নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র মামদানী বলেছেন, শহরটি এখন দুই দিকের সংকটে পড়েছে—জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্তৃত্ববাদী নীতি। ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সমাজতন্ত্রী ৫ নভেম্বর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন, নির্বাচনে বিজয়ের পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য।
মামদানী বলেন, “আমার দায়িত্ব হবে এই দুই সংকট মোকাবিলা করা। আমি নিউইয়র্কের পক্ষে দাঁড়াব।”
ট্রাম্প, যিনি নিজেও নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্মেছেন, নির্বাচনের আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—যদি মামদানী জয়ী হন, তবে শহরের তহবিল কাটছাঁট করা হতে পারে। ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি নিউইয়র্ককে ততটা অর্থ দিতে পারব না, কারণ মামদানী সেই অর্থ নষ্ট করবেন তাঁর বামঘেঁষা রাজনীতিতে।”
জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো অবৈধ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন মামদানী। তাঁর প্রচারণার প্রতিশ্রুতি ছিল—“ট্রাম্প-প্রুফ নিউইয়র্ক” গড়ে তোলা।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও মামদানীর প্রতিক্রিয়া
ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আশঙ্কা:
লস অ্যাঞ্জেলেস বা শিকাগোর মতো বড় শহরগুলোয় ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় গার্ড পাঠালেও নিউইয়র্কে এখনো সে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবুও এমন আশঙ্কা রয়েছে। নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্নর ক্যাথি হোকল ইতোমধ্যে সাবওয়েতে অপরাধ কমাতে স্টেট পর্যায়ে গার্ড মোতায়েন করেছেন, তবে ট্রাম্প যদি শহরে ফেডারেল সৈন্য পাঠানোর চেষ্টা করেন, তিনি তা প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু মামদানী ভিন্ন পথে হাঁটতে চান। তিনি জানিয়েছেন, নিউইয়র্ক স্টেটের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসসহ স্টেট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জোট গঠন করে আদালতে মামলা করবেন যদি ফেডারেল সৈন্য পাঠানো হয়। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটের গভর্নর গ্যাভিন নিউজম ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন ব্যাস এমন মামলা করে ট্রাম্প প্রশাসনের মোতায়েন ঠেকিয়েছিলেন।
অভিবাসন বিরোধী অভিযান:
শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস ও বোস্টনের মতো শহরে বৃহৎ পরিসরে অভিবাসন অভিযান চলছে। নিউইয়র্কেও সম্প্রতি ম্যানহাটনে স্ট্রিট ভেন্ডরদের বিরুদ্ধে একটি অস্থির অভিযানে সহিংসতা দেখা গেছে, যেখানে এক নারীকে মাটিতে ফেলে দেয় ফেডারেল এজেন্টরা।
মামদানী ঘোষণা দিয়েছেন, ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তারা যদি নিউইয়র্কে আইনের সীমা লঙ্ঘন করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আইন ভঙ্গ করলে দায় এড়ানো যাবে না—আপনি প্রেসিডেন্ট হন বা একজন এজেন্ট।”
তিনি নিউইয়র্ককে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিবাসন–সহনশীল শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এর অংশ হিসেবে তিনি ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের আইনি সহায়তা তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করেছেন, যা অভিবাসী ও অনথিভুক্ত বাসিন্দাদের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেবে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন দপ্তরে থাকা সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষায়ও পদক্ষেপ নেবেন।
ফেডারেল তহবিল কাটছাঁটের হুমকি:
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই এলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ নিউইয়র্কের ৮০ মিলিয়ন ডলারের ফেডারেল জরুরি সহায়তা তহবিল বন্ধ করে দেয়। পরে পরিবহন বিভাগও হাডসন নদীর নিচ দিয়ে চলা রেল করিডর ও ম্যানহাটনের ‘সেকেন্ড অ্যাভিনিউ সাবওয়ে’ প্রকল্পে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন স্থগিত করে।
৩ নভেম্বর ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লেখেন, “আমি আমার প্রিয় জন্মভূমি নিউইয়র্কে আইনগতভাবে যতটুকু ন্যূনতম প্রয়োজন, তার বেশি অর্থ প্রদান করা অত্যন্ত অসম্ভব।”
এ বিষয়ে মামদানী বলেন, প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে তহবিল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নর্থ ক্যারোলিনার মতো স্টেটও ফেডারেল তহবিল কাটছাঁটের বিরুদ্ধে কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।
মেয়রকে গ্রেপ্তারের হুমকি:
নির্বাচনের আগেই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মামদানী যদি ফেডারেল অভিবাসন নীতিতে সহযোগিতা না করেন, তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা বা এমনকি নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মামদানী শিশুকালে নিউইয়র্কে আসেন এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পান।
ট্রাম্পের কিছু ডানপন্থী সহযোগী মামদানীর নাগরিকত্ব পুনঃমূল্যায়নের দাবি তুলেছেন। তবে নির্বাচনে জয়ের পর মামদানী স্পষ্ট বার্তা দেন, “নিউইয়র্ক অভিবাসীদের শহর—তাদের দ্বারা গড়া, তাদের শ্রমে চলা, আর আজ থেকে তাদের নেতৃত্বে।” তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমাদের কাউকে আঘাত করতে চাইলে, আপনাকে সবার আগে আমাদের সবার মুখোমুখি হতে হবে।”
তাঁর এই বক্তব্যে নির্বাচনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতা তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ে, যা ছিল রাতের সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া।
তথ্যসূত্র: ইউএসএ টুডে