ইসরায়েলের গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা বিশ্বজুড়ে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নানা দেশে বিক্ষোভ, বর্জন ও সংহতির আন্দোলন ক্রমেই ব্যাপক আকার নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সব জায়গায়ই বাড়ছে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ধ্বনি।
গত দুই বছরে ১৩৩টি দেশ ও অঞ্চলে অন্তত ৪৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা এসিএলইডি (ACLED)। সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে ইয়েমেনে, এরপর মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, তুর্কিয়ে, ইরান, পাকিস্তান, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায়।
ইসরায়েলকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিঃসঙ্গতা
বর্জন আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি “বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস (বিডিএস)”—যা ২০০৫ সালে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও বৈষম্যের প্রতিবাদে শুরু হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ওমর বারঘুতি বলেন, “ইসরায়েলের দমননীতি ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আজ সারা বিশ্বের মানুষ কণ্ঠ তুলেছে। এটি এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।”
বিডিএসের তথ্যমতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন ইসরায়েল সম্পর্কিত কার্যক্রমে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইসরায়েলি রপ্তানি ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যানও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, কিছু দেশে “বিডিএসের কারণে গোপনে ব্যবসা করতে হচ্ছে।”
জনগণের বর্জনে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষতি
বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট পণ্য ও ব্র্যান্ড বর্জন করছেন। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে ম্যাকডোনাল্ডস ও স্টারবাকসের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৪ সালে ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও স্বীকার করেন, “কয়েকটি বড় বাজারে বিক্রিতে অর্থবহ পতন ঘটেছে।” একই বছর স্টারবাকসও টানা তিন ত্রৈমাসিকে বিক্রিতে পতন দেখে শত শত কর্মী ছাঁটাই করে।
ইউরোপে বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা
ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করেছে।
২০২৪ সালে ফ্রান্সের বৃহৎ খুচরা প্রতিষ্ঠান কারেফোর (Carrefour) জর্ডান, কুয়েত ও ওমানে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়—যা বিডিএস আন্দোলনের বড় সাফল্য বলে বিবেচিত।
নরওয়ে, ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের পেনশন ফান্ডও ইসরায়েলি কোম্পানিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে।
এছাড়া স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যাপের মাধ্যমে সচেতন বর্জন
বর্তমানে “বয়ক্যাট” (Boycat) ও অনুরূপ অ্যাপের মাধ্যমে ভোক্তারা সহজেই জানতে পারছেন কোন ব্র্যান্ড ইসরায়েলের দমননীতির সঙ্গে যুক্ত। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা ও ইউরোপের তরুণ প্রজন্ম এসব অ্যাপ ব্যবহার করে বিকল্প স্থানীয় ব্র্যান্ড বেছে নিচ্ছেন।
বিশ্ব বিবেকের জাগরণ
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ড. মোহাম্মদ মুস্তাফা বলেন, “গাজায় যা ঘটছে তা দেখে বিশ্বের মানুষ আর চুপ থাকতে পারছে না। ন্যায়বিচারের আহ্বানে পৃথিবীজুড়ে যে একতা গড়ে উঠছে, তা আমাদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।”
জাতিসংঘের নজরদারি
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর ২০২০ সাল থেকে ইসরায়েলি দখলকৃত এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপন করে ব্যবসা করা কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করে আসছে। ২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্যে ১৫৮টি কোম্পানির নাম রয়েছে—এর মধ্যে ৯০ শতাংশই ইসরায়েলি, তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানির কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও এতে অন্তর্ভুক্ত।
ড. মুস্তাফা বলেন, “ফিলিস্তিন আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি দেখিয়েছে কীভাবে ঐক্য ও সহমর্মিতা ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে।”
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা