এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৩:৩৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বিদেশি দত্তক বন্ধের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল দক্ষিণ কোরিয়া

বিদেশি দত্তক বন্ধের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়া সরকার দেশ থেকে শিশুদের বিদেশে দত্তক দেওয়ার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার সিউলে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী লি সেরান জানান, আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে তারা এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশুদের সুরক্ষায় অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার করা হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে বিদেশি দত্তক গ্রহণের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

সরকারি এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার শিশু দত্তক সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে তদন্তকারীরা গত কয়েক দশকে বিদেশে দত্তক পাঠানো শিশুদের সাথে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে যখন হাজার হাজার শিশুকে পশ্চিমে পাঠানো হয়েছিল, তখন নথিপত্র জালিয়াতি এবং শিশুদের প্রতি করা অন্যায়ের বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সিউলের ব্যর্থতাকে কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের এই তদন্ত শুরু হয়েছিল ৫২ বছর বয়সী ইউরি কিমের এক আবেদনের প্রেক্ষিতে। ১৯৮৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তাকে তার বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই জালিয়াতি করা নথির মাধ্যমে ফ্রান্সে দত্তক পাঠানো হয়েছিল। কিম অভিযোগ করেছেন যে বিদেশে যাওয়ার পর তিনি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। কিমের মতো কয়েকশ শিশুর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, সে সময় বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারি তদারকি ছাড়াই শিশুদের বিদেশে পাঠাত এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের অনাথ সাজিয়ে নথিপত্র জাল করা হতো।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছর গড়ে ছয় হাজার শিশুকে বিদেশে পাঠাত। ২০০৫ সালেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে এবং ২০২৫ সালে মাত্র ২৪ জন শিশুকে বিদেশে দত্তক দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকার এখন এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে সরিয়ে সরকারি কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। কর্মকর্তাদের মতে, এখন থেকে দেশের অভ্যন্তরেই শিশুদের বড় করার সুযোগ তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মানবাধিকার আইনজীবীরা অবশ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও অতীতের ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও সঠিক বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, অতীতে যাদের নথিপত্র হারিয়ে গেছে বা জাল করা হয়েছে, তাদের শেকড় খুঁজে বের করতে সরকারের আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন করে তদন্ত ও বিচারের পথ সহজ করতে আইনি সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তটি এক নতুন মানবিক দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।