যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনের নজিরবিহীন পদক্ষেপ মার্কিন রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাহী ক্ষমতা এবং ফেডারেল সরকারের তদন্ত ও প্রসিকিউটরিয়াল শক্তি ব্যবহার করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজের অনুকূলে বাঁকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠা ট্রাম্পের এই অবস্থান দেশটির ভোটারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আস্থার সংকটের সৃষ্টি করেছে।
আস্থার সংকট ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি ২০২০ সালের পরাজয়কে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ২০২৪ সালের নিজের বিজয়কে ‘বৈধ’ ঘোষণা করেছেন, তিনি এখন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার দলের জন্য প্রতিকূল হয়ে ওঠায় তিনি আবারও রিপাবলিকানদের সতর্ক করছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা ফলাফল ‘রিগ’ বা কারচুপি করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা আশঙ্কা করছেন যে, ট্রাম্প নিজেই সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে যাচ্ছেন।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রথা ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ট্রাম্প তার শীর্ষ ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের ভোটার জালিয়াতির প্রমাণ খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল পদগুলোতে এমন ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে যারা গত নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করেছিলেন। এতে করে নির্বাচনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ তুঙ্গে পৌঁছেছে।
ফেডারেল হস্তক্ষেপ ও ‘জাতীয়করণ’ বিতর্ক
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের প্রশাসনিক দায়িত্ব স্টেটগুলোর ওপর ন্যস্ত থাকলেও ট্রাম্প বারবার নির্বাচনকে ‘জাতীয়করণ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার নির্দেশে নবগঠিত ও রাজনৈতিক রূপ নেওয়া বিচার বিভাগ (DOJ) বিভিন্ন স্টেটের ব্যক্তিগত ভোটার তালিকার তথ্য পেতে মামলা শুরু করেছে। সম্প্রতি জর্জিয়ার একটি নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে এফবিআই (FBI) ২০২০ সালের ব্যালট পেপার জব্দ করেছে—যে অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিজে ব্যক্তিগতভাবে এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে তিনি অভিযানকারী এজেন্টদের ফোনে প্রশংসা করেছেন।
রক্ষণশীল অবসরপ্রাপ্ত ফেডারেল আপিল আদালতের বিচারক জে. মাইকেল লুটিগ, যিনি ট্রাম্পের তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত, বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন জনগণের চোখের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ধ্বংস করার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ফেডারেল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।”
ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
নির্বাচনী কারসাজির পাশাপাশি ট্রাম্প অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার নির্বাহী ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করছেন। ডেমোক্রেটিক গভর্নরদের অমত সত্ত্বেও তিনি নীল স্টেটগুলোতে (Blue States) অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য সৈন্য মোতায়েন করেছেন। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই হত্যার নির্দেশ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করার জন্য বিচার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছেন, তিনি তখনই ফলাফল মানবেন “যদি নির্বাচন সৎ হয়”। তিনি ভোটার আইডি এবং মেইল-ইন ভোটিং (চিঠির মাধ্যমে ভোট) সীমিত করার মতো কড়াকড়ি আরোপের ওপর জোর দিচ্ছেন।
স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ও জালিয়াতির ধুয়া
মঙ্গলবার কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প বিতর্কিতভাবে দাবি করেন যে, এটি হওয়া উচিত ছিল তার “তৃতীয় মেয়াদ”। তিনি ঘোষণা করেন যে ডেমোক্র্যাটরা কেবল “চুরি” বা জালিয়াতির মাধ্যমেই নির্বাচিত হতে পারে। তার স্বরাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টি নোম অ্যারিজোনায় এক অনুষ্ঠানে জানান যে, প্রশাসন সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করছে যেন “সঠিক মানুষরাই ভোট দিতে পারে”।
চলতি বছরের শুরুতেই ট্রাম্প রসিকতার ছলে মধ্যবর্তী নির্বাচন বাতিলের প্রস্তাব করেছিলেন। পরে তার সহযোগীরা একে কৌতুক বলে চালিয়ে দিলেও ট্রাম্প আবারও ফেডারেল সরকারের জড়িত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। ওভাল অফিসে বসে তিনি ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত তিনটি শহরের নাম উল্লেখ করে বলেন, “যদি তারা বৈধভাবে এবং সততার সাথে ভোট গণনা করতে না পারে, তবে অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে।”
ডেমোক্র্যাটদের সতর্কতা ও আইনি প্রস্তুতি
ডেমোক্র্যাটরা এই পরিস্থিতিকে চরম একনায়কতন্ত্রের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন পোলিং সেন্টারগুলোতে ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করে ভোটারদের ভয় দেখাতে পারে, ভোটার লিস্টের ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার করতে পারে বা ভোটিং মেশিন জব্দ করতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফ্রিজ বলেন, “আমাদের এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে যা আগের কোনো চক্রে হয়নি। ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো কিছু করতে পারে।”
পিছনের সারিতে ডেমোক্রেটিক অ্যাটর্নি জেনারেলরা ফেডারেল হস্তক্ষেপ রুখতে এবং পোলিং স্টেশনগুলো থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে সরিয়ে রাখার জন্য আইনি নথি ও পিটিশন ড্রাফট করছেন।
প্রতিষ্ঠানের ‘অস্ত্রায়ন’ ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মার্কিন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর এক কঠিন পরীক্ষা। এখানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য:
১. প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক রূপান্তর: এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল, অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি এবং নির্বাচন নিরাপত্তা পরিচালক কার্ট ওলসেনের মতো ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রমাণ করে যে, সরকার এখন এমন একদল মানুষের হাতে যারা পূর্ববর্তী নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘অস্ত্রায়ন’ (Weaponization) সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
২. যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কাঠামোর ওপর আঘাত: মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার একক ক্ষমতা স্টেটগুলোর। কিন্তু ট্রাম্প যেভাবে ‘ন্যাশনালিস্ট’ নির্বাচনের কথা বলছেন এবং এফবিআই পাঠিয়ে ব্যালট জব্দ করছেন, তা ফেডারেল কাঠামোর ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। এটি গভর্নরদের ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে এবং অঙ্গরাজ্য বনাম ফেডারেল সরকারের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সংঘাতের পথ তৈরি করছে।
৩. মানসিক যুদ্ধ ও জালিয়াতির বয়ান: নির্বাচনের আগেই ‘জালিয়াতি হবেই’—এমন বয়ান তৈরি করা আসলে পরাজয়ের আগাম অজুহাত খোঁজা অথবা বিজয়কে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল। যখন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বলেন যে তার প্রতিপক্ষ কেবল চুরি করেই জিততে পারে, তখন নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়। এটি ৬ জানুয়ারির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৪. বিচারবিভাগীয় রক্ষাকবচ: এখনো পর্যন্ত আদালতগুলো ট্রাম্পের অনেক নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। সংবিধানের সেই রক্ষাকবচটুকু যদি এবার ভেঙে পড়ে, তবে আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল অন্ধকার নয়, বরং এটি একটি গভীর সাংবিধানিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা যেখানে সরকারের প্রধান কাজ, সেখানে সরকারের কর্মকাণ্ডই যদি অস্বচ্ছতার মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তবে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ফলাফল নির্ধারণ করবে না, বরং মার্কিন গণতান্ত্রিক ইতিহাসের গতিপথ ঠিক করে দেবে।