বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমেরিকা এক গভীর আত্মপরিচয়ের সংকটে নিমজ্জিত। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপ এবং চলমান শীতকালীন অলিম্পিকে মার্কিন অ্যাথলেটদের মন্তব্য ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল সাধারণ কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার তরুণ প্রজন্ম ও একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ তাদের জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় গর্বের জায়গা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
জনমত জরিপে আশঙ্কাজনক চিত্র
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক দশকে আমেরিকানদের মধ্যে দেশপ্রেম বা জাতীয় গর্ববোধের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের কম বয়সী তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এক দশক আগেও যেখানে এই বয়সের ৭১ শতাংশ মানুষ নিজেদের আমেরিকান হিসেবে পরিচয় দিতে অত্যন্ত গর্ববোধ করত, বর্তমানে সেই সংখ্যাটি নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি তরুণ এখন তাদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্বিত নয়।
এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ। তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে যেখানে ৮৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক আমেরিকান হিসেবে গর্বিত ছিলেন, বর্তমানে তা রেকর্ড পতন ঘটিয়ে ৩১ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এর বিপরীতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই গর্বের হার ৮০ শতাংশের উপরে স্থিতিশীল রয়েছে। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গৃহীত অভ্যন্তরীণ নীতিগুলো দেশটির একটি বিশাল অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বড় অংশ জাতীয় পরিচয় নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের সামাজিক সংহতি দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে পড়ে।
অলিম্পিক মঞ্চে প্রতিবাদের ভাষা
জনমত জরিপের এই অস্থিরতা এখন খেলার মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক মঞ্চেও পৌঁছে গেছে। ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী একাধিক মার্কিন অ্যাথলেট তাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক অ্যাথলেট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করা তার জন্য এক 'মিশ্র অনুভূতি'। তার মতে, গায়ে জাতীয় পতাকা জড়ানো মানেই এই নয় যে তিনি রাষ্ট্রের বর্তমান সমস্ত নীতির সাথে একমত।
অ্যাথলেটের এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। খোদ রাষ্ট্রপ্রধান এই বক্তব্যকে ‘পরাজিত মানসিকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, যার দেশের জন্য গর্ব নেই, তার জাতীয় দলে থাকা উচিত নয়। তবে এই সমালোচনার মুখেও পিছু হটেননি ক্রীড়াবিদরা। আরও কয়েকজন বিশ্বসেরা অ্যাথলেট বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে অভিবাসন নীতি এবং নাগরিকদের অধিকার খর্বের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশপ্রেম মানে অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং দেশের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তা সংশোধনের দাবি জানানোই নাগরিকের প্রকৃত দায়িত্ব।
বিভাজিত সমাজ ও বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি
আমেরিকার এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন এখন আর পর্দার আড়ালে নেই। আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট। মার্কিন অ্যাথলেটরা যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের দেশের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তা বহির্বিশ্বে দেশটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই সংকটের দায়ভার কেবল অ্যাথলেটদের ওপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়। যখন একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মনে করে যে তাদের কণ্ঠস্বর সরকার শুনছে না, অথবা তাদের মৌলিক মানবাধিকারগুলো হুমকির মুখে, তখন দেশপ্রেমের এই পতন অনিবার্য। বর্তমানে আমেরিকা কার্যত একটি '৫০-৫০' দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে অর্ধেক মানুষ সরকারি নীতির কট্টর বিরোধী।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারি প্রতিনিধিরা দুয়ো ধ্বনি শুনলেও অলিম্পিক দলকে সাধারণ মানুষের সমর্থন দেওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাসী এখন আমেরিকার সাধারণ মানুষ এবং সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখেছে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতির বিরুদ্ধে থাকতে পারে, কিন্তু আমেরিকান সাধারণ নাগরিক বা ক্রীড়াবিদদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ নেই।
ভবিষ্যৎ পরিণতির দিকে এক নজর
২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এটা স্পষ্ট যে, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। এখন দেশপ্রেম মানে কেবল পতাকা ওড়ানো বা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নয়; বরং পতাকার নিচে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। আমেরিকা যদি তার অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং নাগরিকদের বিশ্বাস ফিরে পেতে চায়, তবে কেবল জাতীয়তাবাদের স্লোগান দিয়ে হবে না; বরং ঘৃণা ও বিভেদের বদলে সামাজিক সহমর্মিতার রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে এটা বোঝাতে হবে যে রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যথায়, এই মোহভঙ্গ হওয়া তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতে একটি লক্ষ্যহীন ও দুর্বল আমেরিকার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুঝতে হবে যে, মানুষের মনে দেশের জন্য ভালোবাসা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, এটি অর্জন করতে হয় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে।