প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবার ২০২৫, ০৮:৩৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ফিতনার ঝড়ে এআই : মুমিনের নৈতিক কম্পাস

ফিতনার ঝড়ে এআই : মুমিনের নৈতিক কম্পাস

ফিতনা' এক ধ্বংসাত্মক বিপদ সংকেত, ভাইরাস- যা আকাশে বাতাসে ভাসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই সংকেতকে ত্বরান্বিত করেছে। একই সময়ে তা অসাধ্যকে সাধন করার উপকরণ, আবার মিথ্যাকে সত্যের মুখোশ পরানোর যন্ত্রও। তাই প্রশ্নটা প্রযুক্তি “ভালো না খারাপ” এটা নয়, প্রশ্নটা হলো, এই শক্তিকে কে কী নীতিতে, কোন নিয়তে, কোন শৃঙ্খলায় ব্যবহার করবে। এখানেই মুমিনের বড় পরীক্ষা।

কুরআন আমাদের প্রথমেই জ্ঞাত করে- “যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার পিছে চল না” (ইসরা ১৭:৩৬)। আর সংবাদ এলে যাচাই করতে বলে (হুজুরাত ৪৯:৬)। এ দুটো আয়াত আজকের এআই যুগের জন্য নীতিচাবি। প্রবাহমান কন্টেন্ট, ডিপফেইক, অ্যালগরিদমিক প্রলোভনের ভেতর দিয়ে সত্য-মিথ্যা বাছাইয়ের ঈমানি প্রোটোকল। তৌহিদের দৃষ্টিতে প্রযুক্তি কখনো স্বয়ং “অপরাধী” নয়। অপরাধ বা ইহসান মানুষের নিয়ত, জবাবদিহি আর শাসনব্যবস্থার ফল। সুতরাং আমাদের কাজ: মেশিনকে ‘খিদমাহ’তে লাগানো, মানুষকে ‘ফিতনা’তে ঠেলে না দেওয়া।

এআইকে ঘিরে মূল বিপদ তিনটি স্তরে কাজ করে। জ্ঞানের স্তরে, অতিরিক্ততা ও বিভ্রান্তি, শব্দের বিস্ফোরণে অর্থের মৃত্যু। নৈতিক স্তরে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি: “মডেল বলেছে” বলে মানুষ নিজের বিবেককে আউটসোর্স করে। ক্ষমতার স্তরে নজরদারি ও বৈষম্য: ডেটা যাদের, সুবিধাও তাদের। বাকি সবাই পণ্যে পরিণত। মুমিনের করণীয় হচ্ছে, জ্ঞানকে পরিশুদ্ধ করা, নৈতিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া, আর ক্ষমতার কাঠামোতে ন্যায়ের তৌল পাল্লা বসানো (রহমান ৫৫:৭–৯)।

মাকাসিদুল শরিয়াহ: দ্বীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা, সম্পদ- এই পাঁচ রক্ষণনীতি এআই যুগেও দিশারি। বুদ্ধির সংরক্ষণ মানে ‘অটোমেশন’-এ নিদ্রিত নয়, বরং সমালোচনামুখর তদন্তী চিন্তা। সম্পদের সংরক্ষণ মানে অর্থনীতিকে উৎপাদনশীল ও ন্যায্য করা। জীবনের সংরক্ষণ মানে চিকিৎসা, দুর্যোগ, নিরাপত্তায় এআইকে প্রাণরক্ষামুখী করা। দ্বীনের সংরক্ষণ মানে জ্ঞানকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচানো আর বংশধারা মানে মানবমর্যাদা ও গোপনীয়তার অবিচ্ছেদ্য অধিকার।

এ বাস্তবতা মাথায় রেখে বিশ্বাসীদের জন্য দশটি অঙ্গীকারকে আজই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক নীতিতে পরিণত করা দরকার: (১) নিয়তনথি: প্রতিটি টুল ব্যবহারের আগে উদ্দেশ্য লিখে নেওয়া। ইবাদত, শিক্ষণ, বা খিদমত? (২) সত্য প্রোটোকল: কোনো কন্টেন্ট ছড়ানোর আগে দুই উৎস যাচাই, উৎস স্বাক্ষর না থাকলে বিরত থাকা। (৩) তথ্যের পর্দা: নিজের ও অন্যের ডেটা ‘আমানত’ অপ্রয়োজনীয় শেয়ার হারাম আশংকাময়। (৪) ইহসান-ডিজাইন কনটেন্টে: বিদ্বেষ নয়, রহমত, সমালোচনা ও আখলাকে। (৫) পক্ষপাত নিরীক্ষা: নিজের প্রম্পট ও ডেটায় ন্যায়ের পরীক্ষা। বঞ্চিত কণ্ঠ যুক্ত করা। (৬) ডিজিটাল খালওয়া নিয়মিত ‘অ্যালগরিদমিক ক্ষুধা’: নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইন নীরবতা, কিতাব, কুরআন, ধ্যান। (৭) দক্ষতার অন্বেষণ: মাদরাসা, মসজিদ, স্কুলে এআই সাক্ষরতা। তরুণদের ‘নিয়ত+নৈপুণ্য’ একসাথে শেখানো। (৮) ওয়াক্‌ফ ডেটাসেট: উম্মাহর খিদমতের জন্য উন্মুক্ত, ন্যায্য, পরিষ্কার ডেটা ভান্ডার বিজ্ঞানের সদকা জারিয়া। (৯) মিস ইনফোর প্রতিরোধ: কমিউনিটিতে ‘ফ্যাক্ট চেইন’, কয়েকজন নির্ভরযোগ্য যাচাইকর্তা- আপনার পাড়ারই আলেম, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ। (১০) জননীতি-সাহস: গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির পক্ষে নীতিতে সোচ্চার হওয়া। “মানুষ কেন্দ্রিক এআই” শুধু স্লোগান নয়, আইন ও প্রয়োগে নিশ্চিত করা।

“কে সুযোগ নেবে?” জ্ঞান ও চরিত্রে যে প্রস্তুত, সুযোগ তারই। এআই যুগে বড় সুযোগ তিন দিক থেকে আসে। শিক্ষায়: বহু ভাষায়, বহু মানসিকতায়, ব্যক্তিগত গতিতে কুরআন-সুন্নাহ, বিজ্ঞান, দর্শন শেখা, কিন্তু তত্ত্বাবধানে, তাহকিকে। জীবিকায়: হালাল উদ্ভাবন- স্বাস্থ্য, কৃষি, দূর্যোগ পূর্বাভাস, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অটোমেশন, যাতে মানুষের হাতে সময় মিলে- ইবাদত, পরিবার, সমাজসেবায়। দাওয়াহতে সৌন্দর্যমণ্ডিত, প্রমাণসমৃদ্ধ, কঠোর নয়, কোমল ভাষায় সত্য পৌঁছানো- বিদ্বেষ নয়, বিবেক জাগানো। আর হুঁশিয়ার! মিথ্যার চটুলতা, নজরদারির প্রলোভন, অলসতার নেশা। মুমিন তার জিহ্বা সংযত রাখে, আঙুলের ক্লিকও তাই; সে সিজদাবনত হৃদয় নিয়ে কাজ করে দক্ষ হাতে। তাওয়াক্কুলে ভর করে কিন্তু তাসবিব ছাড়ায় না।

অতএব ফিতনার পূর্ববার্তায় আমরা আতঙ্কিত নই, আমরা সজাগ। আমাদের জবান সত্যের জন্য, আমাদের ডেটা আমানত, আমাদের কোড রহমতের জন্য। যে উম্মাহ একদিন কলমের কসমকে সভ্যতার শিরোমণি করেছিল, সে উম্মাত আজও পারবে। যদি নিয়তকে শুদ্ধ করি, জ্ঞানকে যাচাই করি, ন্যায়ের পাল্লা ঠিক রাখি, আর প্রযুক্তিকে আল্লাহর বান্দার খিদমতে নামাই। দু’আ করি: আল্লাহুম্মা, আমাদের চক্ষুতে সত্যের নূর, কানে ফুরকানের বিচার, হৃদয়ে তাকওয়ার কম্পাস দাও- যাতে ফিতনার ঝড়ে আমরা দিশেহারা না হয়ে দিশারী হই।