহার্য।

জর্ডানের কোচও তার দলের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, পরাজয় হলেও দল গর্বিত হতে পারে তাদের অর্জনে। প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলে মরক্কোর মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে পারা নিজেই একটি বড় অর্জন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দলকে আরও শক্তিশালী করবে।

ফিফা আরব কাপের এই আসরে মোট ষোলটি দল অংশ নিয়েছিল। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে উচ্চমানের ফুটবল এবং কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। ফাইনালের মতো রোমাঞ্চকর ম্যাচ এই টুর্নামেন্টের মান কতটা উন্নত হয়েছে তার প্রমাণ।

মরক্কোর এই জয় শুধু একটি ট্রফি জয় নয়, এটি আরব ফুটবলের উত্থানের প্রতীক। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে এই অঞ্চল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিচ্ছে। মরক্কো এবং জর্ডানের মতো দলের পারফরম্যান্স এই ধারাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী দিনগুলোতে মরক্কো তাদের ফোকাস সরিয়ে নেবে আফ্রিকা নেশনস কাপের দিকে। এই শিরোপা জয়ের পর তাদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। দলের খেলোয়াড়রা এবং কোচিং স্টাফ প্রস্তুতি নিতে শুরু করবেন মহাদেশীয় এই প্রতিযোগিতার জন্য। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান ফর্ম এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে মরক্কো আফ্রিকা কাপে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারবে।