এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বার ২০২৫, ০৪:০১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ন্যান্সি পেলোসি ২০২৭ সালে অবসরে যাচ্ছেন

সমাপ্তি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়

ন্যান্সি পেলোসি ২০২৭ সালে অবসরে যাচ্ছেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ঘোষণা করেছেন, তিনি ২০২৭ সালের শুরুতে বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন। এর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এক নারীর দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক যাত্রার।

৮৫ বছর বয়সী পেলোসি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র নারী স্পিকার হিসেবে ২০ বছর ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ৩৯ বছর ধরে তিনি কংগ্রেসে সান ফ্রান্সিসকোর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর সময়ে দেশ ও শহর উভয়েই বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে—এইডস সংকট থেকে সমলিঙ্গ বিবাহের স্বীকৃতি, প্রযুক্তি খাতের উত্থান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিভাজনের গভীরতা পর্যন্ত।

পেলোসি জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ডেমোক্রেটদের কাছে নায়কোচিত মর্যাদা পান। ওবামাকেয়ার, জলবায়ু পরিবর্তন আইন ও অবকাঠামো কর্মসূচি পাস করাতে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, “কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আমি আমার শেষ বছরটি সান ফ্রান্সিসকোর জনগণের প্রতিনিধিত্বে উৎসর্গ করছি। শহরটি যেন তার শক্তি চিনে রাখে, কারণ গণতন্ত্র রক্ষায় আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।”

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পেলোসি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে সফল তহবিল সংগ্রাহক; তাঁর প্রচেষ্টায় দলীয় প্রচারণার জন্য ১.৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ জোগাড় হয়েছে।

তবে রিপাবলিকানদের কাছে তিনি ছিলেন বিতর্কিত ও বিরাগভাজন এক নেতা। তাঁকে প্রায়ই “লিবারেল সান ফ্রান্সিসকোর প্রতীক” হিসেবে আক্রমণ করেছেন রক্ষণশীল রাজনীতিবিদরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও তাঁর তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল—তিনি ট্রাম্পকে “এক ঘৃণ্য প্রাণী” বলে অভিহিত করেছিলেন, আর ট্রাম্প তাঁকে “ক্রেজি ন্যান্সি” বলে কটাক্ষ করেন। পেলোসি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি অভিশংসন প্রস্তাবও পরিচালনা করেন।

সহকর্মীদের মতে, পেলোসি ছিলেন ব্যতিক্রমী এক রাজনীতিক। প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য জ্যাকি স্পিয়ার বলেন, “তিনি ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্পিকার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”

দলীয় অভ্যন্তরে অনেক তরুণ ডেমোক্র্যাট তাঁর আসনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখালেও, পেলোসি সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি চাইলে আবারও নির্বাচিত হতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দলীয় পরাজয় এবং নেতৃত্বে প্রজন্ম পরিবর্তনের দাবিতে তাঁর অবসর নিয়ে জল্পনা বাড়ে।

তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে ইতোমধ্যে দুইজন প্রার্থী মাঠে নেমেছেন—সান ফ্রান্সিসকোর রাজ্য সিনেটর স্কট উইনার এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের সাবেক সহকারী সাইকাত চক্রবর্তী।

অবসরের আগে পেলোসি ক্যালিফোর্নিয়ার প্রস্তাব ৫০ পাস করাতে বড় ভূমিকা রাখেন। এই পদক্ষেপ নতুন হাউস জেলা গঠনের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের জন্য অতিরিক্ত আসন তৈরি করেছে। গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এই উদ্যোগে পেলোসির অবদানকে “গণতন্ত্রের আত্মরক্ষা” বলে উল্লেখ করেন।

ন্যান্সি পেলোসি ১৯৩০-এর দশকে বাল্টিমোরে এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ও ভাই দুজনেই শহরের মেয়র ছিলেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর স্বামী পল পেলোসির সঙ্গে পরিচয় হয়। সান ফ্রান্সিসকোতে বসতি স্থাপন করে তিনি সন্তানদের লালন-পালনের পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট পার্টির জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রথম নারী চেয়ার হিসেবে নির্বাচিত হতে সহায়তা করে।

১৯৮৭ সালে বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে পেলোসি প্রথম কংগ্রেসে প্রবেশ করেন। প্রথম ভাষণেই তিনি এইডস সংকট নিয়ে সরব হন এবং পরে রায়ান হোয়াইট অ্যাক্ট পাস করান, যা এইডস রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে।

তাঁর নেতৃত্বে সান ফ্রান্সিসকোর প্রাক্তন সামরিক ঘাঁটি ‘প্রেসিডিও’কে কনডোমিনিয়ামে রূপান্তর না করে জাতীয় উদ্যান হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। লস অ্যাঞ্জেলসের মেয়র কারেন ব্যাস বলেন, “তিনি এমন এক নেতা, যিনি বিরোধীদেরও একত্রিত করে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।”

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলায় তাঁর অফিস ছিল হামলাকারীদের অন্যতম লক্ষ্য। পরের বছর, ২০২২ সালে, তাঁর স্বামী পল পেলোসি এক উগ্রপন্থীর হামলার শিকার হন।

তবুও পেলোসি সবসময় ইতিবাচক ছিলেন এবং কাজের প্রতি নিবেদিত থেকেছেন। সোমবার সান ফ্রান্সিসকোর এক জনসভায় তিনি বলেন, “এটি আমেরিকার আত্মরক্ষার মুহূর্ত।”

তাঁর ৩৯ বছরের সংসদীয় যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পেলোসি যেমন নিজে বলেছেন, “বিশ্রাম মানেই মরিচা ধরা”—তাঁর এই দর্শনই হয়তো আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

তথ্যসূত্র:নিউ ইয়র্ক টাইমস