মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে পবিত্র রমজানের বাঁকা চাঁদ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই নিউইয়র্ক সিটির ৫ লক্ষাধিক মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের জীবনে শুরু হয়েছে এক আধ্যাত্মিক অধ্যায়। তবে এবারের রমজান নিউইয়র্কবাসীর কাছে কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। কারণ, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই মহানগরী এবার তার প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানী-এর নেতৃত্বে পবিত্র মাসটি অতিবাহিত করছে।
২০২১ সালে স্টেট অ্যাসেম্বলিতে যোগ দেওয়া এবং গত বছরের কঠিন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া জোহরান মামদানী-এর জন্য এই রমজান একাধারে আত্মশুদ্ধি এবং বিশাল প্রশাসনিক দায়িত্বের এক কঠিন পরীক্ষা। আমেরিকার বৃহত্তম সিটির মেয়র হিসেবে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনসেবা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. রাজপথ থেকে সিটি হল: মেয়র মামদানীর ভিন্নধর্মী ভাবনা
গত বছর নির্বাচনী প্রচারণার সময় একটি সাধারণ মুহূর্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছিল। কিউ (Q) ট্রেনের কামরায় বসে সাধারণ এক ‘বুরিটো’ দিয়ে মেয়রের ইফতার করার সেই ছবি প্রায় ১০ লাখ মানুষ দেখেছিলেন। সেটি ছিল একজন সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারের দৃশ্যপট আরও গভীর।
মেয়রের জ্যেষ্ঠ সহযোগী জারা রহিম জানিয়েছেন, এবার মেয়র জোহরান মামদানী তাঁর ইফতারের সময়গুলো উৎসর্গ করছেন সিটির সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য। তিনি অগ্নিনির্বাপক কর্মী (Firefighters), ডেলিভারি রাইডার এবং অন্যান্য জরুরি সেবায় নিয়োজিত মুসলিম কর্মীদের সাথে ইফতার করছেন। এটি কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং রমজানের মূল শিক্ষা—সহমর্মিতা ও সেবাকে সরাসরি সিটি হলের কাজের সাথে যুক্ত করার একটি বড় প্রয়াস।
২. দিনভর উপবাস ও বিরামহীন কর্মযজ্ঞ
নিউইয়র্কের মেয়রের রুটিন মানেই হলো সেকেন্ডে মেপে চলা। ভোর হওয়ার আগেই সাহরি খেয়ে মেয়র জোহরান মামদানী-এর কর্মদিবস শুরু হচ্ছে। সারাদিন এক ফোঁটা পানি বা খাবার গ্রহণ না করেই তাঁকে বিভিন্ন সভায় বক্তব্য দিতে হচ্ছে, সিটির অলিগলি পরিদর্শন করতে হচ্ছে এবং বাজেট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রে সই করতে হচ্ছে।
শীতের বিদায়বেলায় দিনগুলো কিছুটা ছোট হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও, মেয়রের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এই কৃচ্ছ্রসাধনকে বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। তবে মেয়র এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করা মানেই হলো সিটির অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কষ্টকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা।
৩. নিউইয়র্ক সিটির মেয়রদের অবদানের ধারাবাহিকতা
ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ISPU)-এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট মুসলিম জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি কেবল নিউইয়র্ক সিটিতেই বাস করেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিয়ে বিগত মেয়ররাও বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন:
সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ গ্রাসি ম্যানশনে ইফতারের আয়োজন শুরু করেছিলেন এবং লোয়ার ম্যানহাটনে মুসলিম কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
মেয়োর বিল ডি ব্লাজিও এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন; তিনি সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে পবিত্র ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন।
মেয়র এরিক অ্যাডামস তাঁর সময়ে সিটির পাঁচটি বরোতেই বড় পরিসরে রমজান উৎসব পালন করে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আর বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানী এই ধারায় যোগ করেছেন এক নতুন মাত্রা। প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে তিনি নিজে রোজা রেখে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন এবং সরাসরি তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে ইফতার ও খাবার বিতরণে অংশ নিচ্ছেন।
৪. বৈচিত্র্যময় মুসলিম কমিউনিটির মেলবন্ধন
মেয়র জোহরান মামদানী-এর এই রমজান উদযাপনের একটি বড় লক্ষ্য হলো নিউইয়র্কের মুসলিমদের বৈচিত্র্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। পশ্চিম আফ্রিকান, দক্ষিণ এশীয়, মধ্যপ্রাচ্য এবং কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান মুসলিমদের সাথে তিনি সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। মেয়রের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন মসজিদে ইফতার ও খাবার বিতরণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব মসজিদে অভিবাসী (Migrant) জনসংখ্যার চাপ বেশি।
৫. আধ্যাত্মিকতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি (NYU)-এর ইসলামিক সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক শেখ ফাইয়াজ জাফর বলেন, "মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে রোজা রাখা শারীরিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পরীক্ষা। তবে এই সিয়াম সাধনাই তাঁর জন্য ধৈর্যের এক বড় উৎস হতে পারে।"
এবারের রমজান এমন এক সময়ে এসেছে যখন বৈশ্বিক রাজনীতি বেশ উত্তপ্ত। গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি এবং দেশীয় রাজনীতির নানা সমীকরণ নিউইয়র্কের মুসলিমদের মনে কিছুটা বিষণ্ণতা তৈরি করেছে। ৯/১১ পরবর্তী ইসলামোফোবিয়া এবং নজরদারির যে ক্ষত মানুষের মনে ছিল, মেয়র জোহরান মামদানী চান তাঁর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সেখানে স্বস্তি ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনতে।
এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা
২০২০ সালের মহামারীর সময় জোহরান মামদানী যখন কুইন্সের আস্তোরিয়ায় সাধারণ একজন সংগঠক হিসেবে খাবার বিলি করেছিলেন, তখন থেকেই তাঁর জনসেবার যাত্রা শুরু। আজ তিনি সেই সিটির সর্বোচ্চ আসনে বসেও নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধকে ধারণ করছেন। রমজানের পবিত্রতার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট ঘোষণা করাকে তিনি একটি "অসাধারণ সূচনা" বলে অভিহিত করেছেন। নিউইয়র্কের ৫ লাখ মুসলিমের জন্য এই রমজান কেবল ইবাদতের মাস নয়, বরং নিজেদের অধিকার ও সম্মানের এক নতুন অধ্যায়।