এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

নিউ জার্সির গভর্নর মাইকি শেরিলের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের মামলা

নিউ জার্সির গভর্নর মাইকি শেরিলের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের মামলা

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অভিবাসন বিরোধী কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নিউ জার্সির গভর্নর মাইকি শেরিলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ)। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, গভর্নরের জারি করা সাম্প্রতিক নির্বাহী আদেশটি মার্কিন সংবিধানের ‘সুপ্রিমেসি ক্লজ’ বা কেন্দ্রীয় আইনের শ্রেষ্ঠত্ব নীতিকে সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।

সোমবার নেওয়ার্কের ফেডারেল আদালতে তিন দফার এই মামলাটি দায়ের করা হয় এবং মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।

বিবাদের সূত্রপাত: নির্বাহী আদেশ ১২

গত নভেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে গত মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডেমোক্র্যাট গভর্নর মাইকি শেরিল। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১২’ জারি করেন। এই আদেশের মূল পয়েন্টগুলো হলো:

জুডিশিয়াল ওয়ারেন্ট বা আদালতের পরোয়ানা ছাড়া আইসিই (ICE) এজেন্টরা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পত্তির কোনো অ-পাবলিক (Private) অংশে প্রবেশ করতে পারবে না।

রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে আইসিই তাদের ‘অপারেশন বেস’ বা কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

নাগরিকদের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল খোলা হয়েছে যেখানে তারা আইসিই এজেন্টদের কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করতে পারবেন।

বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থান

বিচার বিভাগের ২১ পৃষ্ঠার অভিযোগে বলা হয়েছে, "তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত ফেডারেল আইনের প্রতি এমন অবজ্ঞা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি জননিরাপত্তাকে বিপন্ন করার একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ।" মামলায় আরও বলা হয় যে, গভর্নর শেরিল ইচ্ছাকৃতভাবে ফেডারেল আইন প্রয়োগে বাধা দিচ্ছেন এবং প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অন্তরায় সৃষ্টি করছেন। মজার বিষয় হলো, মামলার নথিতে আটবার গভর্নরের নাম উল্লেখ করা হলেও পাঁচবারই তার নামের বানান (Sherrill) ভুল করা হয়েছে।

গভর্নর শেরিলের পাল্টা জবাব

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর শেরিল ট্রাম্প প্রশাসনের এই আইনি পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “নিউ জার্সির মতো রাজ্য যারা মানুষকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে, তাদের আক্রমণ না করে ফেডারেল সরকারের উচিত তাদের আইসিই এজেন্টদের সঠিক প্রশিক্ষণের দিকে নজর দেওয়া। আইসিই যেভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে শিশুদের আটক করছে এবং নিরীহ নাগরিকদের বিপদে ফেলছে, তার বিরুদ্ধে আমি নিউ জার্সিবাসী নিরাপদ রাখার লড়াই চালিয়ে যাব।”

কেন্দ্রীয় বনাম রাজ্য ক্ষমতার সংঘাত

২০২৬ সালে এসে ট্রাম্প প্রশাসনের এই মামলাটি কেবল অভিবাসন ইস্যু নয়, বরং মার্কিন ফেডারেলিজমের একটি বড় পরীক্ষা। নিচে এর গভীরতর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো:

১. সুপ্রিমেসি ক্লজ ও আইনি লড়াই

মার্কিন সংবিধানের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফেডারেল আইন বা কেন্দ্রীয় আইন রাজ্যের আইনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বিচার বিভাগ প্রমাণ করতে চাইছে যে, নিউ জার্সি রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাজে বাধা দিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করছে। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়া এবং নিউ ইয়র্ক সিটির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি লড়াই দেখা গেছে। এই মামলাটি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

২. ‘স্যাঙ্কচুয়ারি স্টেট’ বনাম ট্রাম্পের এজেন্ডা

নিউ জার্সি এখন কার্যত একটি ‘স্যাঙ্কচুয়ারি স্টেট’ বা নিরাপদ আশ্রয়ের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। নেওয়ার্ক, জার্সি সিটি, প্যাটারসন এবং হোবোকেনের মতো শহরগুলো আগে থেকেই আইসিই-কে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই শহরগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে মূলত পুরো দেশের ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোকে একটি বার্তা দিতে চাইছে।

৩. জননিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

গভর্নর শেরিল যে ভিডিও পোর্টাল তৈরি করেছেন, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ। প্রশাসনের মতে, এটি আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটানো এবং তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার সামিল। অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আইসিই-এর ‘ললেস’ বা আইনহীন আচরণের বিরুদ্ধে এটি একটি ডিজিটাল প্রতিরোধ।

৪. প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রতীকি লড়াই

মামলার নথিতে গভর্নরের নামের বানান বারবার ভুল করা ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার একটি ছোট উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আইনি লড়াইয়ের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক লড়াই, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কট্টর সমর্থকদের দেখাতে চান যে তিনি অভিবাসন ইস্যুতে কোনো ছাড় দিচ্ছেন না।

নিউ জার্সির ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জেনিফার ড্যাভেনপোর্ট জানিয়েছেন, তারা আদালতে এই আদেশের বৈধতা প্রমাণে লড়াই করতে প্রস্তুত। এই মামলার ফলাফল নির্ধারণ করবে যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসন নীতি কতটুকু উপেক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। ২০২৬ সালের এই আইনি যুদ্ধ আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে উভয় দলের জন্যই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।