মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তেহরানের পাল্টা জবাব এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মঙ্গলবার এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। তাদের পরিচালিত ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর প্রথম দুই দিনে অন্তত ৬৫০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য হতাহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
রণক্ষেত্রে আইআরজিসি-র বিধ্বংসী আঘাত
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি এই অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও নৌবহর লক্ষ্য করে ইরান একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
নায়েইনির ভাষ্যমতে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (5th Fleet) সদরদপ্তরে একাধিকবার নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় হামলায় ১৬০ জন মার্কিন সদস্য হতাহত হয়েছেন। এছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ‘এমএসটি কমব্যাট সাপোর্ট’ জাহাজটিও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পিছু হটল ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন
এই যুদ্ধের অন্যতম নাটকীয় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর পিছু হটাকে। আইআরজিসি দাবি করেছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের চাবাহার উপকূল থেকে ২৫০-৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত এই দানবীয় রণতরীটি লক্ষ্য করে চারটি শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে রণতরীটি তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের উপকূলীয় জলসীমা ত্যাগ করে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। বিশ্লেষকরা একে মার্কিন নৌ-শক্তির জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা ও মার্কিন নীরবতা
৬৫০ জন সেনা হতাহতের বিষয়ে নায়েইনি বলেন, "আমেরিকানদের জন্য এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি অস্বীকার বা গোপন করা স্বাভাবিক অভ্যাস। তবে আমাদের গোয়েন্দা তথ্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি উপাত্ত এই সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।" এখন পর্যন্ত পেন্টাগন বা হোয়াইট হাউস থেকে হতাহতের এই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র চাপের মুখে রয়েছে।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও আগামীর সংকেত
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পাল্টা হামলা কেবল একটি প্রতিশোধ নয়, বরং এটি তাদের ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের অংশ।
১. আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই: বাহরাইনের মতো কৌশলগত স্থানে হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো মার্কিন ঘাঁটই নিরাপদ নয়।
২. অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই: গত শনিবারের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাহাদাত বরণের পর ইরানের সামরিক বাহিনী এখন ‘অল-আউট’ যুদ্ধের পথে হাঁটছে।
৩. অর্থনৈতিক আঘাত: হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে ৭৮৫ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।
পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার অজুহাতে ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর জবাবেই ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ শুরু করে।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। যদি ওয়াশিংটন এই ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে এবং পাল্টা আরও বড় হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।