নিউইয়র্ক সিটির রাজপথে চলাচলকারী উবার ও লিফট চালকদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম অবশেষে সাফল্যের মুখ দেখল। গত বৃহস্পতিবার সিটি কাউন্সিলে এমন একটি যুগান্তকারী আইন পাস হয়েছে, যা রাইড-শেয়ারিং অ্যাপগুলোর ‘ইচ্ছেমতো’ চালক ছাঁটাই বা অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতাকে শিকল পরিয়েছে। সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টদের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চালকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের শেষ কর্মদিবসে। তিনি এই বিলসহ আরও বেশ কিছু বিলে ভেটো দিয়েছিলেন। তবে নবগঠিত কাউন্সিল সেই ভেটো অগ্রাহ্য করে (override) বিলটি পুনরায় পাস করার মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছে। এর ফলে এখন থেকে উবার বা লিফট চাইলেই কোনো চালককে মুহূর্তের মধ্যে অ্যাপ থেকে বিচ্ছিন্ন বা ‘ডিঅ্যাক্টিভেট’ করতে পারবে না। নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো চালককে বহিষ্কার করতে হলে অন্তত ১৪ দিন আগে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে যৌন হয়রানি বা গুরুতর অপরাধের মতো ‘মারাত্মক অসদাচরণ’-এর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো চালকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। এখন থেকে কোনো চালককে উপযুক্ত কারণ ছাড়া কাজ থেকে সরানো যাবে না। চালকদের জন্য একটি স্বাধীন আপিল প্রক্রিয়া তৈরি করা হবে এবং কোনো চালক যদি ভুলভাবে বহিষ্কৃত হন, তবে তিনি বকেয়া মজুরিসহ পুনরায় কাজে ফেরার অধিকার পাবেন। কাউন্সিল মেম্বার শেখর কৃষ্ণান এই বিলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সিটি হলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, চালকরা সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দেখতেন তাদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে গেছে—সেই দুঃস্বপ্নের রাত এখন শেষ।
আইনটি পাস হওয়ার আগে থেকেই লিফট কোম্পানি এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। তারা দাবি করেছিল, এই আইনের কারণে বিপজ্জনক চালকদের রাস্তা থেকে সরানো কঠিন হবে। তবে চালক অধিকার রক্ষাকারীরা বলছেন, এটি লিফটের একটি সাজানো প্রপাগান্ডা বা ভুল তথ্য ছড়ানোর কৌশল মাত্র। কারণ আইনেই স্পষ্ট বলা আছে, জননিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন চালকদের দ্রুত সরিয়ে দিতে কোনো বাধা নেই। মূলত কোম্পানিগুলো যাতে মজুরি ফাঁকি দিতে চালকদের সাময়িকভাবে ‘লক আউট’ করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই এই কঠোর অবস্থান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনটি কেবল নিউইয়র্কের চালকদের সুরক্ষা দেবে না, বরং সারা বিশ্বের গিগ ইকোনমি বা অ্যাপ-ভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে থাকবে। গত বছর ট্যাক্সি অ্যান্ড লিমোজিন কমিশন (TLC) চালকদের মজুরি সুরক্ষায় যে নিয়ম করেছিল, এই নতুন আইন তাকে আরও শক্তিশালী করল। উবার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকলেও লিফট তাদের অসন্তোষ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এটি এখন স্পষ্ট যে, প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে শ্রমিকের অধিকার হরণ করার দিন শেষ হতে চলেছে।