টাইম স্কয়ারের ঘড়িতে নতুন বছরের বারোটা বাজার পরপরই নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়। জৌলুসপূর্ণ কোনো অডিটোরিয়াম নয়, বরং সিটি হলের নিচে দীর্ঘকাল ধরে পরিত্যক্ত এক রহস্যময় পুরনো সাবওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে শপথ নিলেন সিটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানী। ৩৪ বছর বয়সী এই বামপন্থী নেতা নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
ঘড়িতে মধ্যরাত হতে চার মিনিট বাকি থাকতেই স্ত্রী রামা দুওয়াজি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসকে সাথে নিয়ে ৬ নম্বর ট্রেনের একটি বগিতে করে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অথচ কারুকার্যময় স্টেশনে পৌঁছান মামদানী। ১৯০৪ সালে নির্মিত এই স্টেশনটি একসময় সিটির আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। ঠিক বারোটা বাজার মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত মাত্র ২০ জন অতিথির সামনে স্ত্রীর হাতে থাকা দুটি কুরআনের ওপর হাত রেখে শপথ পাঠ করেন তিনি। এই দুই পবিত্র গ্রন্থের একটি ছিল তার দাদার এবং অন্যটি বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাসবিদ আর্তুরো শমবার্গের। শপথ শেষে প্রথা অনুযায়ী ৯ ডলার ফি জমা দিয়ে নথিতে স্বাক্ষর করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জোহরান মামদানী এর মা ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ার তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন যে, এটি আমাদের কল্পনার অতীত হলেও খুবই সুন্দর একটি মুহূর্ত। মামদানী এর এই উত্থান অনেকটা রূপকথার মতো। এক বছর আগেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ রাজ্য আইনপ্রণেতা, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের সাহসী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের মন জয় করে নেন। বিশেষ করে তার ফ্রি বাস সেবা চালু করার উদ্যোগটি ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
শপথ অনুষ্ঠানের এই স্থান নির্বাচন ছিল অত্যন্ত প্রতীকী। মামদানী মনে করেন, সাবওয়ে স্টেশনটি সিটির প্রাণশক্তি এবং ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। দায়িত্ব নিয়েই তিনি তার নতুন পরিবহন কমিশনার মাইকেল ফ্লিনকে পাশে টেনে নেন। তবে নতুন এই মেয়রের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নিউ ইয়র্কের ৮৫ লক্ষ মানুষের আবাসন সংকট দূর করা, ভাড়া স্থিতিশীল রাখা এবং ৩ লক্ষ সিটি কর্মীকে সামলানো তার প্রধান কাজ হবে। এছাড়া তার প্রস্তাবিত ৭ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং রাজ্য প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রক্ষা করাও বড় পরীক্ষা হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিটি হলের সিঁড়িতে একটি জনাকীর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ উপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন রাজনীতির আলোচিত ব্যক্তিত্ব বার্নি স্যান্ডার্স এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ। সিটির নিম্ন আয়ের মানুষ এবং বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে তাকে নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। লেটিশিয়া জেমস এই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করে মামদানী এর আগামীর পথচলাকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
সিটি হলের পার্কের এক গোপন দরজা দিয়ে বেরিয়ে মেয়রের কার্যালয়ে প্রবেশের মাধ্যমে জোহরান মামদানী এর নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হলো। সাধারণ মানুষের জন্য এক সাশ্রয়ী নিউ ইয়র্ক গড়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, এখন তা বাস্তবায়নের সময়।